যখনই একটা যন্ত্র-যানকে চলতে দেখি তখনই একটা হুইসেল শুনতে পাই এবং দেখতে পাই যে ভালভগুলো খুলছে আর চাকাগুলি ঘুরছে, কিন্তু তাই বলে আমি অনুমান করতে পারি না যে হুইসেলের শব্দ ও চাকার ঘূর্ণনই এঞ্জিনটার চলার কারণ।
চাষীরা বলে থাকে, ওক গাছে ফুল ফোটে বলেই শেষ বসন্তে ঠাণ্ডা বাতাস বয়, আর বাস্তবক্ষেত্রেও ওক গাছে ফুল ফুটতে শুরু করলেই বসন্তকালের ঠাণ্ডা বাতাস বইতে থাকে। কিন্তু ওক-কুঁড়িরা পাপড়ি মেললেই কেন যে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করে তা না জানলেও আমি কিন্তু চাষীদের সঙ্গে একমত নই যে ওক কুঁড়িদের ফুটে ওঠাই ঠাণ্ডা বাতাসের কারণ। জীবনের অন্য সব ঘটনার মতোই সেখানেও আমি দেখতে পাই ঘটনার আকস্মিক যোগাযোগমাত্র। ঘড়ির কাঁটা, ইঞ্জিনের ভালভ ও চাকা, এবং ওক গাছের দিকে যত সতর্কতার সঙ্গেই দৃষ্টিপাত করি না কেন, কোনোমতেই কিন্তু ঘণ্টা বাজবার, ইঞ্জিন চলবার ও বসন্ত-বাতাস বইবার কারণকে আবিষ্কার করতে পারব না। সেটা করতে হলে আমার দৃষ্টিকোণকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে অংকুরের, ঘণ্টার ও বাতাসের গতির নিয়মকে। ইতিহাসকেও তাই করতে হবে। আর সেই দিকেই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ইতিহাসের নিয়মকে জানতে হলে আমাদের পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তুকে সম্পূর্ণ পাল্টাতে হবে, রাজা, মন্ত্রী ও সেনাপতিদের ছেড়ে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে সেইসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের দিকে যা জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত করে। এই পথে ইতিহাসের নিয়মকে বুঝবার পথে মানুষ কতদূর অগ্রসর হতে পারবে তা কেউ বলতে পারে না, কিন্তু একথা ঠিক যে একমাত্র এই পথেই ইতিহাসের নিয়ম আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে, এবং রাজা, সেনাপতি ও মন্ত্রীদের কার্যকলাপের বর্ণনায় এবং সে সম্পর্কে তাদের ভাবনাচিন্তার কথা বলতে ইতিহাসকাররা যতটা মানসিক প্রচেষ্টা নিয়োগ করেছে, তার লক্ষ ভাগের এক ভাগও এইদিকে প্রয়োগ করা হয়নি।
.
অধ্যায়-২
ইওরোপের একডজন দেশের সৈন্যদল রাশিয়াকে লক্ষ্য করে ছুটে এসেছে। তারা স্মোলেনস্কে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত এবং পরে স্মোলেনস্ক থেকে বরদিনো পর্যন্ত রুশ বাহিনী ও জনগণ ওরকম সংঘর্ষকে এড়িয়েই চলছে। ফরাসি বাহিনী তাদের লক্ষ্য মস্কোর দিকে এগিয়ে চলেছে, একটা পতনশীল বস্তু যত পৃথিবীর দিকে নেমে আসে ততই তার গতিবেগ যেরকম বেড়ে যায়, সেই রকম ফরাসি বাহিনীও যতই তাদের লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়েছে ততই তাদের গতিবেগ বেড়েছে। পিছনে পড়ে আছে ক্ষুধায় কাতর একটি শক্ত-দেশের হাজার ভার্ল্ড জমি, সম্মুখে লক্ষ্যস্থল থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে মাত্র কয়েক ভা জমি। নেপোলিয়নের সেনাদলের প্রতিটি সৈনিক সেকথা উপলব্ধি করছে, আর নিজের আবেগেই অভিযান এগিয়ে চলেছে।
রুশ বাহিনী যত পিছিয়ে যাচ্ছে, শত্রুপক্ষের মনে ঘৃণার আগুন ততই তীব্র হিংস্রতায় জ্বলে উঠছে, এরা যত পিছিয়ে যাচ্ছে, ওদের সৈন্যসংখ্যা তত বাড়ছে, তত বেশি সংহত হচ্ছে। সংঘর্ষ বাধল বরদিনোতে। কোনো দলই ছত্রভঙ্গ হয়নি, কিন্তু অধিকতর গতিবেগ সমন্বিত কোনো গোলকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অপর গোলকটি যেরকম অনিবার্যভাবে ছিটকে ফিরে আসে, ঠিক তেমনিভাবেই সংঘর্ষের সঙ্গে সঙ্গেই রুশ বাহিনী পশ্চাদপসরণ করল, আর ওদিকে সংঘর্ষের ফলে সব শক্তি নিঃশেষিত হওয়া সত্ত্বেও সেই গতিবেগের টানেই অভিযানের গোলকটিও সেই একই অনিবার্যতায় বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল।
রুশরা মস্কো থেকেও আশি মাইল পিছিয়ে গেল, আর ফরাসিরা মস্কো পৌঁছে সেখানেই থেমে গেল। তারপর পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে একটি যুদ্ধও হয়নি। ফরাসিরা একটুও নড়ল না। মারাত্মক আহত রক্তাক্ত জন্তু যে রকম ক্ষতস্থান চাটতে থাকে, ঠিক সেইভাবে তারা পাঁচটি সপ্তাহ মস্কোতে চুপচাপ কাটিয়ে দিল, তারপর কোনো নতুন কারণ ছাড়াই হঠাৎ পালাতে শুরু করল : কালুগা রোড পর্যন্ত ছুটে গেল এবং কোনোরকম গুরুতর যুদ্ধ ছাড়াই অধিকতর গুরুতর গতিতে ফিরে গেল শ্মলেনস্কে, স্মোলেনস্ক বেরেজিনা ছাড়িয়ে, ভিলনা ছাড়িয়ে, আরো অনেক দূরে।
২৬শে অগস্ট সন্ধ্যায় কুতুজভ ও রুশ বাহিনী ঠিক ঠিক বুঝতে পারল যে বরদিনোর যুদ্ধে তাদের জয় হয়েছে। সেই সংবাদই কুতুজভ সম্রাটকে পাঠাল। শত্রুকে একেবারে খতম করতে সে নতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে সেনাদলকে নির্দেশ দিল, কাউকে ঠকাবার জন্য সে একাজ করেনি, কিন্তু এই যুদ্ধে যোগদানকারী অন্য সকলের মতোই সেও জানত যে শত্রুপক্ষ পরাস্ত হয়েছে।
কিন্তু সেদিন সারা সন্ধ্যায় এবং পরের দিন একের পর এক অশ্রুতপূর্ব ক্ষতির সংবাদ আসতে লাগল, খবর এল যে অর্ধেক সৈন্য নষ্ট হয়েছে, কাজেই নতুন করে যুদ্ধ করা একেবারেই অসম্ভব।
যতক্ষণ পর্যন্ত না আরো সংবাদ পাওয়া হচ্ছে, আহতদের এক জায়গায় করা হচ্ছে, নতুন করে রসদ সরবরাহ করা হচ্ছে, নিহতদের সংখ্যানিরূপিত হচ্ছে, নিহত অফিসারদের জায়গায় নতুন অফিসার নিয়োগ করা হচ্ছে, এবং সৈনিকদের উপযুক্ত খাদ্য ও ঘুমের ব্যবস্থা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করা অসম্ভব। এদিকে যুদ্ধের ঠিক পরদিন সকালেই ফরাসি বাহিনী নিজের গতিবেগের তাগিদেই রুশ বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল, কুতুজভের মনেও আক্রমণের ইচ্ছা জাগল, আর গোটা বাহিনীরও সেই একই ইচ্ছা। কিন্তু একটা আক্রমণের জন্য ইচ্ছাটাই তো যথেষ্ট নয়, আক্রমণ করতে হলে তার সম্ভাবনাটা অন্তত থাকা চাই, কিন্তু সেই সম্ভাবনা তখন ছিল না। একটি দিনের পশ্চাদপসরণ স্থগিত রাখা তখন অসম্ভব, ঠিক সেই একইভাবে তার পরের দিন এবং তৃতীয় দিনও পশ্চাদপসরণ স্থগিত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল, এবং শেষপর্যন্ত ১লা সেপ্টেম্বর তারিখে সেনাবাহিনী যখন মস্কোর কাছাকাছি পৌঁছল, তখনো সেনাদলের সর্বস্তরের মনোবল যতই শক্ত থাকুক, ঘটনার চাপে তাকে মস্কো ছাড়িয়ে সরে যেতে হল। সেনাদল আরো একটা দিন পিছু হটে মস্কোকে শক্রর হাতে ফেলে দিয়ে সরে গেল।
যে সমস্ত লোক ভাবতে অভ্যস্ত যে অভিযান ও যুদ্ধের নক্সা সেনাপতিরাই তৈরি করে থাকে–যেমন পড়ার ঘরে একটা মানচিত্র সামনে নিয়ে আমরাও কল্পনা করতে পারি একজন সেনাপতি এ-যুদ্ধ অথবা সে-যুদ্ধের কি ব্যবস্থা করবে তাদের সামনে কিন্তু এই প্রশ্নগুলি দেখা দেয় : পশ্চাদপসরণের কালে কুতুজভ এটা বা ওটা করল না কেন? ফিলিতে পৌঁছবার আগেই কেন সে একটা ঘাঁটি স্থাপন করল না? মস্কোকে ফেলে রেখে কেন সে সঙ্গে সঙ্গেই কালুগা রোড ধরে হটে গেল না? ইত্যাদি। সেরকম ভাবতে অভ্যস্ত লোকরা ভুলে যায়, অথবা জানেই না, যে একজন প্রধান সেনাপতির কর্মধারা কতকগুলি অনিবার্য পরিস্থিতির দ্বারা সীমিত। আমরা মনে করি যে কোনো একটি বিশেষ ঘটনা থেকেই একজন প্রধান সেনাপতির কাজ শুরু হয়, কিন্তু সেটা ঠিক নয়। প্রধান সেনাপতিকে সবসময়ই থাকতে হয় নিয়ত পরিবর্তনশীল একটি ঘটনাস্রোতের মাঝখানে, কাজেই কোনো একটি মুহূর্তের ঘটনা পরিপূর্ণ তাৎপর্যকে সে ধরতে পারে না। প্রতিমুহূর্তে আমাদের অগোচরে ঘটনাটির রূপ বদলায়, আর সেই পরিবর্তনশীল ঘটনাস্রোতের মাঝখানে প্রতিটি মুহূর্তে প্রধান সেনাপতিকে কাটাতে হয় ষড়যন্ত্র, দুশ্চিন্তা, জরুরি অবস্থা, কর্তৃপক্ষ, পরিকল্পনা, ভীতি-প্রদর্শন ও প্রবঞ্চনার এক জটিল আবর্তের মধ্যে, পরস্পরবিরোধী অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর তাকে অনবরত দিতে হয়।
