গতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে নিয়ে আমরা সমস্যার একটা সমাধানের কাছাকাছি যেতে পারি মাত্র, কখনো সেখানে পৌঁছতে পারি না। যখন আমরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতমের ধারণা, একদশমাংশের সমানুপাতিক জ্যামিতিক হ্রাস-বৃদ্ধি ধারণা, এবং অনন্ত পর্যন্ত সেই হ্রাস-বৃদ্ধির যোগফলের ধারণা করতে পারব তখনই এ সমস্যার সমাধানও আমরা পেয়ে যাব।
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতমকে নিয়ে আলোচনার কৌশল অর্জন করার ফলে গণিতশাস্ত্রের একটি আধুনিক শাখা এখন গতিসংক্রান্ত এমন সব জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে যাকে একদিন সমাধানের অতীত বলে মনে করা হত।
প্রাচীনকালে অজ্ঞাত গণিতশাস্ত্রের এই আধুনিক শাখা গতিসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনার সময় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতমের ধারণাকে স্বীকার করে, সমর্থন করে গতির পরিপূর্ণ ধারাবাহিকতাকে এবং তার ফলে ধারাবাহিক গতির আলোচনা না করে গতির স্বতন্ত্র অংশ নিয়ে আলোচনা করার দরুন যে অনিবার্য ভুলকে মানুষ এড়িয়ে চলতে পারে না তাকে সংশোধন করতে সক্ষম হয়েছে।
ঐতিহাসিক অগ্রগতির নিয়মকে খুঁজতে গিয়েও সেই একই ব্যাপার ঘটে। অসংখ্য মানুষের ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত মানবতার গতিপথও ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন।
এই ধারাবাহিক অগ্রগতির নিয়মকে জানাই ইতিহাসের লক্ষ্য। সকল মানুষের ইচ্ছার যোগফল থেকে উদ্ভূত সেইসব নিয়মকে জানবার চেষ্টায় মানুষের মন কতকগুলি ইচ্ছাকৃত, বিচ্ছিন্ন একককে ধরে নেয়। ইতিহাসের প্রথম পদ্ধতিই হল ধারাবাহিক ঘটনাবলী থেকে একটি নির্বাচিত অংশকে বেছে নিয়ে অন্য ঘটনা থেকে আলাদা করে তাকে বিচার করা, যদিও ঘটনার সূচনা বলে কিছু নেই, থাকতে পারে না, কারণ একটা ঘটনা নিরবচ্ছিন্নভাবে অপর একটি ঘটনা থেকেই প্রবাহিত হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হল কোনো একজন মানুষের-রাজা অথবা সেনাপতির কার্যাবলীকে বহু মানুষের ইচ্ছার যোগফলের সমান বলে বিবেচনা করা, অথচ যে কোনো একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তির কাজের ভিতর দিয়ে বহু মানুষের ইচ্ছার যোগফল কখনো প্রকাশিত হয় না।
সত্যের কাছাকাছি পৌঁছবার চেষ্টায় ইতিহাস-বিজ্ঞান ক্রমাগত ছোট ছোট একককে নিয়ে পরীক্ষা করে। কিন্তু সে এককটি যত ছোটই হোক, আমরা মনে করি যে একটি একককে অন্যগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করা, অথবা কোনো ঘটনার সূচনা আছে বলে ধরে নেওয়া, অথবা এ কথা বলা যে কোনো একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপের ভিতর দিয়ে বহু মানুষের ইচ্ছা প্রকাশিত হয়–আসলে এসবই মিথ্যা।
ইতিহাসের যে কোনো সিদ্ধান্তকে ধুলায় লুটিয়ে দিতে কোনোরকম কঠিন বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন হয় না। যে কোনো একটি বড় একককে বেছে নিয়ে আলোচনা করাই যথেষ্ট।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রতম একককে গ্রহণ করলে এবং তাদের সংগঠিত করে তোলার কৌশলটি অধিগত করতে পারলেই আমরা ইতিহাসের নিয়মে পৌঁছতে পারব বলে আশা করতে পারি।
.
ইওরোপে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পনেরটি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের এক অসাধারণ আন্দোলন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। মানুষ তাদের চিরাচরিত কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েছে, ইওরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছে, পরস্পরকে লুঠ করেছে ও হত্যা করেছে, কখনো জয়লাভ করেছে আবার কখনো নিরাশায় ডুবে গেছে, আর বেশ কয়েক বছর ধরে জীবনের গতিটাই পাল্টে গেছে, একটা ব্যাপক গতি কখনো দ্রুত হয়েছে, কখনো হয়েছে মন্থর। এই আন্দোলনের কারণ কি, কোন নিয়মে এটা পরিচালিত হয়েছে? সে প্রশ্ন জেগেছে মানুষের মনে।
এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইতিহাসকাররা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে প্যারিস নগরীর একটি ভবনের কয়েক ডজন মানুষের বাণী ও কার্যাবলী, আর সেই বাণী ও কার্যাবলীর নাম দিয়েছে বিপ্লব, তারপর তারা আমাদের দিয়েছে স্বয়ং নেপোলিয়নের এবং তার সমর্থক ও বিরোধী কিছু মানুষের বিস্তারিত জীবনী, আর অন্যদের উপর এইসব মানুষের প্রভাবের কথা শুনিয়ে আমাদের বলেছে : এই কারণেই এই আন্দোলন ঘটেছে, এবং এগুলিই তার কারণ।
কিন্তু মানুষের মন শুধু যে এ ব্যাখ্যাকে বিশ্বাস করতে চায়নি তাই নয়, বরং পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে এ ব্যাখ্যা ভ্রান্ত, কারণ এখানে একটি দুর্বলতর ঘটনাকে একটি অধিকতর শক্তিশালী ঘটনার কারণ বলে ধরা হয়েছে। বহু মানুষের ইচ্ছা থেকেই জন্ম নিয়েছে নেপোলিয়ন ও বিপ্লব, আর সেই মানবিক ইচ্ছার যোগফলই প্রথমে তাদের সহ্য করেছে এবং পরে তাদের ধ্বংস করেছে।
ইতিহাসে লেখা হয়েছে, যখনই কোনো বিজয়-অভিযান হয়েছে, তখনই দেখা দিয়েছে দিগ্বিজয়ী, যখনই কোনো রাজ্যে কোনো বিপ্লব ঘটেছে, তখনই মহাপুরুষরা দেখা দিয়েছে। কিন্তু মানুষ বিচার-বুদ্ধি বলে, একথা ঠিক যে যখনই দিগ্বিজয়ীরা দেখা দেয় তখনই যুদ্ধ হয়ে থাকে, কিন্তু তাতে একথা প্রমাণ হয় না যে বিজয়ী বীররাই যুদ্ধ ঘটায় এবং কোনো একটি মানুষের ব্যক্তিগত ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যুদ্ধের নিয়মগুলি খুঁজে পাওয়া যাবে। আমি যখনই আমার ঘড়ির দিকে তাকাই আর তার কাঁটাটা থাকে দশটার ঘরে, তখনই পার্শ্ববর্তী গির্জার ঘণ্টা শুনতে পাই, কিন্তু তার থেকে আমি এটা ধরে নিতে পারি না যে যেহেতু ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে গেলেই ঘণ্টাটা বাজতে শুরু করে, সেই হেতু ঘড়ির কাঁটার অবস্থানের ফলেই ঘণ্টাটা বাজে।
