সেই সময় রুশ বাহিনীর বিশৃঙ্খল পশ্চাৎভাগটা দেখলেই যে কেউ বলে দিতে পারত যে ফরাসিরা আর একটু কর্মতৎপর হলেই রুশ বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, আবার ফরাসি বাহনীর পশ্চাঙ্গটা দেখলেও যে কেউ বলে দিতে পারত যে রুশরা আর একটু কর্মতৎপর হলেই ফরাসিরা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু ফরাসি বা রুশ কোনো পক্ষই তৎপর হল না, যুদ্ধের আগুন ধিকি ধিকি করেই জ্বলতে লাগল।
রুশ সে চেষ্টা করল না কারণ তারা ফরাসিদের আক্রমণ করেনি। যুদ্ধের সূচনায় তারা মস্কোর পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়েছিল, এবং এখন যুদ্ধের শেষ লগ্নেও তারা সেই একই কাজ করে চলেছে। কিন্তু ফরাসিদের ঘাঁটি থেকে তাড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যও যদি রুশদের থাকত, তাহলেও তারা একবার শেষ চেষ্টা করতে পারত না, কারণ গোটা রুশ বাহিনী তখন ভেঙে পড়েছে, যুদ্ধের ফলে তাদের একটা অংশও অক্ষত নেই, আর নিজেদের ঘাঁটি আগলে রাখলেও তাদের অর্ধেক সৈন্যকে তারা হারিয়েছে।
আর ফরাসিরা–তাদের মনে ছিল পনেরো বছর ধরে শুধু জয়লাভের স্মৃতি, নেপোলিয়নের অপরাজেয়তায় ছিল তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস, তারা জানত যে যুদ্ধক্ষেত্রের একটা অংশ তাদের দখলে এসেছে, তারা হারিয়েছে মোট সৈন্যসংখ্যার মাত্র এক-চতুর্থাংশ এবং বিশ হাজার সৈন্যের রক্ষীবাহিনীর সম্পূর্ণ অটুট আছে–তাই তারা অনায়াসেই সে চেষ্টাটা করতে পারত। রুশ বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্যই ফরাসিরা তাদের আক্রমণ করেছিল, কাজেই সে চেষ্টা করাই তাদের উচিত ছিল, কারণ রুশরা যতক্ষণ মস্কোর পথ অবরোধ করে রাখতে পারবে ততক্ষণ ফরাসিদের উদ্দেশ্য সফল হবে না, তাদের সব চেষ্টা, সব ক্ষয়-ক্ষতি বিফলে যাবে। কিন্তু ফরাসিরা সে চেষ্টা করল না। অনেক ইতিহাসকার বলে থাকেন, নেপোলিয়ন যদি শুধু আর ওল্ড গার্ডসকে কাজে লাগাত তাহলেই সে যুদ্ধ জয় করতে পারত। কিন্তু নেপোলিয়ন তার গার্ডসকে ব্যবহার করলে কি হত সেকথা বলা আর হেমন্তকালটা বসন্তকাল হলে কি হত সেকথা বলা আর হেমন্তকালটা বসন্তকাল হলে কি হত সেকথা বলা তো একই ব্যাপার। কিন্তু তা হয়নি, ইচ্ছা ছিল না বলে যে নেপোলিয়ন তার গার্ডসকে যুদ্ধে নামায়নি তা তো নয়, আসলে সেটা করা যায়নি। ফরাসি বাহিনীর সব সেনাপতি, কর্মচারী ও সৈনিকরাই জানত যে তা করা যাবে না, কারণ সৈন্যদের ভগ্ন মনোবলই তা করতে দিত না।
নিজের শক্তিমান বাহুটা অক্ষম, পঙ্গু হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন যে শুধু নেপোলিয়নই দেখেছিল তা নয়, যে শত্রুপক্ষ অর্ধেক সৈন্য হারাবার পরেও যুদ্ধের একেবারে শেষ লগ্নেও তার সূচনাকালের মতোই একই ভয়াবহ মূর্তিতে নিজ ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে আছে, তার নিজের বাহিনীর সব সেনাপতি ও সৈনিকের মনেও পূর্বেকার সব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও সেই একই আতংকের অনুভূতি বাসা বেঁধে ছিল। আক্রমণকারী ফরাসি বাহিনীর নৈতিক শক্তি তখন ফুরিয়ে গেছে। বরদিনোর রণক্ষেত্রে রুশ বাহিনী সেই জয়লাভ করেনি যার নাম একটি ষষ্ঠিখঞ্জে মাথায় বাধা পতাকা নামক কতকগুলো বস্তুতে দখল করা এবং যে মাটির উপর সৈন্যরা দাঁড়িয়ে ছিল এবং এখনো দাঁড়িয়ে আছে তাকে দখল করা, কিন্তু যে নৈতিক জয়লাভের ফলে শত্রুপক্ষের মনে এই দৃঢ় ধারণা জন্মে যে প্রতিপক্ষ নৈতিক শক্তিতে তার চাইতে অধিক বলীয়ান এবং সে নিজে অনেক বেশি অক্ষম সেই নৈতিক জয় রুশদের করায়ত্ত হয়েছে। আক্রমণের মুখে মারাত্মকভাবে আহত একটা ক্রুদ্ধ জন্তুর মতোই ফরাসি আক্রমণকারীরা তখন বুঝতে পেরেছে যে ধ্বংস অনিবার্য হলেও এখন আর থামা চলবে না, রুশ বাহিনীর অবস্থাও তথৈবচ, অর্ধেক সৈন্য হারিয়ে তাদেরও আর পিছু হটা চলে না। ফরাসি বাহিনী যে গতিবেগ সঞ্চয় করেছে তার প্রেরণাতেই তারা এখনো মস্কোর দিকে এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে রুশদের পক্ষ থেকে কোনোরকম প্রচেষ্টা ছাড়াই তাদের মরতে হবে বরদিনো যুদ্ধের মারাত্মক ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণের ফলে। তাই বরদিনো যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ নেপোলিয়ন অর্থহীনভাবে মস্কো থেকে পালিয়ে গেল, স্মোলেনস্ক রোড ধরে পশ্চাদপসরণ করল, তার পাঁচ লক্ষ সৈন্য ধ্বংস হয়ে গেল, নেপোলিয়ন শাসিত ফ্রান্সের পতন হল, সর্বপ্রথম বরদিনোতেই অধিকতর মনোবলসম্পন্ন একটি প্রতিপক্ষের হাত তার উপর চেপে বসল।
[দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত]
১১.১ গতির পরিপূর্ণ ধারাবাহিকতা
তৃতীয় খণ্ড – একাদশ পর্ব – অধ্যায়-১
গতির পরিপূর্ণ ধারাবাহিকতা মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়। গতির যে কোনো নিয়ম মানুষের কাছে তখনই বোধগম্য হয়ে ওঠে যখন গতির যে কোনো একটা নির্বাচিত অংশকে বেছে নিয়ে সেটাকে সে জানতে চেষ্টা করে। প্রাচীন মানুষদের একটা সুপরিচিত ধাঁধা প্রচলিত আছে যে, একটা কচ্ছপ অপেক্ষা দশ গুণ দ্রুতগতিতে ছুটতে পারা সত্ত্বেও আকিলিস কখনো সেই কচ্ছপটাকে অনুসরণ করে তাকে ধরে ফেলতে পারবে না। আকিলিসি যতক্ষণে তার ও কচ্ছপটার মাঝখানের ব্যবধানটাকে পার হবে ততক্ষণে কচ্ছপটা আরো দশ ভাগের একভাগ দূরত্ব এগিয়ে যাবে : আকিলিস যতক্ষণে সেই দশম ভাগটি পার হবে ততক্ষণে কচ্ছপটা এগিয়ে যাবে আরো একশো ভাগের এক ভাগ, এবং এইভাবে অনন্তকাল ধরেই ব্যবধানটা থেকেই যাবে। প্রাচীনকালের মানুষদের কাছে এ সমস্যাটা ছিল সমাধানের অতীত। আকিলিস যে কোনো দিনও কচ্ছপটাকে ধরতে পারবে না এই অবাস্তব সিদ্ধান্তের কারণটা নিম্নরূপ : গতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কতকগুলি খণ্ড খণ্ড অংশে ভাগ করে দেখা হত, অথচ আকিলিস ও কচ্ছপ দুজনের গতিই আসলে ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন।
