সেই মহান, শক্তিমান, চমৎকার, শান্তিময় ও গৌরবময় পিতৃভূমির কেন্দ্রস্বরূপ ফ্রান্সে ফিরে গিয়ে আমি ঘোষণা করতাম যে তার সীমান্ত চর অপরিবর্তনীয়, সব ভবিষ্যৎ যুদ্ধই সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক, সবরকম ক্ষমতাবিস্তার জাতীয়তাবিরোধী। সাম্রাজ্যের আসনে বসাতাম আমার ছেলেকে, আমার একনায়কত্বের সূচনা হত।
প্যারিস হয়ে উঠত পৃথিবীর রাজধানী, আর ফরাসি জাতি হত সকল জাতির ঈর্ষার বস্তু।
তারপর আমার ছেলের রাজকীয় শিক্ষানবীশীর আমলে সম্রাজ্ঞীকে সঙ্গে নিয়ে আমার অবসরকাল, আমার বার্ধক্যকে কাটাতাম নিজেদের ঘোড়ায় চেপে সত্যিকারের গ্রাম্য দম্পতির মতো, ধীরে সুস্থে ঘুরে বেড়াতাম সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে, শুনতাম সকলের অভাব-অভিযোগ, তার প্রতিকার করতাম, সর্ব দিকে ও সর্বত্র গড়ে তুলতাম বড় বড় বেসরকারি অট্টালিকা, নানা কল্যাণ-ব্যবস্থা।
নরহত্যাকারীর বিষণ্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার বিধি-নির্দিষ্ট নিয়তি সেই নেপোলিয়নও নিজেকে বুঝিয়েছিল যে মানুষের কল্যাণই ছিল তার সব কাজের লক্ষ্য, লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের অধিকার ছিল তার হাতে, আর সেই ক্ষমতার বলে সে তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারত আশীর্বাদ ও কল্যাণ।
রুশ যুদ্ধ সম্পর্কে সে আরো লিখেছে : যে চার লক্ষ মানুষ ভিলা নদী অতিক্রম করেছিল তাদের মধ্যে অর্ধেক ছিল অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, স্যাকসন, পোল্যান্ড, ব্যাভেরিয়া, উত্তমবুর্গ, মেকলেনবুর্গ, স্পেন, ইতালি ও নেপলসের মানুষ। সঠিক বলতে গেলে রাজকীয় সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য এসেছিল হল্যান্ড, বেলজিয়াম, রাইন নদীর সীমান্ত অঞ্চল, পিডমন্ট, সুইজারল্যান্ড, জেনেভা, তাস্কান, রোম, বত্রিশতম সামরিক ডিভিশন, ব্রেমেন, হামবুর্গ প্রভৃতি দেশ থেকে, তাদের মধ্যে ফরাসি ভাষায় কথা বলত বড় জোর এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষ। প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া অভিযানে ফ্রান্স হারিয়েছে পঞ্চাশ হাজারেরও কম সৈন্য, আর ভিলনা থেকে মস্কোতে পশ্চাদপসরণের পথে বিভিন্ন যুদ্ধে রুশ বাহিনী হারিয়েছে তার চার গুণেরও বেশি সৈন্য, মস্কো পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে এক লক্ষ রুশ বনে-জঙ্গলে প্রাণ হারিয়েছে শীতে ও খাদ্যাভাবে, শেষপর্যন্ত, মস্কো থেকে ওডার পর্যন্ত যেতে আবহাওয়ার প্রচণ্ডতায়ও রুশ বাহিনীর অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, ফলে ভিলনা পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল মাত্র পঞ্চাশ হাজার, আর কালিশে আঠারো হাজারেরও কম।
নেপোলিয়ন কল্পনা করেছিল যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটা তার ইচ্ছাতেই হয়েছিল, আর সে যুদ্ধের ভয়াবহতা তার অন্তরকে মোটেই বিচলিত করেনি। যা কিছু ঘটেছে তার সব দায়িত্বই সে সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করেছে, তার অন্ধকারাচ্ছন্ন মন এই বিশ্বাসের মধ্যেই যুক্তি খুঁজে পেয়েছে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা সেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে তাদের মধ্যে হেসে এবং ব্যাভেরিয়ার তুলনায় ফ্রান্সের মানুষ ছিল সংখ্যায় অল্প।
.
অধ্যায়-৩৯
নানা বিচিত্র ভঙ্গিতে ও বিচিত্র ইউনিফর্মে হাজার হাজার মানুষ দাভিদভ পরিবার ও রাজকীয় ভূমিদাসদের মালিকানাভুক্ত সেইসব উপত্যকায় ও প্রান্তরে মরে পড় আছে যেখানে শত শত বৎসর ধরে বরদিনো, গোর্কি, শেভার্দিনো ও সেমেনভঙ্কের চাষীরা ফসল কেটে ঘরে তুলেছে, গরু-ঘোড়া চড়িয়েছে। বিভিন্ন ড্রেসিং স্টেশনকে ঘিরে প্রায় তিন একর জমির ঘাস ও মাটি রক্তে ভিজে গেছে। বিভিন্ন অস্ত্রধারী আহত ও অনাহত মানুষ ভয়ার্ত মুখে দলে দলে নিজেদের টেনে নিয়ে গেল-কেউ একটা সেনাদল থেকে ফিরে গেল মোঝায়েস্কে, কেউ বা অন্য দল থেকে ফিরে গেল ভালুভোতে। অন্যরা ক্লান্ত, ক্ষুধার্থ অবস্থায় অফিসারদের নির্দেশে এগিয়ে গেল সামনে। অন্যরা ঘাঁটি আগলে গোলাগুলি চালাতে লাগল।
যে রণক্ষেত্র ছিল প্রভাত সূর্যে ঝলসিত বেয়নেটের ঝিকিমিকি ও ধোয়ার খণ্ড মেঘের ঝলকানিতে সুন্দর, সেখানে এখন ছড়িয়ে আছে ভেজা কুয়াশা ও ধোয়া, আর সোরা ও রক্তের একটা বিচিত্র গন্ধ। মেঘ জমল, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল মৃত ও আহতদের উপর, ভয়ার্ত, ক্লান্ত ও সন্ধিগ্ধ মানুষগুলোর উপর, যেন বলতে চাইল : যথেষ্ট হয়েছে। এবার বন্ধ কর…নতুন করে ভাব! কি করছ তোমরা?
খাদ্য ও বিশ্রামের অভাবে পীড়িত উভয় পক্ষের সৈন্যদের মনেই যেন এখন সন্দেহ জেগেছে-এখনো তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে এই হানাহানি করেই চলবে কি না, প্রত্যেকের মুখেই স্পষ্ট দ্বিধার ভাব, প্রত্যেকের অন্তরে একই প্রশ্ন, কিসের জন্য, কার জন্য আমি অপরকে মারব আর নিজে মরব?…তোমরা যাকে খুশি মারতে পার, কিন্তু আমি আর ওকাজ করতে চাই না! সন্ধ্যা নাগাদ এই চিন্তা সকলের মনেই দানা বেঁধে উঠল। যে কোনো মুহূর্তে এইসব মানুষরা নিজেদের কাজে নিজেরাই আতংকিত হয়ে উঠতে পারে, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে যে কোনো দিকে চলে যেতে পারে।
কিন্তু হায়, যদিও যুদ্ধের শেষের দিকে সৈন্যরা নিজেদের কাজকে নিজেরাই ভয় করতে লাগল, সেখান থেকে সরে যেতে পারলে তারা সুখীই হত, তবু একটা দুর্বোধ্য রহস্যজনক শক্তি তাদের চালাতে লাগল, তখনো তারা কামান-বন্দুক নিয়ে তৈরি হল, গুলি-বারুদ ভরল, নিশানা ঠিক করল, আগুন ধরাল, অথচ প্রতি তিনজন গোলন্দাজের মাত্র একজন বেঁচে আছে, তারা চলছে টলতে টলতে আর ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে, ঘামে, রক্তে ও বারুদে তাদের সারা শরীর ছেয়ে গেছে। আগের মতোই দ্রুতগতিতেই ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে দুই পক্ষ থেকেই কামানের গোলা ছুটছে, মানুষের দেহ বিধ্বস্ত হচ্ছে আর যে ভয়ংকর কাজটি পরিচালিত হচ্ছে কোন মানুষের ইচ্ছায় নয়, মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা ঈশ্বরের ইচ্ছায়, সে কাজ সমানে এগিয়ে চলেছে।
