সাইমেন! তুমি ডানিয়েল কুপার বাজাতে জান?
এটা কাউন্টের প্রিয় নাচ; যৌবনে এ-নাচ সে অনেক নেচেছে।
বাপিকে দেখ! সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাতাশা চেঁচিয়ে উঠল। তার হাসি সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ।
সত্যি সত্যি উপস্থিত সকলেই হাসি মুখে এই আনন্দময় বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে দেখতে লাগল। দীর্ঘদেহ, শক্তসমর্থ সঙ্গিনী মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকে পাশে নিয়ে ভদ্রলোক তাকে জড়িয়ে ধরল, সময় কাটাতে লাগল, ঘাড় সোজা করল, পা বাড়িয়ে আস্তে আস্তে ঠুকতে লাগল, হাসির ঝোঁকে চওড়া মুখটাকে আরো চওড়া করে আসন্ন ঘটনার জন্য দর্শকদের প্রস্তুত করে নিল। তারপর ডানিয়েল কুপারের উত্তেজনাপূর্ণ মধুর বাজনা (অনেকটা পল্লী-নৃত্যের মতো) শুরু হতেই হঠাৎ নাচ-ঘরের সবগুলি দরজা বাড়ির দাসদাসীতে একেবারে ভরে গেল-একদিকে পুরুষরা, অন্যদিকে মেয়েরা; তাদের চোখ-মুখ চকচক করছে; মালিকের ফুর্তি দেখতে তারাও হাজির হয়েছে।
একটা দরজায় দাঁড়িয়ে নার্সটি সোচ্চারে বলে উঠল, মালিককে দেখ! ঠিক যেন ঈগল পাখিটি!
কাউন্ট এক সময় ভালো নাচত, নাচতে জানে। তার সঙ্গিনী ভালো নাচতে পারেও না, পারতে চায়ও না। তার প্রকাণ্ড দেহটা সোজা হলো, শক্তিশালী হাত দুটো ঝুলে পড়ল, শুধু তার শক্ত সুন্দর মুখকানিই যা নাচে অংশ নিল। কাউন্ট তার মোটা শরীরের সবটা দিয়ে যে ভাব প্রকাশ করছে, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা শুধু তার উদ্ভাসিত মুখ ও কম্পিত নাক দিয়েই সেই ভাব প্রকাশ করছে। কাউন্ট যেমন তার শরীরটাকে পাক খাইয়ে লঘু পদক্ষেপে নাচতে নাচতে দেহভঙ্গির অপ্রত্যাশিত ক্ষিপ্রতা ও নমনীয়তার দ্বারা দর্শকদের মোহিত করছে, তেমনি মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাও শরীরের ঈষৎ ঝাঁকুনিতে, ঘুরবার বা পা ফেলবার সময় কাঁধের ও বাহুর সামান্য মোচড়েই দর্শকদের উপর প্রচুর প্রভাব বিস্তার করত পারল; তার দেহের আকার ও বয়সের কঠোরতার কথা ভেবে সকলেই তার প্রশংসা করল। নাচ ক্রমেই জমে উঠল। অন্য সকলে নিজেদের নাচের কথা ভুলে কাউন্ট ও মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকেই দেখতে লাগল। তবু নাতাশা প্রত্যেকের পোশাক বা আস্তিন টেনে ধরে বলছে, বাপিকে দেখ! নাচের বিরতি হতেই কাউন্ট বাজনাদারদের আরো জোরে বাজাতে বলে। বাজনা দ্রুতর, আরো দ্রুততর হয় : কাউন্ট আরো, আরো, আরো হাল্কাভাবে ঘুরতে থাকে, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার চারদিকে উড়তে থাকে, কখনো আঙুলের উপর, কখনো গোড়ালির উপর ভর দিয়ে শেষ পর্যন্ত সঙ্গিনীকে একটা পাক দিয়ে তাকে তার আসনে পৌঁছে দিয়ে কাউন্ট তার শেষ খেলা দেখাল : হাল্কা পাটা পিছনে দিয়ে, ঘাম-ঝরা মাথাটাকে নিচু করে, হেসে, দু-হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল; নাতাশাসহ সমস্ত দর্শকের প্রশস্তি ও উচ্চহাসিতে ঘর ভরে গেল। দুই নাচের সঙ্গী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল; ঘন গন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল; কেম্বিকের রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে লাগল।
কাউন্ট বলল, আমাদের কালে এই রকমই আমরা নাচতাম প্রিয় বন্ধবী।
আস্তিন গুটিয়ে জোর নিঃশ্বাস ফেলে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, একেই তো বলে ডানিয়েল কুপার!
০১.৩ রস্তভদের নাচ-ঘরে
অধ্যায়-২১
রস্তভদের নাচ-ঘরে যখন দু-নম্বর নাচ চলছিল, ক্লান্ত বাজনাদাররা ভুল করছিল, আর শ্রান্ত পরিচারক ও রাঁধুনিরা রাতের খাবারের আযোজন করছিল, সেই সময় কাউন্ট বেজুখভের ষষ্ঠবার রোগের আক্রমণ হলো। ডাক্তাররা জানিয়ে দিল, নিরাময় অসম্ভব। নীরব দোষ-স্বীকৃতির পরে মুমূর্ষ লোকটির শেষ ভোজনানুষ্ঠান করা হলো, তৈল লেপন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়; এই সমস্ত অনুষ্ঠানের সময় সাধারণতই যা হয়ে থাকে, বাড়িতে একটা হট্টগোল ও উৎকণ্ঠা চলতে লাগল। বাড়ির বাইরে ফটকের ওপাশে একদল মুদাফরাস হাজির আছে; কোনো গাড়ি এলেই তারা লুকিয়ে পড়ছে; আসলে একটা ব্যয়বহুল অন্ত্যেষ্টির নির্দেশের আশায় তারা অপেক্ষা করে আছে। মস্কোর সামরিক শাসনকর্তা কাউন্টের স্বাস্থ্যের খবর নিতে এতদিন পর্যন্ত বরাবর এড-ডি-কংকেই পাঠিয়ে এসেছে; ক্যাথারিনের দরবারের বিখ্যাত প্রবীণ সদস্য কাউন্ট বেজুখভকে শেষ বিদায় জানাতে আজ সন্ধ্যায় সে নিজেই এসেছে।
জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা ঘরটিতে ভিড় জমে গেছে। মুমূর্ষ লোকটির পাশে নির্জনে প্রায় আধ ঘণ্টা কাটিয়ে সামরিক শাসনকর্তা যখন বেরিয়ে এল তখন সকলেই সম্ভমে উঠে দাঁড়াল। কোনোরকমে তাদের অভিবাদকে স্বীকৃতি জানিয়ে এবং তা তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার, পুরোহিত ও পরিবারের আত্মীয়স্বজনের স্থির দৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টায় সামরিক শাসনকর্তা চলে গেল। গত কয়েকদিনেই প্রিন্স ভাসিলি কিছুটা শুকিয়ে গেছে। বিবর্ণ হয়ে গেছে; নিচু গলায় সামরিক শাসনকর্তার কানে কানে বারকয়েক কি যেন বলতে বলতে সে ফটক পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিল।
সামরিক শাসনকর্তা চলে গেলে প্রিন্স ভাসিলি এক পায়ের উপর অপর পাটা তুলে, হাঁটুর উপর কনুই রেখে হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে একাকি নাচ-ঘরের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। সেইভাবে কিছুক্ষণ বসে থেকে সে উঠে দাঁড়াল, ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকাল, তারপর অস্বাভাবিক দ্রুত পা ফেলে লম্বা করিডরটা পেরিয়ে বাড়ির পিছন দিককার বড় প্রিন্সেসের ঘরের দিকে চলে গেল।
