সহমর্মিতা, ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা, যারা আমাদের ভালোবাসে আর যারা আমাদের ঘৃণা করে তাদের প্রতি ভালোবাসা, শত্রুকে ভালোবাসা, হ্যাঁ, যে ভালোবাসার কথা ঈশ্বর পৃথিবীতে প্রচার করেছেন আর প্রিন্সেস মারি আমাকে শিখিয়েছে অথচ আমি বুঝিনি-সেই ভালোবাসার জন্যই জীবনকে ছেড়ে যেতে আমি দুঃখবোধ করেছি, বেঁচে থাকলে সেটাই হবে আমার অবলম্বন। কিন্তু এখন যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তা আমি জানি!
.
অধ্যায়-৩৮
নিহত ও আহতদের দেহে সমাকীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর দৃশ্য, বক্তিগতভাবে পরিচিত জনাবিশেক সেনাপতির নিহত বা আহত হবার সংবাদ এবং নিজের একদা শক্তিমান বাহুর অক্ষমতার চেতনা–সবকিছু মিলিয়ে নেপোলিয়নের উপর একটা অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, অথচ সাধারণত নিহত ও আহতদের দেখতে তার ভালোই লাগে, তার বিচারে তাতে মনের শক্তি-পরীক্ষা হয়। মনের যে শক্তিকে সে তার কৃতিত্ব ও মহত্ত্বের আকর বলে মনে করে, আজ কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর রূপটা তার সেই মনোবলকেই পর্যদস্ত করে তুলেছে। দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শেভার্দিনো গোল পাহাড়ে ফিরে গেল, বিবর্ণ, ফোলা, ফ্যাকাসে। মুখে একটা টুলের উপর বসে পড়ল, চোখ দুটি আবছা, নাকটা লাল, কণ্ঠস্বর কর্কশ, চোখ নিচু করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কান পেতে শুনছে গোলাগুলির শব্দ। বেদনার্ত অবসন্নতায় সে নিজের কাজের পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করছে, এ কাজের সেই হোতা, অথচ তার গতিরোধ করতে সে অক্ষম। জীবনের যে কৃত্রিম অপচ্ছায়াকে সে এতকাল সেবা করে এসেছে, মুহূর্তের জন্য হলেও একটা ব্যক্তিগত মানবিক অনুভূতি তার জায়গা দখল করে নিল। যুদ্ধক্ষেত্রে যে যন্ত্রণা ও মৃত্যুকে সে প্রত্যক্ষ করেছে, নিজের মধ্যেই তাকে যেন অনুভব করল। মাথার ও বুকের উপর যে বোঝা চেপে আছে তা যেন নিজের যন্ত্রণা ও মৃত্যুর সম্ভাবনাকেই স্মরণ করিয়ে দিল। সেইমুহূর্তে মস্কো, বা জয়, বা গৌরব-কোনো কিছুই সে কামনা করল না (আরো গৌরবের কী প্রয়োজন তার আছে?) তার একমাত্র কামনা বিশ্রাম, প্রশান্তি ও মুক্তি।
একটি অ্যাডজুটান্ট এসে খবর দিল, তার হুকুমমতো দুশো কামান থেকে একযোগে রুশদের উপর গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে, কিন্তু তবু তারা ঘাঁটি আগলে রেখেছে।
অ্যাডজুটান্ট বলল, আমাদের গোলাবর্ষণে কাটা ফসলের মতো ওরা সারি সারি ঢলে পড়ছে, কিন্তু তবু লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
আরো মৃত্যু তারা চয়! নেপোলিয়ন কর্কশ গলায় বলল।
কথাটা শুনতে না পেয়ে অ্যাডজুটান্ট বল, স্যার?
ভুরু কুঁচকে নেপোলিয়ন বলল, আরো মৃত্যু তারা চায়! তাই তারা পাবে!
যারা এই ঘটনাবলীর অংশীদার তাদের মধ্যে এ ব্যাপারে যার দায়িত্ব সবচাইতে বেশি সেই মানুষটির মন ও বিবেক যে শুধু এই দিনটিতে ও এই সময়েই অন্ধকারে ঢেকে গেল তা কিন্তু নয়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে বুঝতে পারেনি সত্য, শিব ও সুন্দর কাকে বলে, বুঝতে পারেনি কি তার এইসব কাজের তাৎপর্য যা একান্তভাবে সত্য ও শিবের বিপরীত, যা সর্বপ্রকার মানবিকতা থেকে এতদূরে অবস্থিত যে তার তাৎপর্য সে কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারেনি। অর্ধেক পৃথিবীর দ্বারা প্রশংসিত স্বীয় কর্মধারাকে সে কখনো অস্বীকার করতে পারেনি, আর তাই সত্য, শিব ও মানবতাকেই সে অস্বীকার করেছে।
নিহত ও পঙ্গু মানুষের দেহে আকীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের ভিতর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে শুধু সেই একটি দিনই সে হিসাব করেনি যে তাদের মধ্যে প্রতি একজন ফরাসির জন্য কতজন রুশ সেখানে পড়ে আছে, এবং মাত্র সেই একটি দিনই এই হিসেবের মধ্যে মিথ্যা করে আনন্দের কারণ খুঁজতে চেষ্টা করেনি যে প্রতি একজন ফরাসির বিনিময়ে পাঁচজন রুশ সেখানে পড়ে আছে। শুধু সেই একটি দিনই সে প্যারিসে লিখিত চিঠিতে বলেনি যে যুদ্ধক্ষেত্রটি অপূর্ব, কারণ সেখানে পড়ে আছে হাজার হাজার মৃতদেহ, কিন্তু সেন্ট হেলেনা দ্বীপের শান্ত নির্জনতার মধ্যে সে যখন স্থির করল যে জীবনে যেসব মহৎ কর্ম সে করেছে তার বিবরণ লিখেই সে অবসরের দিনগুলি কাটিয়ে দেবে, তখনো সে লিখেছে, এই রুশ যুদ্ধের হওয়ার উচিত ছিল আধুনিক কালের সব চাইতে জনপ্রিয় যুদ্ধ : এ যুদ্ধ শুভবুদ্ধির যুদ্ধ, সত্যিকারের স্বার্থ, শান্তি ও সকলের নিরাপত্তার যুদ্ধ, এ যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিকামী ও রক্ষণশীল।
এ যুদ্ধ একটি মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য যুদ্ধ, অনিশ্চয়তার অবসান ও নিরাপত্তার সূচনার যুদ্ধ। সকলের কল্যাণ ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ একটি নতুন দিগন্ত উঘাটিত হতে চলেছিল। ইওরোপিয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বাকি ছিল শুধু তাকে সংগঠিত করে তোলা।
এইসব বৃহৎ লক্ষ্যকে পূর্ণ করে, সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, আমার নিজস্ব কংগ্রেস ও পবিত্র মৈত্রী গড়ে ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু সে ভাবনা-চিন্তাগুলি আমার কাছ থেকে চুরি করা হল। বৃহৎ রাষ্ট্র-কর্ণধারদের সেই পুনর্মিলন সভায় এক পরিবারের মতো আমরা আমাদের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করতাম এবং মনিবের কাছে করণিকের মতো তার বিবরণ জনগণের কাছে পেশ করতাম।
বস্তুত, এইভাবে ইওরোপ একটা জাতি হিসেবে গড়ে উঠত, এবং যে-কোনো মানুষ যে কোনো স্থানে বেড়াতে বের হলে একই পিতৃভূমিতে বাস করার অনুভূতি লাভ করত। আমি অবশ্যই দাবি করব যে সব নদীতে পথ চলবার অধিকার সকলকে দেওয়া হোক, সব সমুদ্র আসুক সকলের অধিকারে, আর এখন থেকে সব বিরাট সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রপ্রধানদের রক্ষীতে পরিণত করা হোক।
