অনেক সকলের মতোই প্রিন্স আন্দ্রুও চকচকে চোখে তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা সান্ত্বনা পেল। সে ভাবল, এখন কি সবই সমান নয়? সেখানেই বা কি হবে, আর এখানেই বা কি ছিল? জীবনকে ছেড়ে যেতে কেন আমি এত অনিচ্ছুক হয়েছিলাম? এই জীবনে এমন কিছু ছিল যা আমি বুঝিনি এবং এখনো বুঝি না…
.
অধ্যায়-৩৭
রক্তমাখা এপ্রন পরে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এল। যাতে চুরুটে রক্ত না লাগতে পারে সেইজন্য চুরুটটা ধরা আছে তার এক হাতের বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠার ফাঁকে। আহতদের মাথার উপর দিয়ে সে চারদিকে তাকাতে লাগল। আসলে তার একটু বিশ্রাম দরকার। কিছুক্ষণের জন্য ডান দিক থেকে বাঁ দিকে মাথাটাকে ঘুরিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে নিচে তাকাল।
জনৈক ড্রেসার প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখিয়ে দিলে ডাক্তার বলল, ঠিক আছে, এক্ষুনি। তারপর লোকজনদের বলল তাকে তাবুর ভিতরে নিয়ে যেতে।
অপেক্ষারত আহতদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠল।
একজন বলে উঠল, দেখা যাচ্ছে পরপারে যাবার পথেও একমাত্র দ্ৰজনরাই আগে সুযোগ পাবে!
প্রিন্স আন্দ্রুকে ভিতরে নিয়ে সদ্য ধুয়ে-দেওয়া একটা টেবিলে শুইয়ে দেওয়া হল। তাবুর ভিতরে কি আছে প্রিন্স আন্দ্রু ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না। চারদিকের করুণ আর্তনাদ, আর নিজের উরু, পাকস্থলী ও পিঠের তীব্র যন্ত্রণার জন্য অন্য কোনোদিকে সে মন দিতে পারছে না। সে যা কিছু দেখতে পেল সব মিলেমিশে একাকার হয়ে তার মনে হল নিচু তাবুটা যেন রক্তাক্ত উলঙ্গ মানবদেহে ভর্তি হয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে অগস্ট মাসের এক উত্তপ্ত দিনে ঠিক এই দৃশ্যই সে দেখেছিল স্মোলেনস্ক রোডের পাশে একটা নোংরা পুকুরের মধ্যে।
তাঁবুর মধ্যে তিনটি অপারেশন টেবিল দুটোতে লোক ছিল, তৃতীয়টাতে প্রিন্স আন্দ্রুকে শুইয়ে দেওয়া হল। তার একেবারে কাছের টেবিলে বসে আছে একটি তাতার। পাশে খুলে রাখা ইউনিফর্ম দেখে মনে হল সে একজন কসাক। চারজন সৈনিক তাকে ধরে আছে, আর চশমা চোখে একজন ডাক্তার তার পেশীবহুল বাদামি পিঠে ছুরি চালাচ্ছে।
উঃ, উঃ, উঃ! উঁচু চোয়ালের হাড় ও থ্যাবড়া নাকওয়ালা ফোলা মুখটা তুলে সবগুলো শাদা দাঁত বের করে সে অবিরাম আর্তনাদ করছে আর শরীরটাকে এঁকিয়ে-বেঁকিয়ে নাড়ছে। আর একটা টেবিলে একটি লম্বা, ভুড়িওয়ালা লোক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। তার কোকড়া চুল, মুখের রং ও মাথার আকৃতি দেখে তাকে প্রিন্স আন্দ্রুর বেশ পরিচিত বলে মনে হল। কয়েকজন ড্রেসার বুকের উপর চাপ দিয়ে তাকে ধরে রেখেছে। দুজন ডাক্তার তার একটা রক্তাক্ত পা নিয়ে কি যেন করছে। তাতারটির কাজ শেষ হলে একটা ওভারকোট দিয়ে তাকে ঢেকে রেখে চশমা-চোখে ডাক্তারটি হাত ধুয়ে প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে এগিয়ে এল।
প্রিন্স আন্দ্রুর মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে দ্রুত পায়ে সরে গেল।
ওর পোশাক খুলে ফেল! কিসের জন্য দেরি করছ? কুদ্ধকণ্ঠে সে ড্রেসারদের বলল।
ড্রেসাররা যখন আস্তিন গুটিয়ে অদ্রুিত বোতাম খুলে তার পোশাক খুলতে লাগল তখন প্রিন্স আন্দ্রুর চোখের সামনে ভেসে উঠল শৈশবের দূরতম স্মৃতিগুলি। ডাক্তার ঝুঁকে পড়ে তার ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। কাকে যেন ইশারায় কি বলল, আর তলপেটের তীব্র যন্ত্রণায় প্রিন্স আন্দ্রু জ্ঞান হারাল। যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন উরুর ভাঙা হাড়গুলো বের করে ফেলা হয়েছে, ছেঁড়া মাংসটা কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাধা হয়ে গেছে। তার চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রু চোখ খুলতে ডাক্তার ঝুঁকে পড়ে তাকে নিঃশব্দে চুমো খেয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
অনেক যন্ত্রণা সহ্য করার পরে এখন প্রিন্স আন্দ্রুর এমন ভালো লাগছে যে দীর্ঘকাল সেরকম সুখের অনুভূতি তার হয়নি। জীবনের সবচাইতে সেরা সুখের মুহূর্তগুলি–বিশেষ করে প্রথম শৈশবের সেই দিনগুলি যখন পোশাক খুলে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হত, তার উপর ঝুঁকে পড়ে নার্স তাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাত, আর বালিশে মাথা ডুবিয়ে দিয়ে জীবনটাকে সে বড় বেশি করে ভালোবাসত-তার স্মৃতিতে ফিরে এল, সে স্মৃতি যেন অতীতের নয়, বর্তমানের ঘটনা।
যে আহত লোকটির মাথাটা প্রিন্স আন্দ্রুর পরিচিত বলে মনে হয়েছিল এবার ডাক্তাররা তাকে নিয়ে পড়ল : তুলে ধরে তারা তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করছে।
আমাকে ওটা দেখান…ওঃ, উঃ…ওঃ! উঃ! তার ভয়ার্ত আর্তনাদ ও চাপা কান্না কানে এল।
সে কান্নার শব্দ শুনে প্রিন্স আন্দ্রুরও কান্না পেল। অগৌরবে তার মৃত্যু হচ্ছে বলে, অথবা জীবনকে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হচ্ছে বলে, অথবা শৈশবের স্মৃতিগুলি ফিরে এসেছে বলে, অথবা সে যন্ত্রণা ভোগ করছে, অন্যরা যন্ত্রণা ভোগ করছে, আর এই মানুষটি এমন করুণভাবে আর্তনাদ করছে বলে,-কারণ যাই হোক না কেন তারও ইচ্ছা হল শিশুর মতো একটু কাঁদতে।
জমাট রক্তমাখা বুট-পরা কাটা পাটা সেই আহত লোকটিকে দেখানো হল।
ওঃ! ওঃ, উঃ সে মেয়েমানুষের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
পাশে দাঁড়ানো ডাক্তারটি চলে গেল। প্রিন্স আন্দ্রুনিজের মনেই বলল, হা ঈশ্বর! এসব কি? কেন সে এখানে এল?
এইমাত্র যে লোকটির পা কেটে বাদ দেওয়া হল তাকে সে চিনতে পেরেছে। লোকটি আনাতোল কুরাগিন। সকলে কোলে তুলে নিয়ে তাকে এক গ্লাস জল খাওয়াতে চাইছে, কিন্তু তার ফুলে-ওঠা কাঁপা ঠোঁট জলে চুমুক দিতে পারছে না। আনাতোল যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হ্যাঁ, সেই তো বটে! হ্যাঁ, এই লোকটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক বড়ই ঘনিষ্ঠ, বড়ই বেদনার। কিন্তু আমার শৈশবের সঙ্গে, আমার জীবনের সঙ্গে লোকটির কিসের সম্পর্ক নিজেকে প্রশ্ন করে সে কোনো জবাব পেল না। সহসা একটা অপ্রত্যাশিত নতুন স্মৃতি শৈশবের আনন্দময় ভালোবাসার রাজ্য থেকে তার সামনে এসে হাজির হল। ১৮১০-এর একটা বল-নাচের আসরে প্রথম যেদিন নাতাশাকে দেখেছিল সেদিনের কথা মনে পড়ল। এতক্ষণে তার মনে পড়ল এই যে লোকটি অশ্রুপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে তার সঙ্গে কিসের সম্পর্কে সে বাধা। সবকিছুই তার মনে পড়ে গেল, আর লোকটির প্রতি উচ্ছ্বসিত করুণায় ও ভালোবাসায় তার মনটা ভরে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না, পার্শ্ববর্তী লোকটির জন্য, নিজের জন্য, নিজেরও অন্য সকলের ভুলের জন্য তার দুই চোখ জলে ভরে উঠল।
