সে চেঁচিয়ে বলল, অ্যাডজুটান্ট! ওদের ভিড় করতে নিষেধ কর।
তার নির্দেশ মতো কাজ করে অ্যাডজুটান্ট প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে এগিয়ে এল। অন্য দিক থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এল জনৈক জনৈক ব্যাটেলিয়ন-কমান্ডার।
ওই দেখ! একটি ভীত সৈনিক আর্তকণ্ঠে বলে উঠল, আর একটা গোলা দ্রুতবেগে উড়তে নিচের দিকে নেমে আসা পাখির মতো প্রায় নিঃশব্দে এসে পড়ল প্রিন্স আন্দ্রুর দুই পা দূরে, ব্যাটেলিয়ন-কমান্ডারের ঘোড়াটার একেবারে কাছে। ঘোড়াটা নাকের শব্দ করে এমনভাবে লাফিয়ে একপাশে সরে গেল যে মেজরের ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ঘোড়ার ভয় সৈনিকদের মধ্যেও সঞ্চারিত হল।
সপাটে মাটিতে শুয়ে পড়ে অ্যাডজুটান্ট চেঁচিয়ে বলল, শুয়ে পড়।
প্রিন্স আন্দ্রু ইতস্তত করল। ধূমায়মান গোলাটা তার ও শুয়ে-পড়া অ্যাডজুটান্টের মাঝখানে লাটুর মতো ঘুরতে লাগল।
ঘূর্ণায়মান কালো গোলকটা থেকে যে ধোয়া পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে সেদিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, এই কি মৃত্যু? আমি মরতে পারি না, মরতে চাই না। জীবনকে আমি ভালোবাসি ভালোবাসি এই পৃথিবী, এই ঘাস, এই বাতাস… এইসব ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়ল যে সকলেই তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অ্যাডজুটান্টকে বলল, এটা লজ্জার কথা! কি…।
তার কথা শেষ হল না। ঠিক সেইমুহূর্তে একই সঙ্গে ভেসে এল একটা বিস্ফোরণের শব্দ, জানালার ভাঙা কাঁচের মতো ছিটকে-আসা বোমার টুকরোর হিস-হিস শব্দ, আর দমবন্ধ-করা বারুদের গন্ধ, হাত তুলে একপাশে সরে গিয়েই প্রিন্স আন্দ্রু উপুড় হয়ে পড়ে গেল। কয়েকজন অফিসার ছুটে এল। তলপেটের ডান দিক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ঘাসের অনেকটা জায়গা লাল করে দিল।
অসামরিক কর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে এসে অফিসারদের পিছনে দাঁড়াল। প্রিন্স আন্দ্রু ঘাসের উপর মুখ খুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, ঘর্ঘর শব্দে তার নিঃশ্বাস পড়ছে জোরে জোরে।
অপেক্ষা করছ কিসের জন্য? এগিয়েএস!
চাষীরা এগিয়ে গিয়ে কাঁধ ও পা ধরে তাকে তুলল, সে করুণকণ্ঠে আর্তনাদ করতে লাগল, পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে চাষীরা আবার তাকে নামিয়ে দিল।
কে যেন চেঁচিয়ে বলল, ওকে ধরে তোলা! যা হতে হোক!
আবার তাকে কাধ করে তুলে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেওয়া হল।
হা ঈশ্বর!–অফিসারদের মুখে নানা কথা শোনা গেল।
একজন অ্যাডজুটান্ট বলল, আমার কানে একেবারে পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল।
স্ট্রেচার কাঁধে নিয়ে চাষীরা দ্রুতপায়ে ড্রেসিং-স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেল।
একতালে পা ফেলে! আঃ…এই চাষীরা! অসমান পা ফেলে চাষীরা হাঁটার দরুন স্ট্রেচারটা দুলছিল, তাই তাদের কাঁধের উপর হাতের চাপ দিয়ে একজন অফিসার চেঁচিয়ে তাদের সংযত করল।
সামনের দিককার চাষীটি বলল, একতালে পা ফেল ফেদর…আমি বলছি ফেদর!
পিছন থেকে আর একটি চাষী পায়ে পা মিলিয়ে বলল, এবার ঠিক হয়েছে!
দিমোখিন ছুটে এসে স্ট্রেচারের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল, ইয়োর এক্সেলেন্সি! আঁ, প্রিন্স!
প্রিন্স আন্দ্রু চোখ মেলে তার দিকে তাকাল, আবার তার চোখের পাতা নেমে এল।
অসামরিক কর্মীরা প্রিন্স আন্দ্রুকে জঙ্গলের পাশে অবস্থিত ড্রেসিং-স্টেশনে নিয়ে গেল। বার্চ গাছের জঙ্গলের এক প্রান্তে তিনটি তাঁবু খাঁটিয়ে ড্রেসিং-স্টেশনটা তৈরি করা হয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে অনেক গাড়ি-ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়াগুলো চলমান বালতি থেকে যই খাচ্ছে, যে দানাগুলো নিচে পড়ছে চড় ইগুলো উড়ে উড়ে তাই খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। রক্তের গন্ধ পেয়ে কিছু কাক বার্চ গাছের মধ্যে উড়তে উড়তে অধৈর্য হয়ে কা কা করে ডাকছে। তাবুর চারদিকে পাঁচ একরের বেশি জমি জুড়ে নানা পোশাকপরা রক্তমাখা সৈনিকরা শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে আছে। আহতদের ঘিরে স্ট্রেচার-বাহক সৈনিকরা বিন্দু মুখে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। অফিসাররা তাদের বৃথাই সরে যেতে বলছে, তারা দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে আহতদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁবুর ভিতর থেকে কখনো ভেসে আসছে ক্রুদ্ধ চিৎকার, কখনো যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ। মাঝে মাঝে ড্রেসাররা ছুটে বেরিয়ে আসছে, কেউ জল আনতে যাচ্ছে, কেউ বা জানাচ্ছে কে তার পরে যাবে। নিজ নিজ পালার জন্য অপেক্ষমাণ সৈনিকরা আর্তনাদ করছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, কাঁদছে, কাতরাচ্ছে, অভিশাপ দিচ্ছে, আবার ভদকাও চাইছে। কারো বা বিকার দেখা দিয়েছে। প্রিন্স আন্দ্রুর বাহকরা আহত সৈনিকদের ডিঙিয়ে রেজিমেন্ট-কমান্ডার হিসেবে তাকে নিয়ে একটা তাবুর একেবারে কাছে গিয়ে নির্দেশের অপেক্ষায় থেমে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু চোখ মেলল, অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতেই পারল না চারদিকে কি হচ্ছে। তার মনে পড়ল সেই মাঠ, সেই জঙ্গল, সেই ঘূর্ণায়মান কালো গোলক, আর জীবনের প্রতি সেই আকস্মিক উচ্ছ্বসিত ভালোবাসা। তার থেকে দুই পা দূরে গাছের ডালে হেলান দিয়ে মাথায় ব্যান্ডেজ-বাঁধা একজন সুদর্শন, দীর্ঘদেহ নন-কমিশন্ড অফিসার সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে জোর গলায় কথা বলছে। তার মাথায় ও পায়ে বুলেটের আঘাত লেগেছে। সাগ্রহে তার কথা শুনতে আহত সৈনিক ও স্ট্রেচার-বাহকরা তাকে ঘিরে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে।
জ্বরের জন্য তার চোখ দুটো চকচক করছে, চারদিকে তাকিয়ে সে বলছে, সেখান থেকে তাকে লাথি মেরে দূর করে দিলাম, স্বয়ং রাজাকেও চেপে ধরেছিলাম। সেইমুহূর্তে যদি রিজার্ভ পৌঁছে যেত, তাহলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না হে বাপুরা! আমি সত্যি বলছি…
