দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে, ঠোঁট দুটি বেঁকিয়ে ওলযোগেন নীরবে এক পাশে সরে গেল। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটির নির্বোধ আত্মপ্রবঞ্চনা দেখে সে অবাক হয়ে গেছে।
একটি সৌম্য, সুদর্শন জেনারেলকে পাহাড় বেয়ে উঠে আসতে দেখে কুতুজভ বলে উঠল, এই তো, এই তো এসেছে, আমার নায়ক এসেছে!
লোকটি রায়েভস্কি, আজ সারাটাদিন সে কাটিয়েছে বরদিনো যুদ্ধক্ষেত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে।
রায়েভস্কি জানাল, আমাদের সৈন্যরা দৃঢ়তার সঙ্গে ঘাঁটি আগলে রেখেছে, ফরাসিরা আর আক্রমণ করতে সাহস পাচ্ছে না।
তার কথা শুনে কুতুজভ ফরাসিতে বলল, তাহলে অন্য কারো কারো মতো তুমি মনে কর না যে আমাদের পশ্চাদপসরণ করতেই হবে?
রায়েভস্কি উত্তর দিল, ঠিক উল্টো ইয়োর হাইনেস, চুড়ান্ত যুদ্ধের আগে যারা অনমনীয় থাকে তারাই জয়লাভ করে। আর আমার মতে…
কুতুজভ আর অ্যাডজুটান্টকে ডাকল, কেসারভ! এখানে কালকের হুকুমটা লিখে ফেল। অন্য একজনকে উদ্দেশ করে বলল, আর তুমি ঘোড়া ছুটিয়ে রণক্ষেত্রে চলে যাও, ঘোষণা করে দাও যে কাল আমরা আক্রমণ করব।
কুতুজভ যখন রায়েভস্কির সঙ্গে কথা বলছিল এবং সেদিনের ঘোষণাটা বলে যাচ্ছিল, তখন ওলযোগেন বার্কলের কাছ থেকে ফিরে এসে জানাল, জেনারেল বার্কলে দ্য তলির ইচ্ছা, ফিল্ড-মার্শাল যে হুকুম জারি করেছেন সেটা তাকে লিখিতভাবে জানানো হোক।
ওলযোগেনের দিকে না তাকিয়েই কুতুজভ প্রাক্তন প্রধান সেনাপতির ইচ্ছামতো হুকুমটা লিখে দেবার নির্দেশ দিল। যে রহস্যময় সংজ্ঞাতীত বন্ধন গোটা বাহিনীর মধ্যে একই মনোভাব অক্ষুণ্ণ রাখে, যাকে বলা হয়, সেনাবাহিনীর মনোবল, এবং যেটা যুদ্ধের প্রধান শক্তিস্বরূপ, তারই সাহায্যে কুতুজভের কথাগুলি, পরের দিনের যুদ্ধের হুকুম-নামা, সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত জানাজানি হয়ে গেল।
কিন্তু সেনাবাহিনীর দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত যে একই কথা অথবা একই হুকুম পৌঁছে গেল তা কিন্তু নয়। মুখে মুখে যেকথা নানা প্রান্তে পৌঁছে গেল তার সঙ্গে কুতুজভের কথার কোনো মিলই রইল না, কিন্তু তার যা বক্তব্য সেটা সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ল, কারণ তার বক্তব্যটা কোনোরকম সুকৌশল হিসেবের ফল নয়, বরং এমন একটা অনুভূতির ব্যাপার যা প্রধান সেনাপতি থেকে আরম্ভ করে প্রতিটি রুশ-এর মনে সমানভাবে বিদ্যমান।
আগামীকাল শত্রুকে আক্রমণ করা হবে একথা জেনে, এবং যেটা তাদের মনের কথা উচ্চতম মহল থেকে তারই সমর্থন শুনতে পেয়ে, ক্লান্ত ও অস্থিরচিত্ত সৈনিকরা নতুন করে সান্ত্বনা পেল, উজ্জীবিত হয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-৩৬
রিজার্ভ বাহিনীর অন্যতম প্রিন্স আন্দ্রুর রেজিমেন্টটি বেলা একটার পর পর্যন্তও সেমেনবঙ্কের পিছনে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণের মধ্যেও নিষ্ক্রিয় হয়ে অবস্থান করছিল। দুশোর বেশি সৈন্যকে হারিয়ে হারিয়ে বেলা দুটো নাগাদ সেই রেজিমেন্টকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সেমেনভঙ্ক ও গোল পাহাড় কামানশ্রেণীর মধ্যবর্তী একটা পায়ে পায়ে চষে ফেলা যইয়ের ক্ষেতে। সেদিন একটা থেকে দুটোর মধ্যে শত্রুপক্ষের কয়েক শ কামান থেকে প্রচণ্ডভাবে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে, আর হাজার হাজার সৈন্য মারা পড়েছে। সেই জায়গা থেকে না নড়ে এবং একটিও গুলি না চালিয়ে রেজিমেন্টের এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য মারা গেল। সম্মুখ থেকে এবং বিশেষ করে ডান দিক থেকে, ধোয়ার ভিতর হতে গর্জে উঠছে কামান, আর সেই রহস্যময় ধোয়ার রাজ্য থেকে দ্রুত শব্দে ছুটে আসছে কামানের গোলা, আর ধীর গতিতে ছুটে আসছে বন্দুকের গুলি। যেন তাদের একটু বিশ্রাম দেবার জন্যই গোলাগুলি ছুটছে মাথার উপর দিয়ে, কিন্তু কখনো কখনো মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই বেশ কয়েকজন সৈন্যকে ছিনিয়ে নিচ্ছে রেজিমেন্টের ভিতর থেকে, আর আহতদের বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং নিহতদের টেনে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
রেজিমেন্টের অন্য সকলের মতোই বিবর্ণ, বিষণ্ণ মুখে প্রিন্স আন্দ্রু একটা যইক্ষেতের পার্শ্ববর্তী মাঠের শেষ প্রান্তে পায়চারি করছে। মাথাটা নুয়ে পড়েছে, দুটো হাত রেখেছে পিছনের দিকে। তার কিছুই করার নেই, দেবার মতো হুকুমও কিছু নেই। সবই চলছে আপনা থেকে। নিহতদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আহতদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সৈনিকরা আরো ঘন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনো সৈন্য পিছিয়ে পড়লেও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এগিয়ে আসছে। প্রথমে প্রিন্স আন্দ্রু মনে করেছিল যে সৈন্যদের মনে সাহস যোগাননা এবং তাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তার কর্তব্য, তাই সে সৈন্যদের সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটছিল, কিন্তু অচিরেই সে বুঝতে পারল যে এসবের কোনো দরকারই নেই, সৈন্যদের শেখাবার মতো কিছুই তার আয়ত্তে নেই। পা টেনে টেনে, ঘাসের বুকে খস খস শব্দ তুলে, বুটের উপর জমে ওঠা ধুলোর দিকে তাকিয়ে সে মাঠ ধরে হাঁটতে লাগল। আগের দিনের কোনো চিন্তাই তার মনে নেই। সে কিছুই ভাবছে না। ক্লান্ত শ্রবণে শুধু শুনছে অবিশ্রাম শব্দের স্রোত, অর্ধবৃত্তাকার হিস-হিস শব্দ থেকে বোমার গর্জনকে আলাদা করে চিনতে পারছে। এই একটা আসছে…ঠিক আমাদের দিকেই আসছে।…আবার একটা! আবার! ঠিক আঘাত করেছে। একটু থেমে সৈন্যদের দিকে তাকাল। না, উপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু এটা ঠিক আঘাত করেছে। শো-ও-ও ধপ! তার থেকে পাঁচ পা দূরে পড়ে একটা কামানের গোলা কিছুটা শুকনো ধুলো উড়িয়ে চলে গেল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নামল। আবার সৈন্যদের দিকে তাকাল। সম্ভবত অনেকের আঘাত লেগেছে–দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়নের কাছে মস্ত বড় ভিড় জমেছে।
