একজন অ্যাডজুটান্টকে বলল, ঘোড়া ছুটিয়ে প্রিন্স পিতর আইভানভিচ-এর (ব্যাগ্রেশন) কাছে চলে যাও, সঠিক খবর নিয়ে এস। তারপর পাশে দাঁড়ানো উৰ্তেমবুর্গের ডিউকের দিকে ফিরে বলল, ইয়োর হাইনেস দয়া করে প্রথম বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কি?
ডিউক চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই–সে হয়তো তখনো সেমেনভঙ্কে পৌঁছেওনি-তার অ্যাডজুটান্ট সেখান থেকে এসে কুতুজভকে জানাল যে ডিউক আরো সৈন্য চেয়ে পাঠিয়েছে।
কুতুজভ মুখটা বেঁকিয়ে দখতুরভের কাছে খবর পাঠাল সে যেন প্রথম বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করে, আর ডিউককে অনুরোধ করে পাঠাল সে যেন ফিরে আসে, কারণ এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া চলে না। আবার যখন খবর এল যে মুরাৎ বন্দি হয়েছে, আর কর্মচারীরা যখন তাকে অভিনন্দিত করল, তখন কুতুজভ একটু হাসল মাত্র।
বলল, একটু অপেক্ষা করুন মশাইরা। যুদ্ধে যখন জয় হয়েছে তখন মুরাতের বন্দি হওয়াটা কিছু অসাধারণ ব্যাপার নয়। তথাপি আনন্দ করবার আগে আরো একটু অপেক্ষা করা ভালো।
কিন্তু সেনাবাহিনীর মধ্যে খবরটা প্রচার করে দেবার জন্য সে একজন অ্যাডজুটান্টকে পাঠিয়ে দিল।
কুতুজভ ছিল গোর্কিতে, রুশ ঘাঁটির কেন্দ্রস্থলের নিকটে। আমাদের বাম ব্যূহের উপর নেপোলিয়নের আক্রমণ অনেকবার প্রতিহত হয়েছে। মধ্যস্থলে ফরাসিরা বরদিনোর ওপারে যেতে পারেনি, আর তাদের বাম ব্যূহের উপর আক্রমণ হেনে উভারতের অশ্বারোহী বাহিনী ফরাসিদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
তিনটে নাগাদ ফরাসিদের আক্রমণ বন্ধ হল। যারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসেছে আর তার চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সকলের মুখেই কুতুজভ একটা প্রচণ্ড চাপ লক্ষ্য করল। দিনের সাফল্যে সে খুশি হয়েছে-এ সাফল্য একান্তই আশাতীত, কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটির শক্তিতে আর কুলিয়ে উঠছে না। তার মাথাটা বারকয়েক এমনভাবে ঝুলে পড়ল যে মনে হল সে বুঝি পড়ে যাবে। সে দুলতে লাগল। ডিনার পরিবেশন করা হল।
এমন সময় অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল ওলযোগেন এসে হাজির হল। এই লোকটিই প্রিন্স আন্দ্রুর পাশ দিয়ে যাবার সময় বলেছিল রণক্ষেত্রটাকে আরো ছড়িয়ে দেওয়া উচিত,ব্যাগ্রেশনও এই লোকটিকে অপছন্দ করে। বাম ব্যূহের অবস্থার কথা জানাতেই সে এসেছে বার্কলে দ্য তলির কাছ থেকে। আহত সৈনিকদের ছুটে পিছিয়ে যেতে দেখে এবং সেনাবাহিনীর পিছনের দিকে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে তীক্ষ্ণবুদ্ধি বার্কলে দ্য তলি সবকিছু বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে যুদ্ধে হার হয়েছে, আর সেই সংবাদ জানাতেই তার প্রিয় অফিসারটিকে পাঠিয়েছে প্রধান সেনাপতির কাছে।
কুতুজভ অনেক কষ্টে একটুকরো সিদ্ধ মুরগির মাংস চিবুচ্ছিল। ভাঁজ-পড়া চোখের পাতার নিচ দিয়ে ঝকঝকে দুটি চোখ মেলে সে ওলযোগেনের দিকে তাকাল।
কোনোরকমে টুপির মাথাটা ছুঁয়ে ওলযোগেন উদাসভাবে পা দুটো টান টান করে আধা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে কুতুজভের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রশান্ত মহামহিমের প্রতি কিছুটা ইচ্ছাকৃত ঔদাসীন্য দেখিয়ে ওলযোগেন যেন বোঝাতে চাইছে যে একজন সুশিক্ষিত সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সে রাশিয়ার লোকদের সুযোগ দিয়েছে যাতে তারা এই অকর্মণ্য বৃদ্ধ লোকটিকে নিয়ে নাচানাচি করতে পারে, আসলে এই বৃদ্ধের সব পরিচয়ই সে রাখে। ওলযোগেন ভাবল, Der alte Herr (জার্মানরা নিজেদের মধ্যে এই নামেই কুতুজভকে ডাকে) বেশ আরামেই আছে। সাগ্রহে কুতুজভের সামনে রাখা থালাটার দিকে তাকিয়ে বার্কলের হুকুম মতোই বামব্যূহের বিবরণ এই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে শোনাতে লাগল।
আমাদের ঘাঁটির সবগুলো প্রান্তই শত্রুপক্ষের হাতে চলে গেছে, সৈন্যের অভাবে তাদের বেদখল করা যাচ্ছে না, সৈন্যরা পালাচ্ছে, তাদের থামানো অসম্ভব।
কুতুজভ চিবুনো বন্ধ করল, লোকটা কি বলছে বুঝতে না পেরে অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটির বিচলিত ভাব লক্ষ্য করে ওলযোগেন হেসে বলল, আমি যা দেখেছি সেটা প্রশান্ত মহামহিমের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা আমি সঙ্গত মনে করিনি। সৈন্যরা একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে…
আপনি দেখেছেন? আপনি দেখেছেন?… ভুরু কুঁচকে কুতুজভ চিৎকার করে উঠল। তাড়াতাড়ি উঠে ওলযোগেনের দিকে এগিয়ে গেল।
আপনার…আপনার এতবড় সাহস… চিৎকার করতে গিয়ে তার গলা আটকে গেল, কাঁপা হাত তুলে ভয় দেখাবার ভঙ্গি করে বলল, আমার কাছে একথা বললেন কোন সাহসে? এ ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না। আমার এই কথা জেনারেল বার্কলেকে গিয়ে বলুন যে তার সংবাদ ভুল, যুদ্ধের সত্যিকারের খবর তার চাইতে আমি ভালো জানি, আমি প্রধান সেনাপতি।
ওলযোগেন কি যেন বলতে যাচ্ছিল, কুতুজভ তাকে থামিয়ে দিল।
বাম ব্যূহে শত্রুকে প্রতিহত করা হয়েছে, আর দক্ষিণ ব্যূহে তাকে পরাস্ত করা হয়েছে। দেখুন স্যার, আপনি যদি ভুল দেখে থাকেন, তাহলে যা জানেন না তা আমাকে বলবেন না। ভালো মানুষের মতো জেনারেল বার্কলের কাছে ফিরে যান, আর তাকে আমার এই দৃঢ় অভিপ্রায় জানিয়ে দিন যে আগামীকাল শক্রকে আক্রমণ করা হবে। কঠোর স্বরে কুতুজভ কথাগুলি বল।
সব চুপ। শুধু শোনা যাচ্ছে বৃদ্ধ সেনাপতির ভারি শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
সর্বত্র তারা প্রতিহত হয়েছে, সেজন্য ধন্যবাদ জানাই ঈশ্বরকে আর আমার সাহসী সৈন্যদের! শত্ৰু পরাস্ত হয়েছে, কাল আমরা তাদের তাড়িয়ে দেব রাশিয়ার পবিত্র মাটি থেকে। বলতে বলতে কুতুজভ ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল, তার দুই চোখ জলে ভরে এল।
