যখন সে মনে মনে চিন্তা করছে যে এই বিচিত্র রাশিয়া অভিযানে একটা যুদ্ধেও তার জয় হয়নি, দুই মাসের মধ্যে একটা পতাকা, একটা কামান, অথবা একটা সেনাদলও তার দখলে আসেনি, চারদিকের সকলের মুখেই দেখছে একটা চাপা অবসন্নতার ভাব, অনবরত সংবাদ আসছে যে রুশরা এখনো তাদের ঘাঁটি আগলে রেখেছে–তখন দুঃস্বপ্নের মতো একটা ভয়ংকর অনুভূতি তাকে চেপে ধরেছে, যেসব দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার ফলে তার ধ্বংস এগিয়ে আসতে পারে তারাই তার মনকে ঘিরে ধরেছে। রুশরা তার বাম ব্যূহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তার ব্যূহের কেন্দ্রকে ভেদ করতে পারে, একটা বিক্ষিপ্ত কামানের গোলা এসে তাকে মেরে ফেলতে পারে। এসবই তো সম্ভব। আগেকার সব যুদ্ধে সে ভাবত শুধু জয়ের নানা সম্ভাবনার কথা, আর এখন দুর্ভাগ্যের অসংখ্য সম্ভাবনা তার সামনে এসে হাজির হচ্ছে, সে সব কিছুই ঘটতে পারে বলেই তার বিশ্বাস। হ্যাঁ, তার অবস্থা এখন সেই মানুষটির মতোই যে স্বপ্ন দেখছে, একটা গুণ্ডা তাকে আক্রমণ করতে আসছে, গুণ্ডাটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে প্রচণ্ড আঘাত হানতে সে হাত তুলেছে, কিন্তু হঠাৎ তার মনে হল যে তার উদ্যত হাতটা যেন একখণ্ড জীর্ণ বস্ত্রের মতো অসহায় পঙ্গু হয়ে ঢলে পড়ছে, আর অনিবার্য ধ্বংসের আতংকে তাকে অসহায়ভাবে চেপে ধরেছে।
রুশরা ফরাসি বাহিনীর বাম ব্যূহের উপর আক্রমণ চালিয়েছে-এই সংবাদ নেপোলিয়নকে আতংকিত করে তুলেছে। হাঁটুর উপর কনুই রেখে মাথা নিচু করে সে পাহাড়ের নিচে একটা টুলের উপর চুপচাপ বসে আছে। বের্থিয়ের এগিয়ে এসে প্রস্তাব করল, প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে তাদের একবার সেনাদল পরিদর্শ করতে যাওয়া উচিত।
কী? কি বললে তুমি? নেপোলিয়ন শুধাল। হ্যাঁ, আমার ঘোড়া আনতে বল।
ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে সে সেমেনভঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল।
মাথার উপর থেকে বারুদের ধোয়া ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, পায়ের নিচে রক্তের স্রোতে ভাসছে ঘোড়া ও মানুষ,কোথাও একক, কোথাও বা স্তূপ হয়ে। এমন একটা ছোট জায়গায় এত বেশি লোকের মৃত্যু অথবা এমন ভয়ংকর দৃশ্য নেপোলিয়ন অথবা তার কোনো সেনাপতি আগে কখনো দেখেনি। সেমেনভঙ্কের উঁচু জায়গাটাতে উঠে ধোয়ার ভিতর দিয়ে নেপোলিয়ন অপরিচিত রংয়ের ইউনিফর্মধারী অনেক সৈন্য দেখতে পেল। তারা রুশ সৈন্য।
এখন আর যুদ্ধ হচ্ছে না : চলেছে এমন এক অবিরাম হত্যাকাণ্ড যাতে ফরাসি বা রুশ কোনো পক্ষেরই কোনো লাভ নেই। নেপোলিয়ন ঘোড়া থামাল, আবার ডুবে গেল দিবাস্বপ্নের মধ্যে, সে স্বপ্ন ভাঙাল বের্থিয়ের। তার সামনে ও চারদিকে যা ঘটছে তাকে সে থামাতে পারে না, অথচ এ কাণ্ডকারখানা তারই নির্দেশে চলেছে, আর তার উপরেই নির্ভর করছে। এত করেও সাফল্য লাভ করতে না পারায় এই প্রথম তার মনে হল যে, এ ব্যাপারটাই অপ্রয়োজনীয় ও ভয়াবহ।
একজন সেনাপতি নেপোলিয়নের কাছে এগিয়ে এসে সাহস করে প্রস্তাব করল, সে নিজেই যেন ওল্ড গার্ডসকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিচালনা করে নিয়ে যায়। নোও বের্থিয়ার নেপোলিয়নের কাছেই দাঁড়িয়েছিল, সেনাপতিটির অর্থহীন প্রস্তাব শুনে তারা দৃষ্টি-বিনিময় করল, বিদ্রুপের হাসি হাসল।
নেপোলিয়ন মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
ফ্রান্স থেকে আটশো লীগ (১ লীগ=২জত(১,২) মাইল) দূরে এসে আমার গার্ডসকে ধ্বংস হতে আমি দেব না! এই কথা বলে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে সে শেভার্দিনোতে ফিরে গেল।
.
অধ্যায়-৩৫
যে কম্বল-বিছানো বেঞ্চে কুতুজভকে সকালে দেখেছিল পিয়ের, সেখানেই সে বসে আছে, শাদা মাথাটা ঝুলে পড়েছে, ভারি শরীরটা এলিয়ে পড়েছে। নিজে কোনো হুকুম দিচ্ছে না, শুধু অপরের কথায় সায় দিচ্ছে, নয় তো আপত্তি জানাচ্ছে।
অনেককে বলছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই করব, আবার কাউকে বলছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, একবার যাও তো বাপু, গিয়ে দেখে এস, অথবা বলছে, না, তা করো না, বরং অপেক্ষাই করা হোক! যেসমস্ত প্রতিবেদন আসছে সেগুলি মন দিয়ে শুনছে, অধীনস্থ লোকরা কোনো নির্দেশ চাইলে তাও দিচ্ছে, কিন্তু তার আসল আগ্রহ শোনা কথাগুলির দিকে নয়, অন্য কিছুতে-যারা কথা বলছে তাদের মুখের ভাব ও গলার স্বরের দিকে। বহু বছরের সামরিক অভিজ্ঞতায় সে জেনেছে, পরিণত বয়সের জ্ঞানে সে বুঝেছে, হাজার হাজার মানুষ যেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে সেখানে একজন মানুষের পক্ষে তাদের পরিচালনা করা অসম্ভব, সে জানে, একজন প্রধান সেনাপতির হুকুম, অথবা সৈন্যসমাবেশের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, কামানের সংখ্যাধিক্য ও নরহত্যার সংখ্যা দিয়ে একটা যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয় না, ফলাফল নির্ধারিত হয় এমন একটা শক্তির দ্বারা যাকে ধরা-ছোঁয়া যায় না, যাকে বলা হয় সেনাদলের মনোভাব, আর কুতুজভ চেষ্টা করে সেই শক্তির উপর নজর রেখে সাধ্যমতো তাকে পরিচালিত করতে।
কুতুজভের চেহারায় ফুটে উঠেছে একটা সংহত শান্ত মনোযোগ, তার মুখে ফুটে উঠেছে অতিরিক্ত পরিশ্রমের আভাস, যেন বৃদ্ধ বয়স ও দুর্বল শরীরের ক্লান্তিকে সহ্য করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে।
এগারোটার সময় খবর এল ফরাসিরা যেসব ঘাঁটি দখল করে নিয়েছিল সেগুলি উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু প্রিন্স ব্যাগ্রেশন আহত হয়েছে। কুতুজভ আর্তনাদ করে মাথাটা দোলাতে লাগল।
