নেপোলিয়ন কাঁধে ঝাঁকুনি দিল, কোনো জবাব না দিয়ে পায়চারি করতে লাগল।
একসময় বেলিয়াদের কাছে গিয়ে বলল, তুমি খুব চটে আছ বেলিয়ার্দ। যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে থেকে ভুল করাটা খুবই সহজ। ফিরে গিয়ে আর একবার ভালো করে দেখ, তারপর আমার খাছে এসো।
বেলিয়ার্দ দৃষ্টির বাইরে যাবার আগেই রণক্ষেত্রের আর একপ্রান্ত থেকে আর একটি সংবাদবাহক ঘোড়া ছুটিয়ে এসে হাজির হল।
অনবরত বিরক্ত করায় ক্ষুব্ধ হয়ে নেপোলিয়ন বলল, এই যে, তুমি আবার কী চাও?
স্যার, প্রিন্স… অ্যাডজুটান্টটি বলতে শুরু করল।
ক্রুদ্ধ অঙ্গভঙ্গি করে নেপোলিয়ন বলল, নতুন সৈন্য চান, এই তো?
অ্যাডজুটান্ট সম্মতিসূচকভাবে মাথা নুইয়ে যুদ্ধের সংবাদ বলতে লাগল, সম্রাট তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে কয়েক পা সরে গেল, থামল, ফিরে এসে বের্থিয়েরকে ডাকল।
দুটি হাত ঈষৎ ফাঁক করে বলল, রিজার্ভ বাহিনীতে হাত দিতেই হবে। ওখানে কাদের পাঠানো যায় বল তো? (তার সম্পর্কেই নেপোলিয়ন পরবর্তীকালে বলেছিল, একটা রাজহাঁসের বাচ্চাকে আমি ঈগল পাখি বানিয়েছি।)।
সবগুলি ডিভিশন, রেজিমেন্ট ও ব্যাটেলিয়নের খবর বের্থিয়েরের মুখস্থ, সে বলল, ক্লাপারে ডিভিশনকে পাঠান স্যার।
নেপোলিয়ন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
অ্যাডজুটান্ট ক্লাপারেদ ডিভিশনের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পরেই পাহাড়ের পিছন থেকে ইয়ং গার্ড ডিভিশন যাত্রা শুরু করল। নেপোলিয়ন নিঃশব্দে সেইদিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ সে বের্থিয়েরকে বলল, না! ক্লাপারেদ ডিভিশনকে পাঠাতে পারি না। ফ্রিয়াতের ডিভিশনকে পাঠাও।
ক্লাপারেদের বদলে ফিয়ৎ-এর ডিভিশনকে পাঠানোর বিশেষ কোনো সুবিধাই ছিল না, আর এই পরিবর্তনের ফলে যথেষ্ট বিলম্ব ও অসুবিধারই সৃষ্টি হল, তবু সেই হুকুমই ঠিক ঠিক তামিল করা হল। নেপোলিয়ন খেয়ালই করল না যে সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সেই ডাক্তারের ভূমিকায়ই সে অভিনয় করল যে ওষুধ পাল্টাবার ফলে রোগ-নিরাময়কেই বিলম্বিত করে–অথচ এই ভূমিকার কথা সে ভালোই জানত এবং তার নিন্দাও করত।
অন্যসব ডিভিশনের মতোই ফ্রিয়াৎ-এর ডিভিশনও যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়ার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। চারদিক থেকে অ্যাডজুটান্টরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে যেন সলা-পরামর্শ মতো একই কথা বলতে লাগল। সকলেই নতুন সৈন্য-সাহায্যের প্রার্থনা জানিয়ে বলতে লাগল যে রুশরা তাদের ঘাঁটিতে অটুট থেকে এমন নারকীয় বোমাবর্ষণ শুরু করেছে যে ফরাসি বাহিনী একেবারে জল হয়ে গলে যাচ্ছে।
শিবিরের একটা টুলে বসে নেপোলিয়ন চিন্তায় ডুবে গেল। ভ্রমণপ্রিয় ম. দ্য বুসে সকাল থেকে না খেয়ে আছে, সম্রাটের কাছে এগিয়ে গিয়ে সশ্রদ্ধভাবে লাঞ্চ খাবার প্রস্তাব করল।
বলল, আশাকরি এখন জয়লাভের জন্য ইয়োর ম্যাজেস্ট্রিকে অভিনন্দন জানাতে পারি?
নেপোলিয়ন নীরবে নেতিবাচকভাবে মাথাটা নাড়ল। লাঞ্চের প্রস্তাবে নয়, শুধু জয়লাভের কথাতেই তার আপত্তি ধরে নিয়ে ম, দ্য বুসে সাহস করে পরিহাসের সুরে বলে বসল যে লাঞ্চ হাতের কাছে এলে সেটা গ্রহণ না করার কোনো মানেই হয় না।
চলে যাও এখান থেকে…হঠাৎ বিষণ্ণ কণ্ঠে কথাটা বলে নেপোলিয়নই সেখান থেকে সরে গেল।
দুঃখ, অনুতাপ ও উচ্ছ্বাসের একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল ম, দ্য বুসের মুখে, সেও ধীর পায়ে অন্য সেনাপতিদের খোঁজে চলে গেল।
একজন চিরভাগ্যবান জুয়াড়ি যখন বেপরোয়াভাবে টাকা ঢেলে সর্বদা জিতে যাবার পরে হঠাৎ যখন দেখে যে তার হারের পর হার হচ্ছে তখন তার মনে যে অবসাদ আসে তেমনি অবসাদ দেখা দিয়েছে নেপোলিয়নের মনে।
সেই একই সৈন্য, একই সেনাপতি, একই প্রস্তুতি, একই বিলি-বন্দোবস্ত, নিজেও তো সেই একই মানুষই আছে, বরং সে এখন আগের চাইতে আরো বেশি অভিজ্ঞ ও রণকুশল হয়েছে। এমন কি শত্রুপক্ষ অস্তারলিজ ও ফ্রিডল্যান্ডে যা ছিল তাই আছে–অথচ কী এক প্রচণ্ড আঘাতে তার ডান হাতটা অলৌকিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে।
যেসব পুরনো পদ্ধতি অব্যর্থভাবে জয়যুক্ত হয়েছে : কামানশ্রেণীকে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা, শত্রুর ব্যুহ ভেদ করতে রিজার্ভ বাহিনীর আক্রমণ, লৌহকঠিন সৈন্যদের দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণ–এইসব পদ্ধতিই তো প্রয়োগ করা হয়েছে অথচ জয়লাভ করা তো দূরের কথা, চারদিক থেকে শুধু একই সংবাদ আসছে-সেনাপতিরা নিহত ও আহত হয়েছে, নতুন সৈন্য দরকার, রুশসৈন্যকে বিতাড়িত করা অসম্ভব, নিজের সৈন্যরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে।
আগে দুটি কি তিনটি হুকুম দেওয়া হলে, মুখের কয়েকটা কথা বের করলেই মার্শাল ও অ্যাডজুটান্টরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছে খুশি মুখের অভিনন্দনবার্তা নিয়ে, শুনিয়েছে জয়লাভের কথা। কত শত্রু বন্দি হয়েছে তার হিসাব, সঙ্গে এনেছে বস্তা-বোঝাই শত্রুপক্ষের ঈগল-চিহ্ন ও পতাকা, কামান ও খাদ্যভাণ্ডার আর মুরাৎ শুধু চেয়েছে মালগাড়ি সংগ্রহ করে অশ্বারোহী বাহিনী পাঠাবার অনুমতি। লোদি, মারেঙ্গো, আর্কোলা, জেনা, অস্তারলিজ, ওয়াগ্রাম প্রভৃতি সর্বত্র এই একই জিনিস ঘটেছে। কিন্তু এবার তার সৈন্যদের মধ্যে নতুন কিছু ঘটছে।
আক্রমণকারীদল আট ঘণ্টা ধরে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েও যখন জয়লাভ করতে পারে না তখন তার অর্থ যে কি দাঁড়াল সেটা যুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে নেপোলিয়ন ভালোই জানে। কে জানে, এখন যে কোনো একটা ছোটখাট দুর্ঘটনাই তার ও তার বাহিনীর ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
