একজন অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছুটিয়ে এসে বিবর্ণ, ভয়ার্ত মুখে জানাল যে তাদের আক্রমণ প্রতিহত হয়েছে, কাম্পা আহত হয়েছে, আর দাভুৎ নিহত হয়েছে, অথচ অ্যাডজুটান্টকে যখন এইসব খবর বলা হয়েছিল ঠিক তখনই ফরাসিরা অপর পক্ষের ঘাঁটি আবার দখল করেছে, আর দাভুৎ বেঁচে আছে তার শরীর সামান্য ছড়ে গেছে মাত্র। এইসব অনির্ভরযোগ্য বিবরণের ভিত্তিতেই নেপোলিয়ন হুকুম জারি করছিল, আর তার ফলে যা হয় হুকুম পাবার আগেই সেকাজটা করা হয়ে গেছে, আর না হয় তো সে হুকুম তামিল করাই সম্ভব হয়নি।
যেসব মার্শাল বা জেনারেলরা যুদ্ধক্ষেত্রের আরো কাছাকাছি ছিল তারাও নেপোলিয়নের মতোই নিজেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, শুধু মাঝে-মধ্যে বন্দুকের আওতার মধ্যে গেছে, তারাও নেপোলিয়নকে জিজ্ঞাসা না। করেই কোথায় ও কোন দিকে আক্রমণ চালানো হবে, কোথায় অশ্বারোহী বাহিনী ঘোড়া ছুটিয়ে যাবে, আর কোথায় ছুটে যাবে পদাতিক বাহিনী সে সম্পর্কে হুকুম জারি করেছে। কিন্তু নেপোলিয়নের মতোই তাদের হুকুমও কদাচিৎ কার্যকর করা হয়েছে, আর যদি হয়ে থাকে তাও আংশিকভাবে হয়েছে। অধিকাংশক্ষেত্রে হুকুমের বিপরীত ঘটনাই ঘটেছে। যে সৈন্যদের এগিয়ে যেতে বলা হয়েছে ছররা গুলির মুখে পড়ে তারা পিছু হটেছে, যে সৈন্যদের স্বস্থানে থাকতে বলা হয়েছে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে রুশদের সামনে দেখে হঠাৎ হয় ছুটে পিছিয়ে গেছে, নয় তো এগিয়ে গেছে সামনে, আর অশ্বারোহী বাহিনী বিনা হুকুমেই পলায়মান রুশদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে। কামানগুলো কখনো, কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে, গুলি করবার জন্য কখনো পদাতিক বাহিনীকে পাঠানো হবে, আর কখনই বা অশ্বারোহীদের পাঠানো হবে রুশ পদাতিক সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করতে-এ-ধরনের সব হুকুমই অফিসাররা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি থেকে ঘোষণা করেছেনে, অথবা দাভুৎ, অথবা মুরাৎকে জিজ্ঞাসা না করেই-নেপোলিয়নকে জিজ্ঞাসা করার তো কথাই ওঠে না। হুকুম পালন না করার জন্য অথবা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করার জন্য যে বিপদ হতে পারে তাকে তারা মোটেই ভয় করেনি, কারণ যুদ্ধে ঝুঁকি নিতে হয় সবচাইতে প্রিয় বস্তুটির–সেটা নিজের জীবন, কখনো মনে হয় পিছিয়ে যাওয়াই নিরাপদ, আর কখনো মনে হয় এগিয়ে যাওয়াই নিরাপদ, তাই যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে বুকের উপর যারা কর্মরত তারা সেই মুহূর্তের মর্জিমতোই কাজ করেছে। অবশ্য বাস্তবক্ষেত্রে এই এগিয়ে যাওয়া অথবা পিছিয়ে যাওয়ার ফলে সেনাবাহিনীর অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন বা উন্নতি ঘটেনি। একের অপরের দিকে ছুটে যাওয়া অথবা ঘোড়া ছুটিয়ে দেওয়ার ফলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি, পঙ্গু হওয়া অথবা মৃত্যু ঘটার যে ক্ষতি সেটা ঘটেছে ছুটে-আসা কামানের গোলা আর বন্দুকের গুলিতে। উড়ন্ত গোলাগুলি যেখানে ছুটছে, যেমুহূর্তে সৈন্যরা সেখান থেকে পালিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা পিছন থেকে এসে তাদের নতুন করে গড়ে তুলেছে, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে, এবং পুনরায় তাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে যুদ্ধের আগুনের মধ্যে, মৃত্যু-ভয়ের তাড়নায় আবার তারা শৃঙ্খলা ভেঙেছে এবং ভিড়ের প্রেরণায় যে যেদিকে পেরেছে ছুটে গেছে।
.
অধ্যায়-৩৪
দাভুৎ, নে ও মুরাৎ-নেপোলিয়নের এই তিন সেনাপতি ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছে, অনেকসময় তারা যুদ্ধের মধ্যেও ঢুকেছে, বারবার তারা বড় রকমের সুশৃংখল ও সুগঠিত সেনাদলকে যুদ্ধরত সৈন্যদের সাহায্যার্থে পাঠিয়েছে। কিন্তু আগেকার যুদ্ধগুলিতে যেরকমটা ঘটেছিল এবার ঘটেছে তার বিপরীত ঘটনা, প্রত্যাশামতো শত্রুপক্ষের পলায়নের পরিবর্তে এবার সেই সব সুগঠিত সেনাদলই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছে বিশৃঙ্খল, আতংকিত জনতার রূপ নিয়ে। সেনাপতিরা নতুন করে তাদের সংঘবদ্ধ করেছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা ক্রমাগতই হ্রাস পেয়েছে। দিনের মাঝামাঝি সময়ে মুরাৎ তার অ্যাডজুটান্টকে পাঠাল নেপোলিয়নের কাছে, চেয়ে পাঠাল নতুন সৈন্য-শক্তি।
গোল পাহাড়ের নিচে বসে নেপোলিয়ন পঞ্চ-পানীয়ে চুমুক দিচ্ছে। তখনই মুরাতের অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছুটিয়ে এসে নেপোলিয়নকে আশ্বাস দিল যে হিজ ম্যাজেস্ট্রি যদি তাকে আর এক ডিভিশন সৈন্য পাঠায় তাহলে রুশ বাহিনীকে হটিয়ে দিতে পারবে।
নতুন সৈন্য? বিস্ময়ে নেপোলিয়ন বলল। অ্যাডজুটান্ট সুদর্শন তরুণ, মুরাতের মতোই লম্বা কোঁকড়া চুল। যেন তার কথাগুলি বুঝতেই পারেনি এমনিভাবে নেপোলিয়ন তার দিকে তাকাল।
সে নিজের মনেই ভাবল, নতুন সৈন্য! অর্ধেক বাহিনীকে তো ইতিমধ্যেই একটি দুর্বল, পরিখাবিহীন রুশ সেনাদলের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, তাহলে তাদের নতুন সৈন্য লাগবে কেন?
কঠোর কণ্ঠে বলল, নেপলসের রাজাকে গিয়ে বল এখনো দুপুর হয়নি, আর আমার দাবার ছকটাকেও এখনো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না। চলে যাও!…
লম্বা চুল, সুদর্শন, বালক-অ্যাডজুটান্টটি টুপি থেকে হাত না সরিয়েই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে নরমেধ যজ্ঞাগারে ফিরে এল।
নেপোলিয়ন উঠে দাঁড়াল। কলাইকুণ্ঠ ও বেথিয়েরকে ডেকে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করল যার সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই।
আলোচনাটা নেপোলিয়ন বেশ উপভোগ করছে, কিন্তু তার মাঝখানেই বের্থিয়েরের চোখে পড়ল, ঘর্মাক্ত ঘোড়ায় চেপে একটি সেনাপতি পাহাড়ের দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটি বেলিয়ার্দ। ঘোড়া থেকে নেমে সে দ্রুত পদক্ষেপে সম্রাটের দিকে এগিয়ে গেল এবং জোর গলায় আর একদল সৈন্য পাঠাবার স্বপক্ষে যুক্তি দেখাতে লাগল। প্রতিশ্রুতি দিল, সম্রাট যদি আর এক ডিভিশন সৈন্য পাঠায় তাহলে রুশদের একেবারে শেষ করে দিতে পারবে।
