পিয়েরও মাথাটা নিচু করে হাত দুটো নামিয়ে নিল। কে কাকে বন্দি করেছে। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে ফরাসিটি সোজা কামানশ্রেণীর দিকে ছুটে গেল, আর পিয়ের নিহত ও আহত সৈনিকদের ডিঙিয়ে উত্রাই বেয়ে ছুটে নেমে গেল, প্রতি পদক্ষেপে তার মনে হল নিহত আহতরা যেন তার পা টেনে ধরছে। কিন্তু গোল পাহাড়ের নিচে পৌঁছবার আগেই রুশ সৈন্যদের একটা বড় দলের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল, খুশিতে চিৎকার করতে করতে বেপরোয়াভাবে হোঁচট খেতে খেতে তারা পাহাড় বেয়ে উঠছে। (রুশ সেনাদলের এই আক্রমণের পূর্ণ কৃতিত্ব দাবি করেছে এর্মোলভি। তার সাহস ও সৌভাগ্যের বলেই এ কাজ সম্ভব হয়েছে, শোনা যায়, এই আক্রমণের সময় সে নাকি পকেট থেকে বের করে বেশ কয়েকটা সেন্ট জর্জের ক্রুশ কামানশ্রেণীর মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল, যাতে যে সেখানে আগে পৌঁছবে সেই সেটা কুড়িয়ে নিতে পারে।)
যে ফরাসিরা কামানশ্রেণী দখল করেছিল তারা পালিয়ে গেল, আর আমাদের সৈন্যরা হুর-রা বলে চেঁচাতে চেঁচাতে এতদূর পর্যন্ত তাদের তাড়া করে গেল যে তাদের ডেকে ফেরানো গেল না।
বন্দিদের নিচে নামিয়ে আনা হল, তাদের মধ্যে একজন আহত ফরাসি জেনারেলও আছে, অফিসাররা তাকে ঘিরে ধরল। দলে দলে পিয়েরের পরিচিত ও অপরিচিত রুশ ও ফরাসি আহত সৈনিত বা যন্ত্রণায় বিকৃত মুখে কেউ বা হেঁটে, কেউ বা হামাগুড়ি দিয়ে কামানশ্রেণীর কাছ থেকে নামতে লাগল, অনেককে স্ট্রেচারে করে বয়ে আনা হল। পিয়ের আবার গোল পাহাড়ের মাথায় উঠে গেল, এক পরিবারের মতো যাদের সঙ্গে সে এক ঘণ্টার উপর কাটিয়েছে তাদের কজনকেও সেখানে দেখতে পেল না। যারা মরে পড়ে আছে তাদের সে চেনে না, আবার কয়েকজনকে চিনতেও পারল। তরুণ অফিসারটি রক্তের পুকুরের মধ্যে সেই একইভাবে দেয়ালের একপ্রান্তে উপুড় হয়ে বসে আছে। লাল-মুখ লোকটি তেমনি খাবি খাচ্ছে, কিন্তু কেউ তাকে বয়ে নিয়ে গেল না।
পিয়ের আবার উত্রাই বয়ে ছুটে নেমে গেল।
রণক্ষেত্র থেকে আগত একদল স্ট্রেচার-বাহকের দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে এগিয়ে যেতে যেতে সে ভাবল, এবার ওরা এসব থামাবে, এবার ওরা বুঝবে কি ভয়ংকর কাজ করেছে!
ধোঁয়ার আবরণের পিছনে সূর্য তখনো মাথার উপরে, কামানের গর্জন ও বন্দুকের শব্দ তখনো থামেনি, বরং ক্লান্ত মানুষ যেমন অবশিষ্ট সব শক্তি নিয়ে একবার আর্তনাদ করে ওঠে ঠিক তেমনি গোলাগুলি যেন বেপরোয়াভাবে আরো বেড়ে গেছে।
.
অধ্যায়-৩৩
একদিকে বরদিনো আর অন্যদিকে ব্যাগ্রেশনের সৈন্য-সীমান্ত-তার মধ্যবর্তী সাত হাজার ফুট জায়গাতেই বরদিনো যুদ্ধের মূল কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল। তার বাইরে একদিকে উভারতের অশ্বারোহী বাহিনীসহ রুশরা কুচকাওয়াজ করেছিল দুপুরবেলা, আর অন্যদিকে উতিৎসার ওপারে পনিয়াতোস্কির একটা সংঘর্ষ হয়েছিল তুচকভের সঙ্গে, কিন্তু যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে যা ঘটেছে তার তুলনায় এসব খুবই বিক্ষিপ্ত ও দুর্বল ঘটনা। দিনের আসল যুদ্ধটা জঙ্গলের পাশের যে খোলা জায়গাটাতে হয়েছে সেটা দুদিক থেকেই বেশ ভালোভাবে দেখা যায়, আর যুদ্ধটাও হয়েছে অত্যন্ত সরল ও কৌশলবিহীনভাবে।
দুপক্ষ থেকে কয়েকশো কামানের গোলাবর্ষণ দিয়ে যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল।
তারপর যুদ্ধক্ষেত্রটা যখন ধোঁয়ায় ঢেকে গেল তখন ডাইনের ফরাসিদের পক্ষ থেকে এগিয়ে এল কাম্পা ও দেসিয়াস্কের সেনাদল, আর বাঁদিক থেকে এগিয়ে এল মুরাৎ-এর সেনাদল।
নেপোলিয়ন দাঁড়িয়েছিল শেভার্দিনো দুর্গে, সেখান থেকে ব্যাগ্রেশনের ঘাঁটির দূরত্ব এক ভা, আর বরদিনোর দূরত্ব দুই ভা, কাজেই সেখানে যে কি ঘটছে নেপোলিয়ন তা দেখতেই পায়নি, বিশেষত ধোয়া আর কুয়াশা মিলে সমস্ত অঞ্চলটাকেই ঢেকে ফেলেছিল। এই ধোয়ার ভিতর দিয়ে কালো কালো কি যেন দেখা যাচ্ছিল,-হয় তো তারা সৈনিক,মাঝে মাঝে বেয়নেটের ঝিলিকও চোখে পড়েছিল, কিন্তু তারা এগিয়ে চলেছে না স্থির হয়ে আছে, তারা ফরাসি না রুশ, শেভার্দিনো দুর্গ থেকে সেসব কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে সূর্য উঠেছে, চোখের উপর হাত রেখে নেপোলিয়ন ঘাটির দিকে তাকিয়েছিল, সূর্যের বাকা রশ্মি সোজা এসে পড়ল তার মুখে। সম্মুখে ধোয়ার আবরণ ছড়িয়ে পড়ছে, কখনো মনে হচ্ছে ধোয়াই এগিয়ে চলেছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে সৈন্যরা এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে চিৎকার শোনা যাচ্ছে, কিন্তু সেখানে কি যে হচ্ছে তা বলা অসম্ভব।
পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে নেপোলিয়ন একটা ছোট দূরবীণে চোখ রাখল, তার বৃত্তের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ল ধোয়া আর সৈন্য, কিছু তার নিজের, কিছু রুশদের, কিন্তু পুনরায় যখন খালি চোখে তাকাল তখন আর বুঝতেই পারল না সে যা কিছু দেখছিল তা এখন কোথায়।
পাহাড় থেকে নেমে সেখানেই পায়চারি করতে লাগল।
মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে, গোলাগুলির শব্দ শুনছে, আবার একদৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকাচ্ছে।
যে সমস্ত অ্যাডজুটান্টদের সে পাঠিয়েছে তারা এবং তার মার্শালদের আর্দালিরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনবরত ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে আর নেপোলিয়নকে যুদ্ধের সর্বশেষ বিবরণ দিচ্ছে, কিন্তু সেসব বিবরণই মিথ্যা, কারণ সেই প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্যে কখন কি ঘটছে সেই মুহূর্তে সেটা বলা অসম্ভব, অ্যাডজুটান্টদের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে অন্যের কাছে যা শুনেছে তাই এসে বলছে, তাছাড়া, একজন অ্যাডজুটান্ট যতক্ষণে দুই ভা পথ ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে ততক্ষণে অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে এবং যে সংবাদ সে বয়ে আনছে সেটা মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে। সেইভাবে একজন অ্যাডজুটান্ট মুরাৎ-এর কাছ থেকে খবর নিয়ে এল যে বরদিনো দখল করা হয়েছে, আর কলোচা নদীর সেতু ফরাসিদের হাতে এসে পড়েছে। অ্যাডজুটান্ট নেপোলিয়নকে জিজ্ঞাসা করল, সৈন্যরা নদী পার হবে কি? নেপোলিয়ন হুকুম দিল, সৈন্যরা শেষপ্রান্তে সমবেত হয়ে অপেক্ষা করুক। কিন্তু সে হুকুম দেবার আগেই–আসলে অ্যাডজুটান্টটি বরদিনো ত্যাগ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই-রুশরা সেতুটা পুনরায় দখল করে পুড়িয়ে দিয়েছে।
