পিয়ের পরিখার দেয়ালের উপর দিয়ে তাকাল, একটি বিবর্ণ তরুণ অফিসার তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তরবারিটা ঝুলিয়ে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে সে অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকাচ্ছে।
পদাতিক সেনাদল ধোয়ার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল, কিন্তু তাদের দীর্ঘায়ত চিৎকার ও বন্দুকের শব্দ তখনো শোনা যাচ্ছে। কয়েক মিনিট পরেই আহত সৈনিক ও স্ট্রেচারবাহকরা দলে দলে সেইদিক থেকে আসতে লাগল। কামানের গোলা অর্ধচক্রাকারে ছুটে এসে আরো ঘন ঘন পড়তে লাগল। কয়েকটি সৈনিক এখানে ওখানে পড়ে আছে, তাদের এখনো সরানো হয়নি। কামানকে ঘিরে লোকজন দ্রুততর গতিতে ছুটাছুটি করছে। এখন আর কেউ পিয়েরকে দেখছে না। দু একবার পথের সামনে পড়ায় তাকে ধমক দেওয়া হয়েছে। ঊধ্বতন অফিসারটি ভ্রুকুটিকুটিল মুখে বড় বড় পা ফেলে একটা কামান থেকে আরেকটা কামানের দিকে ছুটে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা এমনভাবে ছোট ছোট লাফ দিচ্ছে যেন তাদের পায়ের নিচে স্প্রিং লাগানো আছে।
স্যার, আমি জানতে এসেছি যে আর মাত্র আট রাউন্ড গুলি আছে। আমরা কি গুলি চালিয়েই যাব? সে শুধাল।
পরিখার দেয়ালের উপর দিয়ে তাকিয়ে ঊর্ধ্বতন অফিসারটি চিৎকার করে বলল, ছররা গুলি!
হঠাৎ কি যেন ঘটল, তরুণ অফিসারটি একবার ঢোক গিলেই ডানায় গুলি-খাওয়া পাখির মতো উপুড় হয়ে বসে পড়ল। পিয়েরের চোখে সবকিছুই কেমন যেন বিস্ময়কর, গোলমেলে ও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠল।
একটার পর একটা কামানের গোলা হিস-হিস শব্দে ছুটে আসছে, আর মাটি, সৈন্য, অথবা কামানের উপর আছড়ে পড়ছে। পিয়ের আগে কখনো এরকম শব্দ শোনেনি, আর এখন এই শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা গোলা ঠিক সেখানে পড়ায় কিছুটা মাটি ধ্বসে পড়ল, একটা কালো গোলা তার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে কোনো কিছুর উপর আছড়ে পড়ল। কিছু অসামরিক লোক কামানশ্রেণীর দিকে যাচ্ছিল, তারা ছুটে পালাল।
অফিসারটি চিৎকার করে বলল, সকলেই ছররা চালাও!
একজন সার্জেন্ট অফিসারের কাছে ছুটে এসে ভয়ার্ত গলায় ফিসফিস করে জানাল যে গুলি ফুরিয়ে গেছে।
বদমায়েশের দল! তারা সব কী করছে! পিয়েরের দিকে ঘুরে অফিসারটি চেঁচিয়ে উঠল।
অফিসারটির মুখ রক্তবর্ণ, ঘর্মাক্ত, কুটিল ভুরুর নিচে চোখ দুটো জ্বলছে।
পিয়েরের উপর থেকে চোখ সরিয়ে সে সৈনিকদের হুকুম দিল, রিজার্ভ বাহিনীতে চলে যাও, সেখান থেকে গুলি-গোলার বাক্সগুলো নিয়ে এস!
আমি যাব, পিয়ের বলল।
তার কথার জবাব না দিয়ে অফিসার বিপরীত দিকে এগিয়ে গেল।
চেঁচিয়ে বলল, গুলি চালিও না…অপেক্ষা কর!
যে লোকটি গোলাগুলি আনতে যাচ্ছিল পিয়েরের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগল।
আঃ, স্যার, এটা আপনার জায়গা নয়, বলেই সে ছুটে নেমে গেল।
তরুণ অফিসারটি যেখানে বসেছিল তাকে এড়িয়ে পিয়ের সৈনিকটির পিছনে ছুটে গেল।
একটার পর একটা কামানের গোলা তার সামনে, পিছনে, দুই পাশে পড়তে লাগল। সবুজ রংয়ের গোলা বারুদের গাড়ির সামনে পৌঁছে হঠাৎ সে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করল, আমি কোথায় চলেছি ফিরে যাবে না এগিয়ে যাবে বুঝতে না পেরে সে থেমে গেল। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আঘাত তাকে মাটিতে ফেলে দিল। ঠিক সেইমুহূর্তে একটা আগুনের ঝিলিক তার চোখ ঝলসে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে কানে তালা-লাগানো একটা গর্জনে তার কান দুটো ঝনঝন করে উঠল।
যখন সম্বিত ফিরে এল তখন দুই হাতে ভর দিয়ে সে মাটিতে বসে আছে, গোলা-বারুদের গাড়িটা সেখানে নেই, পোড়া ঘাসের উপর ইতস্তত ছড়িয়ে আছে সবুজ পোড়া কাঠ ও ছেঁড়া কাপড়ের ভূপ। একটা ঘোড়া গাড়ির জোয়ালের ভাঙা টুকরো নিয়েই তার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল। আর অন্য ঘোড়াটা পিয়েরের মতোই মাটিতে পড়ে হৃদয়বিদারক স্বরে একটানা চিৎকার করে চলেছে।
.
অধ্যায়-৩২
আতংকে দিশেহারা হয়ে লাফিয়ে উঠে পিয়ের ছুটতে ছুটতে কামানশ্রেণীর কাছেই ফিরে গেল, চারদিকের ভয়াবহতার মধ্যে সেটাই যেন একমাত্র আশ্রয়স্থল।
মাটির দেয়ালের আড়ালে ঢুকে দেখল, সেখানে লোকজনরা কি যেন করছে, কিন্তু কামান থেকে গোলা ছোঁড়া হচ্ছে না। এই লোকগুলি কারা সেটা বুঝবার মতো সময়ও তার ছিল না। সে দেখল, প্রবীণ অফিসারটি উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, যেন নিচের কোনো কিছু পরীক্ষা করছে, একটি সৈনিক ভাইসাব! বলে চিৎকার করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে এবং যারা তার হাত চেপে ধরেছে তাদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করছে। তাছাড়া আরো এমন কিছু সে দেখল যা সত্যি অদ্ভুত।
কিন্তু এটা বুঝবার সময় তার ছিল না যে কর্নেলটি যুদ্ধে মারা গেছে, যে সৈনিকটি ভাই বলে চেঁচাচ্ছে সে বন্দি হয়েছে, এবং আর একটি সৈনিককে তার চোখের সামনেই বেয়নেট গেঁথে ফেলা হয়েছে, কারণ সে দুর্গে ঢুকবার আগেই একটি ফ্যাকাসে-মুখ, ঘর্মাক্তদেহ, শুটকো লোক নীল ইউনিফর্ম পরে কি যেন বলতে বলতে তলোয়ার হাতে নিয়ে ছুটে এল। পরস্পরকে দেখবার আগেই তারা দুজনই পূর্ণ গতিতে পাশাপাশি ছুটছিল, সেই সুযোগে পিয়ের হাত বাড়িয়ে সেই লোকটির (একজন ফরাসি অফিসার) কাঁধটা চেপে ধরল এবং অন্য হাতে চেপে ধরল তার গলা। অফিসারও তলোয়ার ফেলে দিয়ে পিয়েরের কলার চেপে ধরল।
কয়েক সেকেন্ড তারা দুজনই ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পরস্পরের অপরিচিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারা কি করেছে এবং পরে কি করবে তা ভেবে দুজনই বিচলিত বোধ করল। দুজনই ভাবতে লাগল : আমিই কী বন্দি হয়েছি, না কি তাকে বন্দি করেছি? কিন্তু ভয়ের তাড়নায় পিয়ের ফরাসি অফিসারের গলাটা ক্রমেই এত বেশি শক্ত করে চাপতে লাগল যে তার মনে হতে লাগল যে সেই বন্দি হয়েছে। ফরাসিটি কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় একটা কামানের গোলা তাদের মাথার একেবারে উপর দিয়ে এমন ভয়ংকরভাবে হিস-হিস শব্দে ছুটে গেল আর ফরাসি অফিসারটিও এত তাড়াতাড়ি মাথাটা নামিয়ে নিল যে পিয়েরের মনে হল বুঝি তার মাথাটাই উড়ে চলে গেল।
