সোনিয়া আর বলতে পারল না, বিছানায় শুয়ে আবার দুই হাতে মুখ ঢাকল। নাতাশা সান্ত্বনা দিতে লাগল, কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা গেল, বন্ধুর বিপদের গুরুত্ব সে ভালোই বুঝতে পেরেছে।
যেন এতক্ষণে বন্ধুর দুঃখের আসল কারণটা বুঝতে পেরেছে এমনিভাবে সে হঠাৎ বলে উঠল, সোনিয়া, আমি নিশ্চিত জানি ডিনারের পরে ভেরা নিশ্চয় তোমাকে কিছু বলেছে। তাই নয় কি?
হ্যাঁ, এই কবিতাগুলো নিকলাস নিজে লিখেছে, অন্য কতকগুলি আমি নকল করেছি; এগুলিকে আমার টেবিলে দেখতে পেয়ে ভেরা বলছে সব মামণিকে দেখাবে, আমি নাকি অকৃতজ্ঞ, আর মামণি কখনো আমার সঙ্গে তার বিয়ে হতে দেবে না, সে নাকি জুলিকে বিয়ে করবে। সে তো সারাটা দিন জুলির সঙ্গেই ছিল …নাতাশা, আমি এমন কি করেছি যার জন্য আমার কপালে এমনটা ঘটল?… ।
আবার সে আগের চাইতেও বেশি করে ফোঁপাতে লাগল। নাতাশা তাকে তুলল, জড়িয়ে ধরল, এবং চোখের পানি ফেলেও হাসতে হাসতে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।
সোনিয়া, ভেরার কথায় বিশ্বাস করো না ভাই! তার কথায় বিশ্বাস করো না! তোমার কি মনে নেই, রাতের খাবারের পরে ছোট ঘরে বসে নিকলাস ও আমরা কত কথা বলেছি? আরে, কি যে হবে তা তো আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম? সেটা যে কি আমার মনে নেই, কিন্তু তোমারও কি মনে নেই, কি চমৎকার ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম? ঐ তো শিনশিন খুড়োর ভাই তার নিকট সম্পর্কের এক বোনকে বিয়ে করেছে না? আর আমরা তো দূর সম্পর্কের! আর বরিসও বলেছে যে এটা খুবই সম্ভব। কি জান, তাকে আমি সব কথা বলেছি। আর সে যেমন চালাক-চতুর, তেমনি ভালো! তুমি কেঁদ না সোনিয়া, লক্ষ্মী সোনিয়া! তাকে চুমো খেয়ে নাতাশা হাসতে লাগল। ভেরার মনে ঈর্ষা ঢুকেছে; তার কথা ভেবো না! সব ঠিক হয়ে যাবে; সে মামণিকে কিছু বলবে না। নিকলাস নিজেই তাকে বলবে; জুলিকে নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামায় না।
নাতাশা তার চুলে চুমো খেল।
সোনিয়া উঠে বসল। বিড়ালছানাটি ঝলমলিয়ে উঠল, চোখ চকচক করতে লাগল, মনে হলো, এখনই লেজ তুলে নরম থাকা মেলে লাফিয়ে সুতোর বলটা নিয়ে খেলা শুরু করবে, ঠিক যেমনটি বিড়াল বাচ্চা করে।
তাড়াতাড়ি ফ্রক ও চুল ঝেড়ে সোনিয়া বলল, তোমার তাই মনে হয়? সত্যি?
ঠিক বলছ? সত্যি, ঠিক!
নাতাশা জবাব দিল।
দুজনই হেসে উঠল।
ঠিক আছে, চল, গান করি গে, সেই ঝর্নার গান।
চলে এস।
হঠাৎ থেমে নাতাশা বলল, তুমি কি জান, আমার উল্টো দিকে যে মোটাসোটা পিয়ের বসেছিল সে কি রকম মজার লোক! আমার খুব খুশি লাগছে!
সে এক চুটে দালান পার হয়ে চলে গেল।
কবিতাগুলিকে বুকের মধ্যে খুঁজে নিয়ে সোনিয়া নাতাশার পিছনে ছুট দিল; আর মুখ লাল, পা দু-খানি খুশিতে হাল্কা। অতিথিদের অনুরোধে তারা সকলে মিলে ঝর্নার গানটা গাইল। সকলেই শুনে খুশি হলো। তার পর নিকলাস একটা সদ্য-শেখা গান গাইল।
রাতের বেলা যবে জ্যোৎস্না হাসে
তখন যদি তুমি ভাবতে পার–
একজন আছে শুধু তোমার পাশে,
আহা কি মিষ্টি সেই স্বপ্ন আরো।
বীণার তারে লেগে তারই ছোঁয়া
মিষ্টি রাগিণী যায় সাগর ছুঁয়ে,
তোমারই লাগি যায় সাগর ছুঁয়ে,
তোমারই লাগি তার এ-গান গাওয়া,
মধুর আবেশে যায় তোমারে ছুঁয়ে।
অমলিন স্বপ্নের দু-একটি দিন,
কিন্তু হায়! ততদিন রব না আমি!
গানের শেষ স্তবকটি শেষ হবার আগেই ছেলেমেয়েরা বড় হলটায় নাচের জন্য তৈরি হাতে লাগল; গ্যালারি থেকে ভেসে এল পায়ের শব্দ আর বাজনাদারদের কাশির শব্দ।
শিনশিন বসবার ঘরেই পিয়েরকে আটকে রাখল। সম্প্রতি সে বিদেশে থেকে ঘুরে এসেছে; তাই সে ভদ্রলোক তার সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা জুড়ে দিল; আরো কয়েকজন তাতে যোগ দিল; কিন্তু পিয়ের বিরক্তি বোধ করতে লাগল। বাজনা শুরু হতেই নাতাশা সোজা তার কাছে এসে মুখ লাল করে হেসে বলল:
মামণি আমাকে বলে দিল, আপনাকে নাচে যোগ দিতে ওখানে নিয়ে যেতে হবে।
পিয়ের জবাব দিল, আমি তো নাচের তাল স্রেফ গুলিয়ে ফেলব; তবে তুমি যদি আমার গুরু হও…। ছোট মেয়েটির দিকে সে হাতখানা বাড়িয়ে দিল।
ওদিকে নাচের জুড়িরা তৈরি হচ্ছে; বাজনাদাররা সুর বাঁধছে; এদিকে পিয়ের তার সঙ্গিনীকে নিয়ে বসে পড়ল। নাতাশা খুব সুখী; এমন একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে সে নাচবে যে বিদেশে ঘুরে এসেছে। একটা ভালো জায়গায় বসে সে বয়স্কা মহিলার মতোই তার সঙ্গে কথা বলছে। অন্য কোনো মহিলার দেওয়া একটা পাখা তার হাতে। সমাজে চলতে অভ্যস্ত মহিলাদের মতো ভঙ্গি করে (ঈশ্বর জানেন কবে কোথায় সে এ সব শিখেছে) পাখার হাওয়া খেতে খেতে হাসি মুখে সে তার সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
নাচ-ঘর পার হতে গিয়ে নাতাশাকে দেখিয়ে বলে উঠল, আরে দেখ, দেখ। ওর দিকে তাকাও!
নাতাশাও হাসল; তার মুখ লাল।
আচ্ছা মামণি! তুমি ও কথা বলছ কেন? এতে অবাক হবার কি আছে?
নাচের তখন তৃতীয় পর্যায় চলছে। বিশিষ্ট প্রবীণ অতিথিদের নিয়ে কাউন্ট ও মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা এতক্ষণ ছোট ঘরটাতে তাস খেলছিল। অনেকক্ষণ একটানা বসে থাকবার পরে এবার তারা আড়মোড়া ভেঙে টাকার থলি ও পকেট-বই ঠিক মতো তুলে নিয়ে নাচ-ঘরে ঢুকল। খুশিভরা মুখে প্রথম ঢুকল মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ও কাউন্ট। কাউন্ট ব্যালে নাচের ভঙ্গিতে হাতটা নুইয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর এগিয়ে চলল; মার্জিত পৌরুষের স্মিত হাসিতে তার মুখটা উজ্জ্বল। নাচ শেষ হতেই বাজনাদারদের লক্ষ্য করে হাততালি দিয়ে সে গ্যালারির দিকে তাকাল; তারপর প্রথম বেহালাদারকে বলল :
