একটি গোল-মুখ তরুণ অফিসার সবে ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়েছে, এখনো একেবারেই ছেলেমানুষ, দুটি কামান চালাবার ভার পেয়ে সে খুবই গর্বিত।
রুক্ষ স্বরে সে পিয়েরকে বলল, স্যার, দয়া করে একটু সরে দাঁড়ান। এখানে আপনার থাকা উচিত নয়।
সৈন্যরাও পিয়েরের দিকে তাকিয়ে আপত্তিসূচকভাবে ঘাড় নাড়তে লাগল। কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারল যে শাদাটুপিওয়ালা এই লোকটি তাদের কোনো ক্ষতি করছে না, সলজ্জ হাসিমুখে পরিখার পাশে চুপচাপ বসে আছে, বিনীতভাবে সৈন্যদের পথ ছেড়ে দিচ্ছে, যেন কোনো বুলভার্দে হাঁটছে এমনই শান্তভাবে গর্জনমুখর কামানের নিচ দিয়ে হাঁটছে, তখন তাদের সেই বিরূপ মনোভাব ধীরে ধীরে দূর হয়ে তার পরিবর্তে দেখা দিল একধরনের করুণাপরবশ সহানুভূতি যা সৈন্যরা সাধারণতই পোষণ করে তাদের কুকুর, মোরগ, ছাগল ও অন্য সব প্রাণীর প্রতি যারা রেজিমেন্টের সঙ্গেই চলাফেরা করে। সৈন্যরা ক্রমে পিয়েরকে তাদের পরিবারের একজন বলেই মেনে নিল, তাকে একটা ডাক নাম (আমাদের ভদ্রলোক) দিল, এবং তাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-তামাশাও করতে লাগল।
পিয়েরের হাত দুই দূরে একটা গোলা ফাটল, তার ফলে তার পোশাক যে ধুলো-মাটি লাগল সেটা ঝাড়তে ঝাড়তে সে চারদিকে তাকাল।
লালমুখ, চওড়া-কাঁধ একটি সৈনিক পিয়েরকে জিজ্ঞাসা করল, সে কি স্যার এতেও আপনি ভয় পেলেন না? সৈনিকটি একটু হাসল, দুই পাটি শাদা দাঁত বেরিয়ে পড়ল।
তাহলে কি আপনি ভয় পেয়েছেন? পিয়ের শুধাল।
তাছাড়া আর কি আশা করতে পারেন? সৈনিকটি জবাব দিল। জানেন তো তিনি বড়ই নিষ্ঠুর! তিনি যখন সরবে ধেয়ে আসেন তখন আপনার সব জাড়িজুড়ি উবে যায়! ভয় না পেয়ে উপায় আছেসৈনিকটি হাসতে লাগল।
কয়েকটি সৈনিক পিয়েরের পাশে এসে দাঁড়াল। একজন বলল, এটা আমাদের মতো সৈনিকদের ব্যাপার। কিন্তু একজন ভদ্রলোকের পক্ষে এ আচরণ খুব আশ্চর্যের। একজন ভদ্রলোক বটে!
সেই সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে তরুণ অফিসারটি বলল, প্রত্যেকে যার যার জায়গায় যান!
গোটা যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে কামানের গর্জন ও বন্দুকের শব্দ ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে ব্যাগ্রেশনের সেনাদল অবস্থিত, আর পিয়ের যেখানে আছে সে জায়গাটা ধোঁয়ায় এমন ঢেকে গেছে যে কোনো কিছুই ভালো করে দেখাই যাচ্ছে না।
দশটা নাগাদ প্রায় বিশ জনকে কামানশ্রেণীর কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, দুটো কামান ধ্বংস হয়েছে, আর কামানের গোলা আরো বেশি সংখ্যায় এসে পড়ছে, হুশ-হুঁশ শব্দে চারদিকে বুলেট উড়ছে। কিন্তু কামানশ্রেণীর সৈনিকদের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই, চারদিকে শোনা যাচ্ছে হাসিখুশি ও ঠাট্টা-তামাশার শব্দ।
একটা গোলা শাঁ শাঁ করে এগিয়ে এলে একটি সৈনিক চেঁচিয়ে বলল, একেবারে তাজা!
গোলাটা পাশ কাটিয়ে সহায়ক পদাতিকদের মধ্যে পড়ায় আর একজন বলে উঠল, এদিকে আসেনি! পদাতিক বাহিনীর দিকে গেছে!
একটা গোলা উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখে একটি চাষী মাথাটা নিচু করায় তাকে ঠাট্টা করে একজন বলে উঠল, তুমি কি বন্ধুকে অভিবাদন করছ নাকি হে?
সামনে কি ঘটছে দেখবার জন্য কয়েকজন সৈন্য এসে পরিখার প্রাচীরের পাশে দাঁড়াল।
তারা বলল, ওরা অগ্রবর্তী দলটাকে সরিয়ে নিয়েছে।
বুড়ো সার্জেন্টটি চেঁচিয়ে বলল, নিজেদের কাজে মন দাও গে। তারা যদি সরে গিয়ে থাকে তো বুঝতে হবে পিছনের দিকে তাদের অনেক কাজ রয়েছে।
সার্জেন্ট একটি সৈনিকের ঘাড় ধরে হাঁটু দিয়ে একটা গুতো মারল। অন্য সকলে হো-হো করে হেসে উঠল।
একদিক থেকে চিৎকার শোনা গেল, পাঁচ নম্বর কামানে যাও। চাকা ঘোরাও।
এবার সকলে একসঙ্গে, মাঝিদের মতো! যারা কামানটাকে নাড়াচ্ছিল তাদের উত্যুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
লাল-মুখ রসিক লোকটি পিয়েরকে দেখিয়ে দাঁত বের করে বলল, আমাদের ভদ্রলোকের টুপিটা প্রায় উড়িয়ে দিয়েছিল! গোলাটা কামানের চাকা ও একটি সৈনিকের পায়ের উপর পড়ায় সে বলে উঠল, যতসব বাঁচাল মেয়েমানুষ!
আহতদের সরিয়ে নেবার জন্য জনাকয়েক অসামরিক লোক মাথা নিচু করে কামানশ্রেণীর মধ্যে ঢুকে পড়ায় তাদের দেখিয়ে হাসতে হাসতে আর একজন বলল, আরে, এই তো শেয়াল মশাইরা এসে পড়েছে।
একটি সৈনিকের একটা পা উড়ে গেছে। অসামরিক লোকগুলি তার সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করায় আর একজন হেসে বলল, আচ্ছা, এখানা তাহলে তোমাদের পছন্দ হচ্ছে না? আঃ, যতসব কাকের দল! তোমরা বয় পেয়েছ!
চাষীদের অনুকরণ করে বলল, এই যে বাছারা…ওঃ, ওঃ! এসব ওদের মোটেই পছন্দ নয়।
পিয়ের লক্ষ্য করল যতবার শিবিরের উপর গোলা এসে পড়ছে, যতবার কেউ হতাহত হচ্ছে, ততই যেন এদের উদ্দীপনা বেড়ে যাচ্ছে।
বজ্রগর্ভ মেঘ যত এগিয়ে আসে তার ভিতরকার আগুনের শিখা যেমন ততই স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়, ঠিক তেমনি এই সব মানুষের অন্তরে লুকানো আগুনের শিখা ক্রমাগত তীব্রতর হয়ে তাদের চোখে-মুখে জ্বল জ্বল করছে।
পিয়ের এখন আর যুদ্ধক্ষেত্র দেখছে না, সেখানে কি ঘটছে তাতে তার কোনো আগ্রহ নেই, যে আগুন ক্রমেই উজ্জ্বলতর হয়ে জ্বলছে, নিজের আত্মার মধ্যে যার প্রতিফলন সে উপলব্ধি করছে, সমস্ত মন দিয়ে এখন সে তাকেই শুধু দেখছে।
যে পদাতিক সেনাদল কামানশ্রেণীর সম্মুখস্থ ঝোঁপের মধ্যে কামেংকা ঝর্ণার তীর বরাবর আস্তানা পেতেছিল তারা পশ্চাৎপসরণ করল। পাহাড়ের উপর থেকেই দেখা গেল আহতদের বয়ে নিয়ে তারা দৌড়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। একজন জেনারেল সদলবলে কামানশ্রেণীর কাছে এসে কর্নেলের সঙ্গে কিছু কথা বলে পিয়েরের দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাকাল, গোলাগুলির হাত থেকে কিছুটা রেহাই পাবার জন্য কামানশ্রেণীর পিছন দিককার সাহায্যকারী পদাতিক সৈন্যদের শুয়ে পড়বার হুকুম দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। তারপরেই কামানশ্রেণীর ডান দিককার পদাতিক সেনাদলের মধ্য থেকে ঢাকের বাজনা ও হুকুমের চিৎকার শোনা গেল, তারা সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
