এই লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কেন? তাকে দেখে কে একজন চেঁচিয়ে বলল।
সৈন্যরা তাকে বলল, বাঁদিকে যান!…ডাইনে যান!
পিয়ের ডানদিকে এগিয়ে গেল, আর অপ্রত্যাশিতভাবে রায়েভস্কির একজন পরিচিত অ্যাডজুটান্টের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। অ্যাডজুটান্ট ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল, চিৎকার করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে চিনতে পেরে মাথাটা নাড়ল।
আপনি এখানে কেমন করে এলেন? বলেই সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
পিয়ের বুঝল এটা তার জায়গা নয়, এখানে তার কিছু করারও নেই, আর পাছে আবার কারো পথ আগলে দেয় এই ভয়ে অ্যাডজুটান্টের পিছনে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
ওখানে কি হচ্ছে? আমি কি আপনার সঙ্গে যেতে পারি? সে শুধাল।
এক মুহূর্ত, এক মুহূর্ত! বলে অ্যাডজুটান্ট মাঠের ভিতর দাঁড়ানো জনৈক কর্নেলের কাছে গিয়ে তার হাতে কিছু সংবাদ দিয়ে ফিরে এসে পিয়েরকে বলল, আপনি এখানে কেন এসেছেন কাউন্টা এখনো তেমনি কৌতূহলীই আছেন?
তা ঠিক, পিয়ের স্বীকার করল।
অ্যাডজুটান্ট ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে এগিয়ে চলল।
এখানটা তো তবু চলনসই, কিন্তু বাম বহে ব্যাগ্রেশনের দিকে তারা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
সত্যি? পিয়ের বলল। সেটা কোথায়?
আমার সঙ্গে পাহাড়ের উপরে চলুন। সেখান থেকেই সব দেখতে পাব, আর আমাদের কামানশ্রেণীর অবস্থা এখনো সহ্যের মধ্যেই আছে, যাবেন কি?
হ্যাঁ, যাব, বলে সহিসের খোঁজে সে চারদিকে তাকাল।
এতক্ষণে তার নজরে পড়ল আহত সৈন্যরা হয় টলতে টলতে চলেছে, নয় তো তাদের স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কাল যে মাঠের উপর দিয়ে সে ঘোড়া চালিয়ে এসেছে সেখানেও একটি সৈন্য বিসদৃশভাবে চিৎ হয়ে পড়ে আছে।
ওকে সরিয়ে নিয়ে যায়নি কেন? পিয়ের প্রশ্নটা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু অ্যাডজুটান্টের মুখের কঠিন ভাব দেখে নিজেকে সংযত করল।
সহিসের দেখা না পেয়ে পিয়ের অ্যাডজুটান্টের সঙ্গে খাড়ির ভিতর দিয়ে বায়েভস্কি দুর্গের দিকে এগিয়ে চলল। তার ঘোড়াটা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। সেও ঘোড়ার পিঠে বার বার ঠোক্কর খাচ্ছে।
মনে হচ্ছে আপনার ঘোড়ায় চড়ার অভ্যাস নেই কাউন্ট? অ্যাডজুটান্ট বলল।
পিয়ের বিচলিত গলায় বলল, ঠিক তা নয়, তবে ঘোড়াটা বড়ই হোঁচট খাচ্ছে।
আরে…ঘোড়াটা তো আঘাত পেয়েছে! অ্যাডজুটান্ট বলল। সামনের পায়ের হাঁটুর উপরে। একটা বুলেট যে তাতে সন্দেহ নেই। গুলির প্রথম অভিষেকের জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাই কাউন্ট!
গোলাগুলির শব্দে কানে তালা লাগবার যোগাড়। তারই ভিতর দিয়ে ষষ্ঠ কোরের ধোয়া পেরিয়ে তারা একটা ছোট জঙ্গলে পৌঁছে গেল। সে জায়গাটা শান্ত, ঠাণ্ডা, হেমন্তের আমেজে ভরা। পিয়ের ও অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল।
উপরে উঠে অ্যাডজুটান্ট শুধাল, জেনারেল কি এখানে আছেন?
ডানদিকটা দেখিয়ে একজন উত্তর দিল, একমিনিট আগেও তিনি এখানেই ছিলেন, এইমাত্র ওদিকে গেলেন।
অ্যাডজুটান্ট এমনভাবে পিয়েরের দিকে তাকাল যেন তাকে নিয়ে কি করা যায় সেটা ঠিক বুঝতে পারছে না।
পিয়ের বলল, আমার জন্য চিন্তা করবেন না। পারলে আমি নিজেই গোল পাহাড়ে উঠে যাব কি?
হ্যাঁ, তাই যান। সেখান থেকে সবকিছুই দেখতে পাবেন, আর সেখানে বিপদও কম। পরে আপনাকে নিতে আসব।
পিয়ের কামানশ্রেণীর দিকে চলে গেল, আর অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছেড়ে দিল। তাদের আর দেখা হয়নি, তবে অনেক পরে পিয়ের জানতে পেরেছে যে সেইদিনই তার একটা হাত কাটা গেছে।
যে গোল পাহাড়ে পিয়ের উঠে গেল সেটাই সেই বিখ্যাত পাহাড় যেটাকে পরবর্তীকালে রুশরা বলত গোল পাহাড় কামানশ্রেণী অথবা রায়েভস্কি দুর্গ, আর ফরাসিরা বলত la grande redoute, la fatale red oute, la redoute du centre, তাকে ঘিরেই হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, আর ফরাসিরা তাকেই মনে করে সমস্ত ঘাঁটির চাবিকাঠিস্বরূপ।
এই শিবিরের তিনদিকে পরিখা কাটা হয়েছিল। সেই পরিখার ভিতরে ছিল দশটা কামান, আর মাটির দেয়ালের ভিতরকার ফাঁক দিয়ে সেই কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল।
গোল পাহাড়ের একই সারিতে দুই দিকে সাজানো অন্য সব কামান থেকেও অনবরত গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। কামানের পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল পদাতিক বাহিনী। গোল পাহাড় বেয়ে উঠবার সময় পিয়ের ভাবতেই পারেনি যে কয়েকটা পরিখা কেটে যেখানে থেকে মাত্র কয়েকটা কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে সেটাই এই যুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
বরং যেহেতু সে নিজে সেখানে উপস্থিত হতে পেরেছে ঠিক সেই কারণেই সেই স্থানটিকে তার মনে হয়েছে সবচাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে পিয়ের পরিখার এক প্রান্তে বসে চারদিকে দেখতে লাগল, অকারণেই একটা খুশির হাসি ফুটল তার মুখে। কামান থেকে একটার পর একটা গোলাবর্ষণ অনবরত চলেছে, কানে তালা লেগে যাচ্ছে, বারুদের ধোয়ার চারদিক ঢেকে যাচ্ছে।
সাহায্যকারী পদাতিক বাহিনীর মনে বেশ ভয়ের সঞ্চার হলেও একটা পরিখার দ্বারা তাদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন যে কয়জন সৈনিক কামান দাগতে অতিমাত্রায় ব্যস্ত, তাদের মনে কাজ করছে একটা পারিবারিক প্রীতির উদ্দীপনা।
পিয়েরের শাদা টুপিওয়ালা অসামরিক মূর্তির উপস্থিতিকে প্রথমে তারা ভালো চোখে দেখল না। তার পাশ দিয়ে আসতে-যেতে সৈনিকরা কিছুটা বিস্ময়ে, কিছুটা সভয়ে তার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। একজন প্রবীণ গোলন্দাজ অফিসার একেবারে শেষপ্রান্তের কামানটির কাজকর্ম দেখবার জন্য পিয়েরের দিকে এগিয়ে এল। তার একটা পা নেই, মুখময় দাগভর্তি। সে কৌতূহলের সঙ্গে পিয়েরের দিকে তাকাল।
