অ্যাডজুটান্ট চেঁচিয়ে বলল, সময় হয়ে গেছে কাউন্ট, সময় হয়ে গেছে!
সহিসকে ঘোড়া নিয়ে পিছনে আসতে বলে পিয়ের পথে নেমে সেই গোল পাহাড়ে গেল যেখান থেকে সে আগের দিন যুদ্ধক্ষেত্রটাকে দেখেছিল। সেখানে একদল সামরিক লোক জড় হয়েছে, কর্মচারীরা ফরাসিতে বলছে, লাল ফিতে লাগানো শাদা টুপি-পরা কুতুজভের শাদা মাথাটা দেখা যাচ্ছে, তার গলার নিচটা কাঁধের মধ্যে ডুবে গেছে। একটা ছোট দূরবীণের ভিতর দিয়ে সে বড় রাস্তাটার উপর দৃষ্টি রেখেছে।
সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে সামনের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তার সৌন্দর্যে পিয়ের মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। গোটা অঞ্চল সৈন্যে ঠাসা, কামানের ধোয়ার মেঘে আচ্ছন্ন, উজ্জ্বল সূর্যের তির্যক কিরণরাশি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যবলীর একেবারে শেষপ্রান্তে অবস্থিত অরণ্যকে মনে হচ্ছে হলুদ-সুবজ মূল্যবান পাথরে খোদাই করা ছবি, তার আন্দোলিত রেখাঁটিকে মনে হচ্ছে দিগন্তের প্রেক্ষাপটে একখানি সিলুয়েট, সৈন্যপরিবৃত স্মোলেন বড় রাস্তাটা ভালুভোর ওপাশে তাকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। সম্মুখে, বাঁয়ে, ডাইনে, সর্বত্রই শুধু সৈন্য আর সৈন্য। এসব কিছুই স্পষ্ট, মহনীয়, অপ্রত্যাশিত, কিন্তু পিয়েরের মনকে সবচাইতে বেশি করে আকর্ষণ করল রণক্ষেত্র, বরদিনো এবং কলোচার দুই তীরবর্তী খাড়ির দৃশ্যগুলি।
পুফ!–হঠাৎ একটা ঘন গোলাকার ধোঁয়ার মেঘ বেগুনি থেকে ধূসর ও দুধ-শাদা হয়ে দেখা দিল, আর এক সেকেন্ড পরেই বুম! করে একটা গর্জন শোনা গেল।
পুফ পুফ! দুটো অনুরূপ মেঘ এসে পরস্পরকে ঠেলা মারল, আর চোখের যা দেখা গেল কানে তারই গর্জন শোনা গেল বুম বুম!
পিয়ের প্রথম মেঘটার দিকে তাকাল, একটা ঘন ঘোল বল যেন, পরমুহূর্তেই তার জায়গায় দেখা দিল ভাসমান ধোয়ার বেলুন আর পুফ! পুফ! পুফ–প্রথমে তিনটে ও তারপরে চারটে দেখা দিল এবং তাদের প্রত্যেকটা থেকে একই সময়ের ব্যবধানে-বুমবুমবুম! শব্দে এল তার জবাব। মনে হল, সেই ধোয়ার মেঘগুলো কখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর মাঠ-ঘাট-জঙ্গল আর ঝকঝকে বেয়নেটগুলো তাদের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। বাঁদিকে মাঠ ও ঝোঁপের ভিতর থেকেও ধোঁয়ার বড় বড় বলগুলি অনবরত ছুটে আসছে, আর তাদের পিছন পিছন আসছে গম্ভীর গর্জন, এদিকে আরো কাছে, খাড়ি ও জঙ্গল থেকে আসছে গাদা বন্দুকের ছোট ছোট মেঘ, সেগুলি বলের আকার ধরছে না, কিন্তু ছোট ছোট ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ঠিকই হচ্ছে। ট্রাক-টা-টা-টাট! গাদা বন্দুকের অনিয়মিত শব্দ প্রায়ই আসছে, কিন্তু কামান-গজনের তুলনায় সেগুলি খুবই দুর্বল।
সেই ধোঁয়া, সেই ঝকঝকে বেয়নেট, সেই চলাফেরার মধ্যে থাকতে পিয়েরের ভালো লাগছে। নিজের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে নেবার জন্য সে কুতুজভ ও তার দলবলের দিকে তাকাল। তারাও তার মতোই যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হল, তাদের মনোভাবও তারই অনুরূপ।
যাও বন্ধু, এগিয়ে যাও…খৃস্ট তোমার সহায় হোন! যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চোখ না সরিয়েই কুতুজভ পাশে দাঁড়ানো একজন জেনারেলকে কথাগুলি বলল।
হুকুম শুনে জেনারেলটি পিয়েরের পাশ দিয়ে গোল পাহাড় থেকে নেমে গেল।
সে কোথায় চলেছে এই প্রশ্নের জবাবে জেনারেল কঠিন, ঠাণ্ডা গলায় বলল, মোহনার দিকে!
আমিও সেখানেই যাব, এই কথা ভেবে পিয়ের তার পিছু নিল।
কসাক একটা ঘোড়া এনে দিলে জেনারেল তাতে সওয়ার হল। পিয়ের সহিসের দিকে এগিয়ে গেল, কেন ঘোড়াটা সবচাইতে শান্ত জেনে নিয়ে সেটাতে সওয়ার হল, তার ঘাড়ের লোম চেপে ধরে গোড়ালি দুটো ছড়িয়ে ঘোড়ার পেটে চাপ দিতেই সে ছুটতে শুরু করল। পিয়েরের মনে হল তার চশমা বুঝি খুলে পড়বে, কিন্তু তখন আর ঘোড়ার লোম ও হাতের রাশ কোনোটাই ছাড়া সম্ভব নয়, জেনারেলের পিছনে সেও জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। গোল পাহাড়ের উপর থেকে অফিসাররা তাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
১০.৪ সৈন্য আর সৈন্য
অধ্যায়-৩১
যে জেনারেলটিকে পিয়ের অনুসরণ করছিল, পাহাড় থেকে নেমে সে হঠাৎ বাঁদিকে ঘুরে গেল, পিয়ের তাকে আর দেখতে পেল না, অগত্যা সে ঘোড়া ছুটিয়ে কিছু পদাতিক সৈন্যের মধ্যে গিয়ে পড়ল। সে চেষ্টা করল তাদের আগে অথবা বায়ে বা ডাইনে দিয়ে চলে যাবে, কিন্তু সব জায়গায়ই সৈন্য আর সৈন্য, আর সকলেই অত্যন্ত ব্যস্ত। সকলেই সেই একই অসন্তুষ্ট, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শাদা টুপি মাথায় এই শক্ত-সমর্থ মানুষটির দিকে তাকাচ্ছে, সকলেই যেন ভয় পাচ্ছে যে এই লোকটি তার ঘোড়র ক্ষুরের নিচে তাদের মাড়িয়ে চলে যাবে।
একজন চিৎকার করে বলল, ব্যাটেলিয়নের মাঝখান দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দিয়েছেন কেন?
আর একজন তো বন্দুকের কুঁদো দিয়ে তার ঘোড়াকে একটা খোঁচাই দিয়ে বসল, পিয়ের ঘোড়ার পিঠে ঝুঁকে পড়ে সামান্য একটু জায়গা পেয়ে সেই ফাঁক দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
সামনেই একটা সেতু, সৈন্যরা সেখান থেকে গুলি চালাচ্ছে। পিয়ের তাদের দিকে এগিয়ে গেল। না জেনেই সে গোর্কি ও বরদিনোর মধ্যবর্তী জায়গায় কলোচা নদীর সেতুর কাছে এসে পড়েছে, বরদিনো দখল করার পরে যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ফরাসিরা এই সেতুটার উপরেই আক্রমণ চালিয়েছে। পিয়ের দেখল তার সামনেই একটা সেতু, সেতুর দুই পারে এবং মাঠের মধ্যে সৈন্যরা কি যেন করছে, অনবরত গোলাগুলি চলা সত্ত্বেও সে বুঝতেই পারেনি যে এটাই রণক্ষেত্র। হিস-হিস শব্দে অনবরত গুলি ছুটছে, বাঁকা হয়ে গোলা ছুটছে মাথার উপর দিয়ে, কিন্তু তার খেয়ালই নেই, নদীর অপর পারে শত্রুদেরও সে দেখতে পায়নি, আশেপাশে অনেক সৈন্য মাটিতে পড়লেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে নিহত ও আহতদেরও লক্ষ্য করেনি। তার মুখের হাসিটি তখনো লেগেই আছে।
