হ্যাঁ স্যার।
চালও?
রাপ উত্তরে জানাল যে চাল সম্পর্কে সম্রাটের আদেশ সে জারি করেছে। কিন্তু তার সে হুকুম যে তামিল করা হয়েছে সেটা বিশ্বাস না করে নেপোলিয়ন মাথা নেড়ে অসন্তোষ প্রকাশ করল। পঞ্চ-পানীয় নিয়ে একজন অনুচর ঢুকল। রাপের জন্য আর এক গ্লাস আনতে বলে নিঃশব্দে নিজের গ্লাসে চুমুক দিতে লাগল।
গ্লাসটা শুঁকে বলল, স্বাদ-গন্ধ কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। এ সর্দি বড়ই ক্লান্তিকর। লোকে ওষুধের কথা বলেওষুধে যখন সর্দিই সারে না তখন ওষুধ দিয়ে কি হবে! কর্ভিসার্ট (নেপোলিয়নের বিখ্যাত চিকিৎসক) এই লজেন্সগুলো দিয়েছে, কিন্তু এতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ডাক্তাররা রোগ কি সারাবে? কেউ কিছু সারাতে পারে না। আমাদের দেহটাই বাঁচবার যন্ত্র। সেইভাবেই এটাকে গড়া হয়েছে, এর স্বভাবেই আছে বেঁচে থাকার মন্ত্র । জীবনকে অব্যাহতগতিতে চলতে দাও, সে নিজেই নিজেকে রক্ষা করুক, ওষুধ দিয়ে দেহটাকে পঙ্গু করার চাইতে তাতে অনেক বেশি ফল পাওয়া যাবে। একটা ভালো ঘড়ির মতোই আমাদের শরীর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঠিকভাবে চলে, ঘড়িওয়ালা সেটাকে খুলতে পারে না, কাঁপা হাতে অন্ধের মতো কিছুটা ঠিকঠাক করতে পারে মাত্র…হ্যাঁ, আমাদের শরীর বাঁচবার যন্ত্রস্বরূপ, সেটাই শেষ কথা।
কোনো কিছুর সংজ্ঞা দেওয়াটা নেপোলিয়নের প্রিয় কাজ, অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ সে একটা নতুন সংজ্ঞা দিল।
তুমি কি জান রাপ, সমর-কলা কাকে বলে? কোনো একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে শত্রুপক্ষ অপেক্ষা অধিকতর শক্তশালী হওয়াই সমর-কলা। আর কিছু নয়।
রাপ জবাব দিল না।
নেপোলিয়ন বলল, কাল আমাদের লড়তে হবে কুতুজভের সঙ্গে। দেখা যাক! তোমার কি মনে আছে, ব্রাউনাউতে তিনি তিন সপ্তাহ ধরে সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন কিন্তু পরিখাগুলি পরিদর্শন করতে একটিবারও ঘোড়ায় চাপেননি…দেখাই যাক!
আবার ঘড়ি দেখল। সবে চারটে বাজে। ঘুম পাচ্ছে না। পঞ্চ-পানীয় ফুরিয়ে গেছে। করারও কিছু নেই। উঠল, এ-দিক ও-দিক হাঁটল, গরম ওভারকোট ও টুপিটা নিয়ে শিবির থেকে বেরিয়ে গেল। রাতটা অন্ধকার, সঁতসেঁতে, প্রায় অলক্ষ্য একটা ভিজে বাতাস উপর থেকে নেমে আসছে। কাছেই ফরাসি রক্ষীদলের শিবির আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, দূরে রুশদের শিবির-আগুন ধোয়ার ভিতর দিয়ে জ্বলজ্বল করছে। আবহাওয়া শান্ত, যার যার ঘাঁটি নিতে অগ্রসরমান ফরাসি সৈন্যদের পোশাকের খসখস ও পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
শিবিরের সামনে হাঁটতে হাঁটতে নেপোলিয়ন আগুনের দিকে তাকাল, কান পেতে সব শব্দ শুনতে লাগল। লোমশ টুপি-পরা যে লম্বা শান্ত্রীটি শিবিরের সামনে পাহারা দিচ্ছিল, সম্রাটকে দেখে সে একটা কালো স্তম্ভের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নেপোলিয়ন তার সামনেই থামল।
শুধাল, তুমি কোন বছর চাকরিতে ঢুকেছ?
লোকটি জবাব দিল।
ওহহ! তুমি তা হলে পুরনো লোকদের একজন। তোমার রেজিমেন্ট চাল পেয়েছে কি?
পেয়েছে ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি।
নেপোলিয়ন মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল।
সাড়ে পাঁচটায় নেপোলিয়ন ঘোড়ায় চেপে শেভার্দিনো গ্রামে গেল।
আলো ফুটেছে। আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। শুধু পুবের আকাশে একখণ্ড মেঘ দেখা যাচ্ছে। সকালের ম্লান আলোয় পরিত্যক্ত শিবির-আগুনগুলো নিভে আসছে।
ডানদিকে কামানের একটিমাত্র গম্ভীর শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে হতে চারদিকের নিস্তব্ধতার মধ্যে মিলিয়ে গেল। কয়েক মিনিট কেটে গেল। কামানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় গর্জনে বাতাস কেঁপে উঠল, তারপরেই ডানদিকে কাছেই গর্জে উঠল চতুর্থ ও পঞ্চমবার।
প্রথম গর্জনের প্রতিধ্বনি থামবার আগেই আরো অনেক কামান গর্জে উঠল, নানা গর্জনের শব্দে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
সদলবলে শেভার্দিনো দুর্গে পৌঁছে নেপোলিয়ন ঘোড়া থেকে নামল। খেলা শুরু হয়ে গেছে।
.
অধ্যায়-৩০
প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে দেখা করে গোর্কিতে পিরে এসে পিয়ের সহিসকে হুকুম করল ঘোড়া তৈরি রাখতে এবং খুব সকালে তাকে ডেকে দিতে। তারপর বেড়ার পিছনে যে কোণটা বরিস তাকে ছেড়ে দিয়েছে সেখানে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে ভালোভাবে ঘুম ভাঙবার আগেই অন্য সকলে কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। ছোট ছোট জানালার কাঁচের পাল্লায় খট খট শব্দ হচ্ছে, আর সহিস তাকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে।
ইয়োর এক্সেলেন্সি! ইয়োর এক্সেলেন্সি! ইয়োর এক্সেলেন্সি! পিয়েরের ঘুম ভাঙবার সব আশা ছেড়ে দিয়ে তার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে সহিসটি নাছোড়বান্দার মতো তাকে ডাকছে।
জেগে উঠে পিয়ের শুধাল, কি হল? শুরু হয়ে গেছে? সময় হয়ে গেল?
বরখাস্ত সৈনিক-সহিসটি বলল, কামানের গর্জন শুনতে পাচ্ছেন না! ভদ্রলোকরা সকলেই বেরিয়ে গেছেন, প্রশান্ত মহামহিম তো অনেকক্ষণ আগেই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলেন।
তাড়াতাড়ি পোশাক পরে পিয়ের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সবকিছুই উজ্জ্বল, তাজা, শিশিরসিক্ত, আনন্দময়। মেঘের আড়াল থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা সূর্যের কিরণরাশি ছড়িয়ে পড়েছে রাস্তার ওপারের ছাদের উপর, পথের শিশির-ভেজা ধুলোর উপর, বাড়ির প্রাচীরে, জানালায়, বেড়ায়, এবং সামনে দাঁড়ানো পিয়েরের ঘোড়াগুলোর উপরে। বাইরে কামানের গর্জন আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। একজন কসাককে সঙ্গে নিয়ে জনৈক অ্যাডজুটান্ট জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল।
