যুদ্ধে পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর ক্ষতিপূরণস্বরূপ তারা পাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশংসাবাণী-নেপোলিয়নের এই ঘোষণা শুনে তারা চিৎকার করে উঠেছিল ভি ভেল এম্পেরিয়র! যে বালকটি খেলনা লাঠি দিয়ে ভূ-গোলককে বিদ্ধ করছে তার ছবি দেখেও তারা একইভাবে চিৎকার করেছিল ভি ভেল এম্পেরিয়র! আর তখন তাদের যে কোনো অর্থহীন কথা শোনালেই তারা চিৎকার করে বলত, ভি ভেল এম্পেরিয়র! ভি ভেল এম্পেরিয়র বলে চিৎকার করতে করতে খাদ্য ও আশ্রয় পাবার আশায় বিজয়ীর বেশে মস্কো প্রবেশের জন্য যুদ্ধ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। কাজেই তারা যে তাদেরই সমগোত্রীয় ভাইদের হত্যা করেছিল তার কারণ নেপোলিয়নের হুকুম নয়।
আর সে যুদ্ধের গতিও নেপোলিয়নের নির্দেশে চলেনি, কারণ তার কোনো হুকুমই কার্যকর করা হয়নি, আর যুদ্ধ চলাকালে সে জানতও না তার সামনে কি ঘটে চলেছে। কাজেই এই লোকগুলি যেভাবে একে অন্যকে মেরেছে সেটা নেপোলিয়নের ইচ্ছায় স্থির হয়নি, সেটা ঘটেছে তাকে ছাড়াই-যে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদের সকলের ইচ্ছা অনুসারে। শুধু নেপোলিয়নের মনে হয়েছিল যে সবই তার ইচ্ছামতো ঘটেছে। কাজেই তার সর্দি হয়েছিল কি হয়নি সে প্রশ্নটার কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্বই নেই।
অনেক লেখক একথাও বলে থাকেন যে সর্দি লাগার জন্যই তার এ যুদ্ধের বিলি-ব্যবস্থাগুলি আগেকার যুদ্ধের মতো সুপরিকল্পিত হতে পারেনি। এ কথাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উপরে যে বন্দোবস্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটা তো আগেকার এমন অনেক যুদ্ধের বন্দোবস্ত অপেক্ষা অনেক ভালো যেখানে নেপোলিয়ন জয়লাভ করেছিল। যুদ্ধকালে যেসব হুকুম সে প্রচার করেছে সেগুলো তো আগের সব যুদ্ধের হুকুমের চাইতে খারাপ কিছু নয়, একই রকমের। আসলে এইসব হুকুম ও বন্দোবস্ত যে আগেকার চাইতে খারাপ কিছু নয়, একই রকমের। আসলে এইসব হুকুম ও বন্দোবস্ত যে আগেকার চাইতে খারাপ মনে হয়েছে তার কারণ বরদিনোর যুদ্ধই প্রথম যুদ্ধ যেটা নেপোলিয়ন জিততে পারেনি। যে যুদ্ধে পরাজয় ঘটে সে যুদ্ধের অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও চমৎকার বন্দোবস্ত ও হুকুমগুলিও খারাপ বলে মনে হয়, এবং প্রত্যেক সমরবিশেষজ্ঞ পণ্ডিতই গম্ভীরভাবে সেগুলির সমালোচনা করে থাকে, আবার যে যুদ্ধে জয়লাভ ঘটে সে যুদ্ধের অত্যন্ত বাজে বন্দোবস্ত ও হুকুমও খুব ভালো মনে হয়, এবং সেসবের গুণকীর্তন করে পণ্ডিতরা মোটা মোটা বই লিখে ফেলে।
অস্তারলিজ যুদ্ধের বিলি-ব্যবস্থার যে পরিকল্পনা ওয়েরদার রচনা করেছিল সেটা ছিল পূর্ণতার আদর্শস্বরূপ, কিন্তু তবু তার সমালোচনা করা হয়েছিল–তার পূর্ণতা এবং অত্যধিক পুঙ্খানুপুঙ্খতার জন্যই সমালোচনা করা হয়েছিল।
অন্যসব যুদ্ধের মতোই, এমন কি তার চাইতে ভালোভাবেই, নেপোলিয়ন বরদিনের যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। যুদ্ধের অগ্রগতির পক্ষে ক্ষতিকর কিছুই সে করেনি, যুক্তিসঙ্গত মতামতের দিকেই ঝুঁকেছে, কোনোরকম গোলমাল সৃষ্টি করেনি, স্ববিরোধী কোনো কাজ করেনি, ভয় পায়নি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়নি, বরং তার নিজস্ব নিপুণ কুশলতা ও সামরিক অভিজ্ঞতায় শান্ত মর্যাদার সঙ্গে সেনাপতির কাজ পরিচালনা করেছে।
.
অধ্যায়-২৯
দ্বিতীয়বার সেনাদল পরিদর্শন করে ফিরে এসে নেপোলিয়ন মন্তব্য করল, দাবার খুঁটি সাজানো হয়েছে, কাল খেলা শুরু হবে।
পঞ্চ-পানীয় পাঠাবার নির্দেশ দিয়ে দ্য বুসেকে ডেকে এনে সে প্যারিসের ব্যাপারে এবং সম্রাজ্ঞীর গৃহস্থালিতে কিছু পরিবর্তনের ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলল। দরবার সংক্রান্ত খুঁটিনাটি ব্যাপারে তার স্মৃতিশক্তির বহর দেখে প্রিফেক্টরি অবাক হয়ে গেল।
পঞ্চ-পানীয়ের দ্বিতীয় গ্লাসটি শেষ করে পরের দিনের গুরুতর কাজের আগে সে বিশ্রাম নিতে চলে গেল। সে কাজে অতিআগ্রহের ফলে সে ঘুমোতে পারল না, সন্ধ্যার ভিজে আবহাওয়ায় সর্দিটা বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সজোরে নাক ঝাড়তে ঝাড়তে তিনটের সময় শিবিরের বড় অংশটায় গেল। রুশরা সরে গেছে কিনা প্রশ্ন করায় তাকে বলা হল, শত্রুপক্ষের আগুন একই জায়গায় আছে।
কর্তব্যরত অ্যাডজুটান্ট শিবিরে ঢুকল।
নেপোলিয়ন শুধাল, আচ্ছা রাপ, তুমি কি মনে কর আজ আমাদের কাজকর্ম বেশ ভালোই চলবে?
সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই স্যার, রাপ জবাব দিল।
নেপোলিয়ন তার দিকে তাকাল।
রাপ আবার বলল ম্মেলেনস্কে আপনি দয়া করে আমাকে কি বলেছিলেন তা কি আপনার মনে আছে স্যার? মদ তৈরি, পান করতেই হবে।
নেপোলিয়ন ভুরু কুঁচকাল, হাতের উপর মাথা রেখে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।
হঠাৎ বলে উঠল, বেচারা সৈন্যরা! সমালেনঙ্কের পরে তাদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সত্যি, ভাগ্য এক বারাঙ্গনা রাপ। কথাটা আমি আগাগোড়াই বলে এসেছি, এখন অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছি। কিন্তু রাপ, রক্ষীবাহিনী তো অটুট আছে?
হ্যাঁ স্যার, রাপ উত্তর দিল।
নেপোলিয়ন একটা লজেন্স নিয়ে মুখে পুরল, তারপর ঘড়ি দেখল। চোখে ঘুম নেই, এখনো সকাল হয়নি। সময় কাটাবার জন্য এখন আর নতুন করে কোনো হুকুম জারি করা অসম্ভব, কারণ সব হুকুমই দেওয়া হয়ে গেছে, এখন সেগুলি তামিল করার পালা।
নেপোলিয়ন রুক্ষ গলায় শুধাল, রক্ষী রেজিমেন্টদের কি বিস্কুট ও চাল দেওয়া হয়েছে।
