মোঝায়েস্কের নিকটবর্তী রাজকীয় শিবির,
৬ই সেপ্টেম্বর, ১৮১২
নেপোলিয়নের প্রতিভার প্রতি একান্ত ভীতি পোষণ না করে যদি এইসব অস্পষ্ট ও গোলমেলে বিলি ব্যবস্থার বিচার করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে নেপোলিয়ন চারটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে চারটি নির্দেশ দিয়েছিল। তার কোনোটিই কার্যকর করা হয়নি, করা যেত না।
বরদিনো পার হয়ে যাবার পরে উপরাজাকে কলোচা নদী পর্যন্ত হটিয়ে দেওয়া হল, সে আর অগ্রসর হতে পারল না, মোরাদ ও জেরার্দ-এর ডিভিশনগুলিও দুৰ্গটা দখল করতে পারল না, বরং তাদেরও হাটিয়ে দেওয়া হল, অবশ্য যুদ্ধের একেবারে শেষে অশ্বারোহী বাহিনী সেটা দখল করেছিল। (এ ঘটনাটা হয়তো নেপোলিয়ন আগে দেখতেও পায়নি, শোনেওনি। কাজেই তার বিলি-ব্যবস্থার একটি নির্দেশও কার্যকর হয়নি, করা যেতও না। কিন্তু বিলি-ব্যবস্থার মধ্যেই বলা আছে এইভাবে যুদ্ধ শুরু হবার পরে শত্রুর গতিবিধি অনুসারে নতুন নির্দেশ দেওয়া হবে, কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে যুদ্ধ চলাকালীন সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেপোলিয়নই করবে। কিন্তু তার করা হয়নি, করা যেতও না, কারণ গোটা যুদ্ধের সময় নেপোলিয়ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এত দূরে ছিল যে তার পক্ষে যুদ্ধের গতিবিধি জানাও সম্ভব ছিল না, আর সেইসময়ে তার কোনো নির্দেশও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
.
অধ্যায়-২৮
অনেক ইতিহাসকার বলে থাকে, নেপোলিয়নের সর্দি লেগেছিল বলেই ফরাসিরা বরদিনোর যুদ্ধ জিততে পারেনি, যদি তার সর্দিটা না হত তাহলে যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলাকালে যেসব হুকুম সে জারি করেছিল তাতে তার প্রতিভার স্পর্শ আরো বেশি করে লাগত, রাশিয়া হেরে যেত, আর পৃথিবীর মুখটাই বদলে যেত। যেসব ইতিহাসকাররা বিশ্বাস করে যে রাশিয়া গড়ে উঠেছিল একটিমাত্র লোকের-মহান পিতরের-ইচ্ছাশক্তিতে, এবং একটি মানুষের-নেপোলিয়নের-ইচ্ছাশক্তিতেই ফ্রান্স প্রজাতন্ত্র থেকে সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল এবং ফরাসি বাহিনী রাশিয়াতে গিয়েছিল, যারা বলে যে ২৪শে অগস্ট নেপোলিয়নের নিদারুণ সর্দি লেগেছিল বলেই রাশিয়া স্বীয় শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তাদের কথা যুক্তিসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে বটে।
বরদিনোর যুদ্ধ করা না করা যদি নেপোলিয়নের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে থাকে, যদি এটা-ওটা ব্যবস্থাও তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে তো স্পষ্টতই তার ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণকারী একটা সর্দিই রাশিয়াকে রক্ষা করেছিল, এবং তদনুসারে যে খানসামাটি ২৪ তারিখে নেপোলিয়নের ওয়াটারপ্রুফ-বুট জোড়াটা তাকে এনে দিতে ভুলে গিয়েছিল সেই ছিল রাশিয়ার ত্রাণকর্তা। এই চিন্তার ধারা অনুসরণ করলে তো এধরনে সিদ্ধান্ত একেবারেই সন্দেহের অতীত, ভলতেয়ার যখন ঠাট্টা করে বলেছিল যে নবম চার্লসের পেটের গোলমালের জন্যই সেন্ট বার্থোলোমিউ-র হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল তখন তার সেই সিদ্ধান্তও ছিল অনুরূপভাবেই সন্দেহের অতীত। কিন্তু একথা যারা স্বীকার করে না যে একটি লোকের প্রথম পিতরের-ইচ্ছায় গড়ে উঠেছিল রাশিয়া, অথবা একটি লোকের-নেপোলিয়নের ইচ্ছায় গড়ে উঠেছিল ফরাসি সাম্রাজ্য এবং শুরু হয়েছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তাদের কাছে এই যুক্তি অসত্য ও বুদ্ধিবিরোধী তো বটেই, উপরন্তু সর্বপ্রকার মানবিক বাস্তবতার বিরোধী। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী কিসে ঘটে সে প্রশ্নের আর একটা জবাব হল : মানবিক ঘটনাবলীর গতি নির্ধারিত হয় উপর থেকে–তা নির্ভর করে সেই ঘটনায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার উপরে, এইসব ঘটনার উপর একজন নেপোলিয়নের প্রভাব সম্পূর্ণ বাহ্যিক ও অলীক।
প্রথম দৃষ্টিতে যদিও এটা খুবই বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে নবম চার্লসের ইচ্ছানুসারে সেন্ট বার্থোলোমিউ-র হত্যাকাণ্ডটি ঘটেনি, যদিও সে ঘটনার হুকুমটা সেই দিয়েছিল এবং সে ভেবেছিল যে সেই হুকুম মতোই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, আবার এটাও খুব বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে নেপোলিয়নের ইচ্ছানুসারে বরদিনোতে আশি হাজার মানুষ খুন হয়নি, যদিও যুদ্ধ শুরু ও পরিচালনার হুকুমটা সেই দিয়েছিল এবং ভেবেছিল যে তার হুকুম মতোই কাজটা করা হয়েছে, এইসব ধারণা যত বিস্ময়করই মনে হোক, তথাপি যে মানবিক মর্যাদাবোধ আমাকে শিখিয়েছে যে আমরা কেউই মানুষ হিসেবে মহান নেপোলিয়ন অপেক্ষা বড় না হলেও ছোট নই সেই মানবিক মর্যাদাবোধই দাবি করছে যে সমস্যাটার এই সমাধানই গ্রহণযোগ্য, আর ঐতিহাসিক গবেষণাও সেটাকেই যথাযথভাবে প্রমাণ করেছে।
বরদিনোর যুদ্ধে নেপোলিয়ন কাউকে লক্ষ্য করে একটা গুলিও ছোঁড়েনি একটা মানুষকেও মারেনি। সেকাজ সবটাই করেছে সৈন্যরা। কাজেই সে তো মানুষ মারেনি।
ফরাসি সৈন্যরা যে বরদিনোর যুদ্ধে গিয়েছিল মারতে এবং মরতে সেটা নেপোলিয়নের হুকুমে নয়, নিজের ইচ্ছায়। গোটা বাহিনী-ফরাসি, ইতালিয়, পোলিশ ও ওলন্দাজ–সকলেই তখন ক্ষুধার্ত, ছিন্নবস্ত্রপরিহিত, অভিযানে ক্লান্ত, তারা যখন দেখল যে আর একটা বাহিনী মস্কোর পথ অবরোধ করেছে তখন তাদের মনে হল যে সামনে মদ রয়েছে আর সেটা পান করতেই হবে। তখন যদি নেপোলিয়ন তাদের রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করত, তাহলে তারা তাকেই হত্যা করে রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এগিয়ে যেত, কারণ সেটা ছিল অনিবার্য।
