সম্রাটের সঙ্গী হবার আমন্ত্রণের উত্তরে দ্য বুসে বলল, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রির অনেক দয়া! তার তখন ঘুম পেয়েছে, ঘোড়ায় চড়তেও সে জানে না, তাই খুব ভয়ও করছে।
কিন্তু নেপোলিয়নের ইশারায় দ্য বুসেকে ঘোড়ায় চাপতেই হল। নেপোলিয়ন শিবির থেকে বেরিয়ে এলে তার ছেলের ছবির সামনে সমবেত রক্ষীদের চিৎকার আরো উচ্চকণ্ঠ হল। নেপোলিয়নের চোখে ভকুটি দেখা দিল।
রাজকীয় ভঙ্গিতে ছবিটা দেখিয়ে বলল, ওকে সরিয়ে নিয়ে যাও! যুদ্ধক্ষেত্র দেখবার সময় ওর এখনো হয়নি।
সম্রাটের কথাগুলি যে তার কাছে কত মূল্যবান সেটা বোঝাবার জন্য দ্য বুসে চোখ বুজে মাথাটা নুইয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
.
অধ্যায়-২৭
ইতিহাসকারদের কাছ থেকে আমরা শুনেছি, ২৫ অগস্ট সারাটা দিন নেপোলিয়ন অশ্বপৃষ্ঠেই কাটিয়েছে, গোটা অঞ্চল পরিদর্শন করেছে, মার্শালরা যেসব পরিকল্পনা দাখিল করেছে সেগুলি নিয়ে ভেবেছে, সেনাপতিদের জানিয়েছে ব্যক্তিগত নির্দেশ।
২৪ তারিখে শেভার্দিনো দুর্গ দখলের ফলে কলোচা নদী বরাবর রুশবাহিনীর সীমান্তটি বিপর্যস্ত হয়ে গেছে, আর তার কতকাংশকে–বাম ব্যুহটি–পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে। সীমান্তের সেই অংশটি পরিখাবেষ্টিত নয়, আর তার সম্মুখস্থ মাঠটি অনেকটা ভোলা এবং অন্য জায়গার তুলনায় সমতল। কাজেই সামরিক বা সাধারণ যে কোন লোকের কাছেই এটা স্পষ্ট যে ফরাসিরা সেখান দিয়েই আক্রমণ করবে। স্বভাবতই এটা মনে হতে পারে যে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য কোনো বিশেষ বিচার-বিবেচনার দরকার ছিল না, সম্রাট বা তার মার্শালদেরও এ নিয়ে বিশেষভাবে মাথা ঘামাবার দরকার ছিল না, এবং সাধারণ মানুষ নেপোলিয়নকে যে প্রতিভার অধিকারী বলে মনে করে সেরকম কোনো বিশেষ মহৎ গুণের প্রয়োজনও সেখানে ছিল না, অথচ যে ইতিহাসকাররা পরবর্তীকালে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে, যারা সেইসময় নেপোলিয়নকে ঘিরে ছিল, এমন কি নেপোলিয়ন স্বয়ং কিন্তু অন্যরকমটাই মনে করেছিল।
সমতলভূমিতে ঘোড়া চালাতে চালাতে নেপোলিয়ন গম্ভীর নীরবতার সঙ্গে অঞ্চলটা ঘুরে দেখল, কখনো ঘাড় নাড়ল সম্মতিসূচকভাবে, কখনো বা সন্দিগ্ধচিত্তে, এবং যে গুরুগম্ভীর চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে সে তার সিদ্ধান্তে উপনীত হল সে সম্পর্কে সঙ্গী সেনাপতিদের কিছুমাত্র না জানিয়ে তাদের শুনিয়ে দিল তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলিকে হুকুমের আকারে।
শেভার্দিনো দুর্গের বিপরীত দিককার অঞ্চলটা ভালো করে পরীক্ষা করে নেপোলিয়ন নীরবে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর কয়েকটা জায়গা দেখিয়ে রুশদের পরিখা খননে বাধা দেবার জন্য আগামীকালের মধ্যে সেখানে দুটো কামানশ্রেণী এবং তার সঙ্গে সমান্তরাল রেখায় গোলন্দাজ বাহিনী সন্নিবেশের নির্দেশ দিল।
এইসব নির্দেশাদি দিয়ে সে শিবিরে ফিরে গেল এবং তার তিলিপি অনুসারেই যুদ্ধের বিলি-ব্যবস্থার বিবরণ লেখা হল।
যে বিলি-ব্যবস্থার বিবরণ ফরাসি ইতিহাসকাররা লিখেছে মহা উৎসাহে এবং অন্য ইতিহাসকাররা লিখেছে গভীর শ্রদ্ধায় তা হল :
প্রিন্স দ্য এককমুহল কর্তৃক অধিকৃত প্রান্তরে রাতের মধ্যেই যে দুটি কামানশ্রেণী স্থাপিত হয়েছে, প্রত্যুষেই বিপরীত দিকে অবস্থিত শত্রুপক্ষের দুটি কামানশ্রেণীর উপর তা থেকে গোলা বর্ষণ করা হবে।
ঠিক একই সঙ্গে গোলন্দাজ বাহিনীর প্রথম কোরের কমান্ডার জেনারেল পারনেত্তি কাম্পা ডিভিশনের ত্রিশটি কামান এবং দেসায়িক ও ফ্রিয়াৎ ডিভিশনের হাল্কা কামান নিয়ে অগ্রসর হবে, গোলাবর্ষণ করবে এবং নিম্নলিখিত শক্তি নিয়ে শত্রুপক্ষের কামানের গোলাবর্ষণকে স্তব্ধ করে দেবে :
২৪ কামান-গোলন্দাজ রক্ষী বাহিনীর
৩০ কামান-কাম্পা ডিভিশনের
ও ৮ কামান-ফ্রিয়াৎ ও দেসায়িক ডিভিশনের
মোট ৬২ কামান।
গোলন্দাজ বাহিনীর তৃতীয় কোরের কমান্ডার জেনারেল ফুচে তৃতীয় ও অষ্টম কোরের মোট ষোলটি হাল্কা কামানকে রাখবে সেই কামানশ্রেণীর পাশে যা থেকে বাঁ দিকের পরিখা লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করা হবে এবং যার বিরুদ্ধে তাক করে সাজানো রয়েছে চল্লিশটা কামান।
গোলন্দাজ রক্ষীবাহিনীর হাল্কা কামানগুলি নিয়ে যে কোনো একটি পরিখা-খননকারী দলের বিরুদ্ধে প্রথম হুকুমের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসর হবার জন্য জেনারেল সোরবিয়েরকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
গোলাবর্ষণ চলাকালে প্রিন্স পোনিয়াতোক্সি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে গ্রামে পৌঁছে শত্রুর সেনাসমাবেশের মুখটা ঘুরিয়ে দেবে।
প্রথম রক্ষা-ব্যবস্থাকে দখল করে নেবার জন্য জেনারেল কাম্পা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হবে।
এইভাবে অগ্রসর হবার পরে শত্রুর গতিবিধি অনুসারে নতুন নির্দেশ দেওয়া হবে।
ডানদিককার কামানের গর্জন শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বাম ব্যূহের উপর গোলাবর্ষণ শুরু হবে। দক্ষিণ ব্যূহের উপর আক্রমণ শুরু হতে দেখলেই মোরাদ-এর ডিভিশন এবং উপজার ডিভিশনের (মুরাত-এর কথা বলা হচ্ছে) নিপুণ গোলন্দাজরা প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে দেবে।
উপরাজা গ্রামটি (বরদিনো) দখল করবে এবং তিনটি সেতুপথে নদী পেরিয়ে মোরাদ ও জেরার্দ ডিভিশনের সমান উচ্চতায় উঠে যাবে, তার নেতৃত্বে ঐ দুটি ডিভিশনওদুর্গটিকে আক্রমণ করবে এবং অবশিষ্ট সেনাদলের সঙ্গে একসারিতে এসে যোগ দেবে।
এসব কিছুই করতে হবে সেনাদলকে যতদূর সম্ভব রিজার্ভে রেখে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে।
