বলল, সে ক্ষতি আমি মস্কোতে পূরণ করব। ঠিক আছে, পরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে। তারপর দ্য বুসেকে ডাকল। উপঢৌকন সাজানো শেষ করে সেগুলোকে চেয়ারের উপর রেখে একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
দ্য বুসে নিচু হয়ে অভিবাদন জানাল। সেধরনের দরবারি অভিবাদন একমাত্র বুরবনদের আমলের পুরনো কর্মচারীরাই করতে জানে। সে এগিয়ে এসে সম্রাটের হাতে একটা খাম দিল।
নেপোলিয়ন খুশি হয়ে তার কানটা টেনে দিল।
তুমি খুব তাড়াতাড়ি এসেছ। আমি খুব খুশি হয়েছি। আচ্ছা, প্যারিস কি বলছে? হঠাৎ তার মুখের কঠোরতা সরে গিয়ে দেখা দিল প্রসন্নতা।
দ্য বুসে জবাব দিল, স্যার, আপনার অনুপস্থিতিতে সারা প্যারিস দুঃখিত।
কথাটা মিথ্যা হলেও দ্য বুসে যে এই কথাই বলবে নেপোলিয়ন তা জানত, তবু তার মুখ থেকে কথাটা শুনে সে খুশি হল, আবার তার কান ছুঁয়ে তাকে সম্মানিত করল।
বলল, তোমাকে এতদূর টেনে এনেছি বলে আমি খুবই দুঃখিত।
দ্য বুসে উত্তর দিল, আমি তো আশা করেছিলাম মস্কোর ফটকেই আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
নেপোলিয়ন হাসল, অন্যমনস্কভাবে মাথাটা তুলে ডাইনে তাকাল। জনৈক এড-ডি-কং এগিয়ে এসে একটা সোনার নস্যদানি তার হাতে দিল।
খোলা নস্যর কৌটোটা নাকের কাছে ধরে বলল, হ্যাঁ, তোমার ভাগ্য ভালো যে সেটাই ঘটছে। তুমি তো ভ্রমণ করতে ভালোবাস, আর তিনদিনের মধ্যেই মস্কো দেখতে পাবে। এশিয়ার সেই রাজধানীটা দেখার আশা তুমি নিশ্চয়ই করনি। তোমার যাত্রাপথটাও সুখেই কাটবে।
ভ্রমণ-অনুরাগের এই গুণগান শুনে (যদিও সে নিজে বিষয়টা সম্পর্কে ঠিক অবহিত ছিল না) দ্য বুসে সকৃতজ্ঞচিত্তে মাথা নোয়াল।
কাপড় দিয়ে ঢাকা কোনো জিনিসের দিকে পারিষদরা সকলেই তাকিয়ে আছে দেখে নেপোলিয়ন শুধাল, আরে, এটা কি?
দ্য বুসে দরবারি কায়দায় অর্ধেকটা ঘুরে কিন্তু সম্রাটের দিকে পিছন না ফিরে দু পা পিছিয়ে গেল এবং কাপড়টা সরিয়ে দিয়ে বলল, সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে ইয়োর ম্যাজেস্টির জন্য কিছু উপঢৌকন।
একখানি প্রতিকৃতি, জেরার্ড কর্তৃক উজ্জ্বল রঙে আঁকা। অস্ট্রিয়ার সম্রাটের কন্যার গর্ভে নেপোলিয়নের যে ছেলে হয়েছে তারই ছবি, যে কারণেই হোক সকলেই ছেলেটিকে রোমের রাজা বলে ডাকে।
মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল সুন্দর ছেলেটি, চোখে সিস্টাইন ম্যাডোনার আঁকা খৃস্টের দৃষ্টি, লাঠি ও বল নিয়ে ক্রীড়ারত ভঙ্গিতে তাকে আঁকা হয়েছে। বলটি যেন ভূ-ঘোলক, আর অন্য হাতের লাঠির রাজদণ্ড।
তথাকথিত রোমের রাজা-কে লাঠি দিয়ে পৃথিবীকে বিদ্ধকারী ভঙ্গিমায় এঁকে শিল্পী কি বোঝাতে চেয়েছে সেটা স্পষ্ট না হলেও প্যারিসে যারা যারা ছবিটা দেখেছে তাদের মতো নেপোলিয়নের কাছে ছবির রূপকার্যটি খুবই পরিষ্কার ও মনের মতো বলেই মনে হল।
একটা মনোরম ভঙ্গি করে প্রতিকৃতিটির দিকে আঙুল বাড়িয়ে নেপোলিয়ন বলে উঠল, রোমের রাজা!…প্রশংসনীয়!
ইচ্ছামতো মুখের ভাব বদলাবার সহজাত ইতালিয় ক্ষমতার বলে সে ছবিটার আরো কাছে এগিয়ে গিয়ে মুখে একটা বিষণ্ণ মমতার ভাব ফুটিয়ে তুলল। সে বুঝতে পেরেছে, এই মুহূর্তে সে যা বলবে বা করবে সেটা ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধি লাভ করবে, আর তাই এইমুহূর্তে তার পক্ষে সবচাইতে ভালো হবে রাজকীয় জাকজমকের-যে জাঁকজমক তার সন্তানকে দিয়েছে ভূগোলক নিয়ে খেলা করার শক্তি-পরিবর্তে অতি সহজ, সরল পিতৃসুলভ মমতা দেখানো। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল, কিছুটা এগিয়ে ছবিটার সামনে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তার একটিমাত্র ইঙ্গিতে সকলেই পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, সেখানে রইল শুধু ভাববিহ্বল, মহাপুরুষটি।
কিছুক্ষণ বসে থেকে কিছু না বুঝেই সে ছবির সবচাইতে উজ্জ্বল রংয়ের জায়গাটা ছুঁয়ে উঠে দাঁড়াল, দ্য বুসে ও কর্তব্যরত অফিসারকে ডেকে পাঠাল। প্রতিকৃতিটিকে শিবিরের বাইরে নিয়ে যাবার হুকুম হল, শিবিরের চারপাশে মোতায়েন রক্ষীদল যেন তাদের পূজনীয় সম্রাটের পুত্র ও উত্তরাধিকারী রোমের রাজার দর্শন থেকে বঞ্চিত না হয়।
ম. দ্য বুসের সঙ্গে প্রাতরাশে বসেই তারা শুনতে পেল ওল্ড গার্ডের অফিসার ও সৈনিকরা উচ্ছ্বসিত আনন্দে চিৎকার করতে করতে প্রতিকৃতিটি দেখবার জন্য ছুটে যাচ্ছে।
ভি ভেল এম্পেরিয়র! ভি ভে ল রয় দ্য রোম! ভি ভেল এম্পেরিয়র!
প্রাতরাশের পরে দ্য বুসের উপস্থিতিতেই সে সেনাবাহিনীর প্রতি সেদিনকার হুকুমের তলিখনটি বলতে লাগল।
কোনোকরম সংশোধন ছাড়াই সেকাজটা শেষ করে একবার পড়ে সে বলল, সংক্ষিপ্ত ও উৎসাহবর্ধক! হুকুমটা এইরকম :
সৈন্যগণ, এই যুদ্ধের আশাতেই তোমরা এতদিন ছিলে। তোমাদের উপরেই নির্ভর করছে বিজয়-গৌরব। এ যুদ্ধে আমাদের পক্ষে একান্তভাবে প্রয়োজন, আমাদের যা কিছু দরকার সবই এই যুদ্ধ আমাদের দেবে–আরামদায়ক বাসস্থান এবং দ্রুত দেশে প্রত্যাবর্তন। অস্তারলিজ, ফ্রিডল্যান্ড, ভিতের ও মোলেনঙ্কের যে আচরণ তোমরা করেছ, এখনো তাই করবে। আমাদের দূরতম প্রজন্মও যেন তোমাদের আজকের সাফল্যকে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য তারা যেন বলতে পারে : মস্কোর সম্মুখের মহাযুদ্ধে তিনি ছিলেন।
মস্কোর সম্মুখে! নেপোলিয়ন কথাটা আর একবার উচ্চারণ করল, তারপর ভ্রমণপ্রিয় ম. দ্য বুসেকে অশ্বারোহণে তার সঙ্গী হবার আমন্ত্রণ জানিয়ে সে শিবির থেকে বেরিয়ে গেল।
