অন্ধকার হয়ে এসেছে, তাই পিয়ের বুঝতে পারল না প্রিন্স আন্দ্রুর মুখে কোন ভাব ফুটেছে–ক্রোধের, না মমতার।
নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল, তার পিছু নেবে না চলে যাবে। শেষপর্যন্ত স্থির করল, না। সেটা তার ইচ্ছা নয়। আমি জানি, এটাই আমাদের শেষ দেখা। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে গোর্কির দিকে ঘোড়া চালিয়ে দিল।
চালাঘরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রু একটা কম্বলের উপর শুয়ে পড়ল, কিন্তু ঘুমোতে পারল না।
চোখ বুজল। কল্পনায় একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠল। একটা ছবি নিয়ে আনন্দের সঙ্গে অনেকক্ষণ কাটাল। পিটার্সবুর্গের একটা সন্ধ্যার কথা খুব স্পষ্ট হয়ে মনে পড়ল। প্রাণবন্ত, উত্তেজিত মুখে নাতাশা তাকে বলেছিল, আগের গ্রীষ্মকালে ব্যাঙের ছাতা কুড়তে গিয়ে কেমন করে সে বনের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। এলোমেলোভাবে সে বলছিল জঙ্গলের গভীরতার কথা তার অনুভূতির কথা, একজন মৌমাছি-পালকের সঙ্গে দেখা হবার কথা, আর সেসব বলার ফাঁকে ফাঁকে বারবারই বলেছিল : না, আমি পারছি না, ঠিক মতো বলা হচ্ছে না, না, তুমি ঠিক বুঝছ না। নিজের কথায় নাতাশা নিজেই খুশি হতে পারেনিঃ সে বুঝতে পারছিল, সেদিন তার মনে যে আবেগময় কাব্যভাব জেগেছিল সেটাকে সে ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারছে না। উত্তেজনায় লাল হয়ে সে বলেছিল, না, আমি ঠিকমতো বলতে পারছি না।…বুড়ো মানুষটি এত ভালো ছিল, আর জঙ্গলের ভিতরটা ছিল এত অন্ধকার…না, ঠিক হচ্ছে না। প্রিন্স আন্দ্রুর মুখে সেদিনকার মতোই খুশির হাসি দেখা দিল। ভাবল, আমি তাকে ঠিক বুঝেছিলাম। শুধু যে বুঝেছিলাম তাই নয়, তার ভিতরকার সেই আত্মিক শক্তি, সেই আন্তরিকতা, আত্মার সেই সংকোচবিহীনতা-তার যে আত্মা দেহের বন্ধনে আবদ্ধ–সেই আত্মাকেই আমি ভালোবেসেছিলাম…কত যে ভালোবেসেছিলাম আর কত যে সুখী হয়েছিলাম…হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল কেমন করে একদিন সে ভালোবাসার অবসান হল। সেই লোকটার তো সেরকম কিছুর প্রয়োজন ছিল না। সে জিনিস সে তো দেখেওনি, বোঝেওনি। সে লোকটা তার মধ্যে দেখেছিল শুধু একটি সুন্দরী, তাজা যুবতাঁকে, কিন্তু সে নিজে তো তার সঙ্গে নিজের ভাগ্যকে জড়াতে চায়নি। আর আমি…অথচ সেই লোকটা আজও বেঁচে আছে, ফুর্তিতে আছে!
যেন আগুনের ছ্যাঁকা লেগেছে এমনিভাবে লাফিয়ে উঠে প্রিন্স আন্দ্রু চালাঘরটার সামনে পায়চারি করতে শুরু করল।
.
অধ্যায়-২৬
বরদিনো যুদ্ধের প্রাক্কালে ২৫শে আগস্ট তারিখে ফরাসি সম্রাটের রাজপ্রাসাদের প্রিফেক্ট ম. দ্য বুসে কর্নেল ফেবিয়েরকে সঙ্গে নিয়ে ভালুভো ঘাঁটিতে নেপোলিয়নের কাছে এসে হাজির হল, প্রথম জন এল প্যারিস থেকে, আর দ্বিতীয়জন মাদ্রিদ থেকে।
দরবারের পোশাকে সজ্জিত ম. দ্য বুসে হুকুম দিল, সম্রাটের জন্য যে বাক্সটা আনা হয়েছে সেটা তার সামনে হাজির করা হোক। নেপোলিয়নের শিবিরের প্রথম ঘরটাতে ঢুকে নেপোলিয়নের এড-ডি-কংদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে বাক্সটা খুলতে লাগল।
ফেবিয়ের শিবিরে না ঢুকে ফটকে দাঁড়িয়েই পরিচিত সেনাপতিদের সঙ্গে আলাপ করতে লাগল।
সম্রাট নেপোলিয়ন তখনো তার শোবার ঘরেই বেশবাস নিয়ে ব্যস্ত। ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গে কখনো পিঠ, কখনো লোমশ ফোলা বুকটা এগিয়ে দিচ্ছে, আর খানসামা তাকে বুরুশ করছে। আর একটি খানসামা একটা বোতলের মুখে আঙুল রেখে সম্রাটের সারা শরীরে ইউ-ডি-কলোন ছিটিয়ে দিচ্ছে, তার মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন একমাত্র সেই জানে ম্রাটের শরীরের কোথায় কতটা ইউ-ডি-কলোন ছিটাতে হবে। নেপোলিয়নের মাথার ছোট ছোট চুলগুলি ভেজা, কপালের উপর চেপে বসানো, ফোলা-ফোলা হলদেটে মুখে দৈহিক তৃপ্তির আমেজ। খানসামাকে বলছে, চালাও, আরো জোরে বুরুশ চালাও! যে এড-ডি-কংটি গতকালের যুদ্ধে বন্দিদের সংখ্যা জানাতে ঘরে ঢুকেছিল, ফিরে যাওয়ার নির্দেশের অপেক্ষায় সে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ভুরু কুঁচকে নেপোলিয়ন তার দিকে তাকাল।
এড-ডি-কংয়ের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলল, কেউ বন্দি হয়নি! ওদের নির্মূল করতে ওরা আমাদের বাধ্য করছে। রুশ সৈন্যদের কপালই মন্দ।…জোরে চালাও…আরো জোরে। পিঠটা কুঁজো করে মোটা গর্দান এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল।
তারপর এড-ডি-কংয়ের দিকে মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে। মঁসিয় দ্য বুসেকে আসতে বল। ফেবিয়েরকেও।
ঠিক আছে স্যার, এড-ডি-কং শিবিরের দরজা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। দুই খানসামা দ্রুত হাতে হিজ ম্যাজেস্ট্রির প্রসাধন শেষ করল, রক্ষীবাহিনীর নীল ইউনিফর্ম পরে সম্রাট দ্রুতপায়ে অভ্যর্থনাকক্ষে ঢুকল।
সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে যে উপহার নিয়ে এসেছে সেগুলিকে দরজার ঠিক সামনে দুটো চেয়ারে সাজিয়ে রাখার কাজেই তখন দ্য বুসে খুব ব্যস্ত। পোশাক-পরা শেষ করে নেপোলিয়ন এত অপ্রত্যাশিত দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এসেছে যে দ্য বুসে তখনো উপহারগুলি সাজিয়ে শেষ করতে পারেনি।
তাদের কাজকর্ম দেখেই নেপোলিয়ন বুঝতে পারল তারা কি করছে এবং সেকাজ তখনো শেষ হয়নি। তাকে অবাক করে দিয়ে নিজেরা যাকে খুশি হতে পারে সেই সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করতে নেপোলিয়নের মন চাইল না, কাজেই দ্য বুসেকে না দেখতে পাবার ভান করে সে ফেবিয়েরকে কাছে ডাকল এবং ইওরোপের অপর প্রান্তে সালামাংকার যুদ্ধে ফরাসি সেনাদলের বীরত্ব ও আন্তরিকতার কাহিনী শুনতে লাগল। নিঃশব্দে ভুরু কুঁচকে। ফেবিয়ারের মনে একটিই চিন্তা-ম্রাটের উপযুক্ত হওয়া, তার মনে একটিই ভয়-তাকে খুশি করতে না পারা। সে যুদ্ধের ফল হয়েছে শোচনীয়। ফেবিয়ারের বিবরণ শুনতে শুনতে নেপোলিয়ন এমন সব মন্তব্য করতে লাগল যেন তার অনুপস্থিতিতে ব্যাপারটা যে অন্যরকম হতে পারে না তা সে জানত।
