মোঝায়ে পাহাড়ে এবং সারাটাদিন ধরে যে প্রশ্নটা পিয়েরকে বিব্রত করে তুলেছিল এবার যেন সেটা তার কাছে বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, প্রশ্নটা মীমাংসাও সে খুঁজে পেয়েছে। এই যুদ্ধের এবং আসন্ন সংঘর্ষের তাৎপর্য ও গুরুত্ব এবার সে উপলব্ধি করতে পেরেছে। সারাদিন সে যা কিছু দেখেছে, যেতে যেতে নানা জনের মুখে যে অর্থপূর্ণ কঠিন ভাব দেখেছে, সেসব কিছুই একটা নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। তার দেখা এইসব লোকদের মধ্যে দেশপ্রেমের যে সুপ্ত উত্তাপ (পদার্থবিদ্যার ভাষায়) রয়েছে তার সন্ধান সে পেয়েছে, আর তার ফলেই বুঝতে পেরেছে কেন তারা সকলেই শান্ত অথচ সহজভাবে মৃত্যুকে বরণ করতে প্রস্তুত হতে পেরেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, কাউকে বন্দি করব না। শুধু তাহলেই গোটা যুদ্ধের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে, তার নিষ্ঠুরতাও হ্রাস পাবে। এখন যা চলছে সেটা তো যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা–আর সেটাই জঘন্য। আমরা মহত্ত্ব ও অনুরূপ গুণাবলী নিয়ে খেলা করি। এই মহত্ত্ব ও স্পর্শকাতরতা হচ্ছে সেই মহিলাটির মহত্ত্ব ও স্পর্শকাতরতার মতো যিনি একটি গো-বসের মাংস যখন সজিসহকারে পরিবেশন করা হয় তখন বেশ রসিয়ে রসিয়ে খান। তারা তো অনেক কথাই বলে-যুদ্ধের রীতিনীতি, বীরত্ব, সন্ধির পতাকা, দুর্ভাগাদের প্রতি করুণা, কত কি। সবই তো অর্থহীন। এই বীরত্ব ও সন্ধির পতাকা, দুর্ভাগাদের প্রতি করুণা, কত কি। সবই তো অর্থহীন। এই বীরত্ব, সন্ধির পতাকা আমি দেখেছি ১৮০৫-এ তারা আমাদের ধোকা দিয়েছে, আমরা তাদের ধোকা দিয়েছি। তারা অন্য লোকের ঘরবাড়ি লুঠ করে, নকল টাকার নোট ছড়ায়, আর সবচাইতে যেটা খারাপ আমার সন্তান ও পিতাকে হত্যা করে, এবং তারপরে যুদ্ধের রীতিনীতি ও শত্রুর প্রতি উদারতার বুলি আওড়ায়! কাউকে বন্দি করো না, মার এবং মর। আমার মতোই দুঃখ-যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যারা এই সিদ্ধান্তে এসেছে…
হঠাৎ প্রিন্স আন্দ্রুর গলা আটকে গেল। নিঃশব্দে বারকয়েক পায়চারি করল, তার চোখ দুটি চকচক করছে, ঠোঁট কাঁপছে।
যুদ্ধে যদি এই উদারতার ব্যাপারটা না থাকত, তাহলে একমাত্র তখনই আমরা যুদ্ধে যেতাম যখন আজকের মতো বুঝতাম যে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাওয়াটাও অবশ্য কর্তব্য। তাহলে পল আইভানভিচ মাইকেল আইভানভিচকে দুঃখ দিয়েছে বলেই একটা যুদ্ধ বেধে যেত না। আর আজকের মতোই যুদ্ধ হলে সেটা যুদ্ধই হত! তখন সৈন্যদের সংকল্প হত সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেক্ষেত্রে ওয়েস্টফেলিয়া ও হেসিয়ার যেসব মানুষদের নেপোলিয়ন আজ রণক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তারা তার পিছু পিছু রাশিয়াতে ঢুকত না, আর আমরাও কিছু না জেনেশুনেই অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়াতে যুদ্ধ করতে যেতাম না। যুদ্ধ একটা ভদ্রতার ব্যাপার নয়, যুদ্ধ জীবনের এক ভয়ংকর সত্য, আর সেটাই আমাদের বুঝতে হবে, যুদ্ধ নিয়ে ছেলেখেলা করা চলবে না। কঠোরভাবে, গুরুত্বের সঙ্গে এই ভয়ংকর অনিবার্যতাকে স্বীকার করে নিতে হবে। আসল ব্যাপারটা সেখানেই, মিথ্যার মোহকে ছিঁড়ে ফেল, যুদ্ধটা যুদ্ধই হোক, খেলা নয়। এখন যা চলছে তা তো যুদ্ধ নয়, যেন অলস ও বাকসর্বদের একটা মজার খেলামাত্র। সামরিক চাকরি অত্যন্ত সম্মানজনক পদ।
কিন্তু যুদ্ধ কিযুদ্ধে সাফল্যলাভের জন্য কি দরকার? সামরিক লোকদের কাজ কি? যুদ্ধের লক্ষ্যই তো হত্যা, যুদ্ধের পথ হচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্বাসঘাতকতা, একটা দেশের অধিবাসীদের ধ্বংস, সেনাদলের খাদ্যসংস্থানের জন্য লুট ও চুরি, জালিয়াতি ও মিথ্যাচরণই তো সামরিক কৌশলের অপর নাম। সামরিক লোকদের স্বভাব হচ্ছে স্বাধীনতার অভাব, অর্থাৎ শৃঙ্খলা, আলস্য, অজ্ঞতা, নিষ্ঠুরতা, লাম্পট্য ও মাতলামি। আর এসব সত্ত্বেও তারাই সর্বজনশ্রদ্ধেয় উচ্চতম শ্ৰেণী। একমাত্র চীনারা ছাড়া আর সব রাজারাই সামরিক পোশাক পরেন, যে লোক যত বেশি মানুষ মারতে পারে সেই পায় সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
কাল যেমন আমরা মুখোমুখি হব, তেমনি তারাও পরস্পরের মুখোমুখি হয় একে অন্যকে খুন করতে, তারা হাজার হাজার লোককে খুন করে, পঙ্গু করে, তারপর এত এত মানুষ (এমন কি তারা সংখ্যাটাকে বাড়িয়ে বলে) খুন করার জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যত বেশি মানুষ তারা খুন করবে ততই তাদের কৃতিত্ব বাড়বে এটা ধরে নিয়েই একটা জয়ের কথা ঘোষণা করা হয়। মাথার উপর থেকে ঈশ্বর তাদের কোন চেখে দেখেন বা তাদের কথা শোনেন? প্রিন্স আন্দ্রুর কণ্ঠস্বর আরো তীক্ষ্ণ ও কর্কশ হয়ে উঠল। হায় বন্ধু, ইদানীং বেঁচে থাকাটাই আমার পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বুঝতে পারছি যে আমি বড় বেশি বুঝতে শুরু করেছি। পাপ-পুণ্যের জ্ঞান-বৃক্ষের ফল খাওয়া মানুষের পোষায় না।…যাই হোক, আর বেশি দিন নয়!
তারপরেই হঠাৎ বলে উঠল, যাই হোক, তোমার ঘুম পাচ্ছে, আমারও ঘুমের সময় হয়েছে। গোর্কিতে ফিরে যাও।
ভয়ার্ত, সহৃদয় চোখে তার দিকে তাকিয়ে পিয়ের বলল, না, না।
যাও, যাও। যুদ্ধের আগে ঘুমটা ভালো হওয়া চাই, প্রিন্স আন্দ্রুর আবার বলল।
তাড়াতাড়ি পিয়েরের কাছে গিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে চুমো খেল।
চেঁচিয়ে বলল, বিদায়, কেটে পড়! আবার আমাদের দেখা হবে কি হবে না…মুখটা ঘুরিয়ে দ্রুত পায়ে সে চালাঘরে ঢুকে পড়ল।
