চমকে কাউন্টেস বলল, কি? কিন্তু পরক্ষণেই মেয়ের চোখেমুখে দুষ্টুমির ঝিলিক দেখে সে সজোরে আঙুল নেড়ে ও মাথা নেড়ে তাকে ভয় দেখাল।
আলোচনা থেমে গেল ।
মামণি! আমরা কি কি মেঠাই পাব? নাতাশার গলায় আরো বেশি দৃঢ়তা ও স্থির সিদ্ধান্তের ভাব ফুটে উঠল ।
কাউন্টেস চোখ রাঙাতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা মোটা আঙুল নাড়িয়ে ভয় দেখিয়ে ডাকল, কসাক!
এই দুষ্টুমিকে তারা কীভাবে নেবে ঠিক বুঝতে না পেরে অধিকাংশ অতিথি বড়দের দিকে তাকাল।
তোমার সাবধান হওয়া উচিত! কাউন্টেস বলল ।
মামণি! আমরা কী মেঠাই পাব? নাতাশা আবার চেঁচিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসির সঙ্গে বলল; সে জানে তার। এই দুষ্টুমিকে সকলে ভালোভাবেই নেবে।
সোনিয়া ও মোটাসোটা ছোট্ট পেতয়া হেসে গড়াগড়ি যেতে লাগল।
নাতাশা ফিসফিস করে ছোট ভাই ও পিয়েরকে বলল, দেখলে তো! আমি ঠিক চেয়েছি।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, আইস-পুডিং আছে, কিন্তু তুমি একটুও পাবে না।
নাতাশা বুঝল ভয় পাবার কিছু নেই; কাজেই মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকেও সে ভয় পেল না।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা! কেমন আইস-পুডিং? আইসক্রিম আমি পছন্দ করি না।
ক্যারট-আইস।
না, কী রকম তাই বল? কী রকম? আমি জানতে চাই! নাতাশা প্রায় চিৎকার শুরু করল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ও কাউন্টেস হো-হো করে হেসে উঠল; অতিথিরা সকলেই সে হাসিতে যোগ দিল। তারা হাসল মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার কথা শুনে নয়, যে ছোট মেয়েটি মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহার করতে পারল তার অবিশ্বাস্য সাহস ও বুদ্ধি দেখে।
– নাতাশাকে যখন বলা হলো যে পাইনঅ্যাপল-আইস আছে তখন সে থামল। আইসক্রিমের আগে সকলকে শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হলো। আবার ব্যান্ড বেজে উঠল, কাউন্ট ও কাউন্টেস চুমো খেল, অতিথিরা তাদের আসন ছেড়ে কাউন্টেসকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে গেল, এবং টেবিলের দুই পাশ থেকে কাউন্টের সঙ্গে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ও পরস্পরের সঙ্গে গ্লাসঠোকাঠুকি করতে লাগল। আবার শুরু হলো পরিচারকদের ছুটাছুটি, চেয়ারের খসখস শব্দ, আর ঠিক যেভাবে পর পর সকলে খাবার ঘরে ঢুকেছিল ঠিক সেইভাবে মুখগুলিকে আরো লাল করে নিয়ে বসবার ঘরে ও কাউন্টের পড়ার ঘরে ফিরে গেল ।
*
অধ্যায়-২০
তাসের টেবিল পাতা হলো, বোস্টন খেলার জন্য তাস সাজানো হলো, কাউন্টের অতিথিরা সব বসে গেল, কতক দুটো বসবার ঘরে, কতক ভিতরের ঘরে, কতক বা লাইব্রেরিতে।
কাউন্ট নিজের তাসগুলো পাখার মতো করে হাতে ধরে আহারান্তিক ঘুমকে অনেক কষ্টে দুচোখ থেকে তাড়িয়ে অনবরত হাসছে। কাউন্টেসের তাড়নায় ছোটরা বাদ্যযন্ত্রের কাছে ভিড় করে দাঁড়াল। সকলের অনুরোধে জুলি প্রথম বাজাল। কিছুক্ষণ বীণা বাজার পরে সকলে মিলে নাতাশা ও নিকলাসকে অনুরোধ করল গান গাইতে; গানের ব্যাপারে দুজনেরই সুনাম আছে।
আমরা কি গাইব? নাতাশা বলল।
ঝর্নাটা গাও, নিকলাস প্রস্তাব করল।
বেশ, তাহলে তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও। বরিস, এখানে এস, নাতাশা বলল। কিন্তু সোনিয়া কোথায়?
চারদিকে তাকিয়ে বন্ধুকে দেখতে না পেয়ে নাতাশা তাকে খুঁজতে বেরিয়ে গেল।
সোনিয়ার ঘরে গিয়ে তাকে পেল না; নার্সারিতে গেল, সেখানেও নেই। নাতাশা ভাবল, সে নিশ্চয় দালানের সিন্দুকের উপর আছে; সেটাই রস্ত পরিবারের ছোট মেয়েদের গোঁসা-ঘর। সত্যি সত্যি সেখানেই সোনিয়াকে পাওয়া গেল। সিন্দুকের উপর নার্সের নোংরা পালকের বিছানায় সে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, আঙুল দিয়ে মুখ ঢেকে এমনভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদছে যে তার কাঁধ অবধি কাঁপছে। তা দেখে নাতাশার ঝলমলে মুখটা হঠাৎ বদলে গেল : চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল, গলা দিয়ে কেমন একটা কাঁপুনি নামতে লাগল, আর মুখের কোণ দুটো ঝুলে পড়ল।
সোনিয়া! কী হলো?…ব্যাপার কী?…ও…ও…ও…! নাতাশার বড় মুখখানি হা হয়ে গেল, তাকে বেশ কুৎসিত দেখাতে লাগল, একটা ছোট মেয়ের মতো সেও কাঁদতে লাগল; অথচ সোনিয়ার কান্না ছাড়া তার কাঁদবার আর কোনো কারণই নেই। কথা বলার জন্য সোনিয়া মাথা তুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না, মুখটা আরো বেশি করে বিছানায় গুঁজে দিল। নীল ডোরা-টানা পালকের বিছানায় বসে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে নাতাশা কাঁদতে লাগল। অনেক চেষ্টা করে সোনিয়া উঠে বসল; চোখের পানি মুছে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল, এক সপ্তাহের মধ্যে নিকলাস চলে যাচ্ছে, তার…কাগজপত্র… এসে গেছে…সেই আমাকে বলেছে…কিন্তু তাহলেও আমার কাঁদা উচিত নয়, এই বলে হাতের কাগজটা তুলে দেখাল-তাতে নিকলাসের লেখা একটা কবিতা, তাহলেও আমার কাঁদা উচিত নয়, কিন্তু তুমি বুঝবে না…কেউ বুঝবে না…তার হৃদয় কত বড়!
আবার সে কাঁদতে শুরু করল। কারণ নিকলাসের হৃদয় কত মহৎ।
গায়ে একটু জোর পেয়ে সে আরো বলতে লাগল, তোমার কপাল কত ভালো…আমি ঈর্ষা করছি না…আমি তোমাকে ভালোবাসি, বরিসকেও, সেও কত ভালো…তোমাদের পথে কোনো বাধাই নেই…কিন্তু নিকলাস আমার সম্পর্কে ভাই…তাই এ অবস্থায়…স্বয়ং মেট্রোপলিটন (রাশিয়ার গির্জার ব্যবস্থায় সম্পর্কিত ভাই-বোনের বিয়ের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়)…আবার তাহলেও হবে না। তাছাড়া, ভেরা যদি মামণিক (সোনিয়া কাউন্টেসকে মা বলেই মনে করে এবং মা বলেই ডাকে) বলে দেয় যে আমি নিকলাসের জীবনটাকেই নষ্ট করে দিচ্ছি, আমি হৃদয়হীন, অকৃতজ্ঞ, অথচ আসলে…ঈশ্বর সাক্ষী, সে একটা ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল, আমি তাকে কত ভালোবাসি, তোমাদের সব্বাইকে ভালোবাসি, শুধু ভেরা…কিন্তু কিসের জন্য? আমি তার কি করেছি? তোমার কাছে আমি এতদূর কৃতজ্ঞ যে আমি স্বেচ্ছায় সবকিছু ত্যাগ করতে পারি, শুধু আমার তো কিছুই নেই…
