তাহলে কিসের উপর নির্ভর করে?
তিমোখিনকে দেখিয়ে সে বলল, আমার মধ্যে, ওর মধ্যে এবং প্রতিটি সৈন্যের মধ্যে যে অনুভূতি কাজ করে তার উপর।
প্রিন্স আন্দ্রু তিমোখিনের দিকে তাকাল, সভয়ে ও একান্ত বিহ্বলতায় সে তার কমান্ডারের দিকে তাকাল। প্রিন্স আন্দ্রু এতক্ষণ ছিল সংযত, স্বল্পবাক, এবার সে উত্তেজিত হয়ে উঠল। সহসা যে চিন্তার স্রোত তার মনে জেগেছে তাকে প্রকাশ না করে সে পারল না।
যুদ্ধ জয়ের দৃঢ় সংকল্প যারা গ্রহণ করে তারাই যুদ্ধ জয় করে। অস্তারলিজের যুদ্ধে কেন আমাদের হার হল? ফ্রান্সের ক্ষয়-ক্ষতি আমাদের প্রায় সমানই হয়েছিল, কিন্তু গোড়া থেকেই আমরা বলে আসছিলাম যে আমরা হারতে বসেছি, আর সেই হারই আমাদের হল। আর সেকথা আমরা বলেছিলাম কারণ সেখানে যুদ্ধ করবার মতো কিছুই আমাদের ছিল না, যত শীঘ্র সম্ভব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চলে আসতেই আমরা চেয়েছিলাম। আমরা হেরে গেছি, অতএব ছুটে পালাও, আমরা ছুটে পালিয়েছি। সন্ধ্যা পর্যন্ত যদি সেকথা আমরা না বলতাম, তাহলে কী না ঘটতে পারত তা ঈশ্বর জানেন। কিন্তু কাল আমরা সেকথা বলব না। তোমরা আমাদের ব্যুহ রচনার কথা বলছ, বলছ যে বাম ব্যুহ দুর্বল, আর দক্ষিণ ব্যুহ বড় বেশি প্রসারিত, সেসবই বাজে কথা, সেরকম কিছুই ঘটেনি। কিন্তু কাল আমাদের কপালে কি আছে? আছে লক্ষ লক্ষ বিচিত্র সম্ভাবনা যেটা নির্ধারিত হবে আমাদের সৈন্য বা তাদের সৈন্যরা পালাবে কি পালাবে না তার দ্বারা, এ-লোক বা সে লোকের মৃত্যু হবে কি না তার দ্বারা, কিন্তু বর্তমানে যা কিছু করা হচ্ছে সবই তো ছেলেখেলা। আসল কথা হল, যাদের নিয়ে তোমরা সবকিছু ঘুরে দেখে এলে তারা আমাদের কাজের সহায়ক না হয়ে বরং বিঘ্নের সৃষ্টি করছে। তারা সকলেই নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত।
এই সংকট-মুহূর্তেও? পিয়ের অনুযোগের সুরে বলল।
এই সংকট-মুহূর্তেও! প্রিন্স আন্দ্রু কথাটার পুনরাবৃত্তি করল। তাদের কাছে এই মুহূর্তটা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাভূত করে একটা বাড়তি ক্রুশ বা ফিতে পাবার সুযোগ এনে দিয়েছে মাত্র। আর আমার কাছে আগামীকালের অর্থ হল : এক লক্ষ্য সৈন্যের রুশ বাহিনী এবং এক লক্ষ সৈন্যের ফরাসি বাহিনী রণক্ষেত্রে পরস্পরের মুখোমুখি হবে, দুই লক্ষ সৈন্য যুদ্ধ করবে, এবং যে পক্ষ ন্যূনতম ঝুঁকি নিয়ে অধিকতর তীব্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করবে সেই জিতবে। আর তুমি যদি চাও তো আমি বলছি, যাই ঘটুক না কেন, উপরওয়ালারা যতই ভণ্ডুল করুক না কেন, আগামীকালের যুদ্ধে আমরা জিতবই। যাই ঘটুক না কেন, আগামীকাল আমরা। জিতবই!
তিমোখিন বলে উঠল, ঠিক বলেছেন ইয়োর এক্সেলেন্সি! এটাই সত্য কথা, খাঁটি কথা। আজকের দিনে কে দূরে সরে থাকবে? বিশ্বাস করুন, আমার ব্যাটেলিয়নের সৈন্যরা আজ ভদকা খাবে না। তারা বলছে, ভদকা খাবার দিন আজ নয়!
সকলেই চুপ। অফিসাররা উঠে দাঁড়াল। অ্যাডজুটান্টকে চূড়ান্ত নির্দেশ জানিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুও তাদের সঙ্গে চালাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারা চলে গেলে পিয়ের প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে এগিয়ে গেল, তার সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে যাবে এমন সময় অদূরে তিনটে ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ তাদের কানে এল, সেদিকে তাকিয়ে প্রিন্স জনৈক কসাকসহ ওলযোগেন ও ক্লজউইজকে চিনতে পারল। পাশাপাশি ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে যেতে তারা নিজেদের মধ্যে ফরাসিতে যা বলাবলি করছে আপনা থেকেই প্রিন্স আন্দ্রু তা শুনতে পেল, রণক্ষেত্রকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করতেই হবে, একজন বলল।
অপরজন বলল, ঠিক বলেছ, শত্রুপক্ষকে দুর্বল করে দেওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য, এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্ষয় ক্ষতির কথা ভাবলে চলবে না।
তারা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলে প্রিন্স আন্দ্রু তর্জন করে বলে উঠল, রণক্ষেত্রকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করতে হবে! ওই প্রসারিত করার মধ্যে ছিল আমার বাবা, ছেলে, বোন, বল্ড হিলস। ওর কাছে সবই সমান! এই কথাই তোমাকে বলছিলাম-ওই জার্মান ভদ্রলোকরা কালকের যুদ্ধ জিততে পারবে না, তারা সবকিছু তালগোল পাকিয়ে দেবে, কারণ তাদের জার্মান খুলির মধ্যে তত্ত্ব ছাড়া আর কিছু নেই, আর সে তত্ত্বের মূল্য একটা খালি ডিমের খোলাও নয়, কালকের যুদ্ধে যে বস্তুটির প্রয়োজন, যা তিমোখিনের আছে, তা ওদের হৃদয়ে নেই। ওরা গোটা ইয়োরোপকে তার হাতে সঁপে দিয়ে এখন এসেছে আমাদের শেখাতে। বেড়ে শিক্ষক সব! তার কণ্ঠস্বর আবার কর্কশ হয়ে উঠল।
পিয়ের শুধাল, তাহলে তুমি মনে কর যে কালকের যুদ্ধে আমাদের জয় হবে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্রিন্স আন্দ্রু অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল। তারপর বলতে শুরু করল, আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি একটা কাজ করতাম, কাউকে বন্দি করতাম না। কেন বন্দি করব? তাতে বীরত্ব প্রকাশ হতে পারে! কিন্তু ফরাসিরা আমার বাড়ি ধ্বংস করেছে, ছুটে চলেছে মস্কো ধ্বংস করতে, আমাকে অপমান করেছে, প্রতিটি মুহূর্ত অপমান করে চলেছে। তারা আমার শত্রু। আমার মতে তারা সকলেই অপরাধী। তিমোখিন এবং গোটা সৈন্যদলও তাই মনে করে। তাদের হত্যা করতে হবে। তিলজিটে যাই বলা হোক না কেন, যেহেতু তারা আমার শত্র, তাই তারা আমার বন্ধু হতে পারে না।
চকচকে চোখে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে পিয়ের বলল, ঠিক ঠিক। তোমার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।
