প্রিন্স আন্দ্রু বাধা দিয়ে বলল, তুমি তাহলে আমাদের সৈন্যদের অবস্থানটা ভালোই বুঝতে পেরেছ?
পিয়ের জবাব দিল, হ্যাঁ–আচ্ছা, তুমি কি বলতে চাও? আমি তো সামরিক বিভাগের লোক নই, কাজেই ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝেছি এমন কথা বলতে পারি না, কিন্তু মোটামুটি বুঝে নিয়েছি।
আচ্ছা, তুমি তো তাহলে অন্য অনেকের চাইতে বেশি বুঝেছ, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
বিব্রতভাবে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে পিয়ের বলল, ও! আচ্ছা, কুতুজভের নিয়োগ সম্পর্কে তুমি কি মনে কর?
আমি তো শুধু এই জানি যে তার নিয়োগে আমি খুব খুশি হয়েছি, প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল।
আর বার্কলে দ্য তলি সম্পর্কে তোমার মতামতটাও বল। মস্কোতে তার সম্পর্কে যে কী বলা হচ্ছে তা ঈশ্বরই জানেন…তার সম্পর্কে তুমি কি মনে কর?
অফিসারদের দেখিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, ওদের জিজ্ঞাসা কর।
সপ্রশ্ন হাসির সঙ্গে পিয়ের তিমোখিনের দিকে তাকাল। কর্নেলের দিকে বার বার তাকাতে তাকাতে তিমোখিন ভীরু গলায় বলল, মহামহিমের নিয়োগের ফলে আমরা আবার আলো দেখতে পাচ্ছি।
কী রকম?
দেখুন, কেবল জ্বালানি-কাঠ ও খড়ের ব্যাপারটাই আপনাকে বলছি। আমরা যখন স্বেন্ত সিয়ানি থেকে হটে আসছিলাম, তখন একটা কঞ্চি, বা একটা খড়ের ডাটা, বা কোনো কিছুতে হাত দেবার সাহসই আমাদের ছিল না। কি জানেন, আমরা চলে যাচ্ছিলাম, আর সেসব জিনিসই পড়ছিল তার হাতে (রুশরা শত্রুকে তার বলেই উল্লেখ করে), তাই নয় কি ইয়োর এক্সেলেন্সি তিমোখিন আবার প্রিন্সের দিকে তাকাল। সে সাহসই আমাদের ছিল না। ঐ ধরনের কাজের জন্য আমাদের রেজিমেন্টের দুজন অফিসারকে কোর্ট-মার্শাল করা হয়েছে। কিন্তু মহামহিম যখন সর্বেসর্বা হয়ে এলেন তখন সব ব্যাপারটাই সহজ হয়ে এল। এখন আমরা আলো দেখতে পাচ্ছি..
তাহলে সেটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কেন? এ-প্রশ্নের কি উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে তিমোখিন বিচলিতবে চারদিকে তাকাতে লাগল। সেই একই প্রশ্ন পিয়ের প্রিন্স আন্দ্রুকে করল।
কেন? যে দেশকে আমরা শত্রুর হাতে রেখে যাচ্ছি সেটা যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল। নীতি হিসেবে এটা তো ভালোই, একটা দেশ লুষ্ঠিত হবে এবং সৈন্যরা লুটেরা হয়ে যাবে সেটা তে চলতে দেওয়া যায় না। স্নোলেনস্কেও তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে যেহেতু ফরাসি সেনাবাহিনী ছিল আমাদের চাইতে অনেক বড় তাই তারা হয়তো আমাদের ব্যুহ ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু এই কথাটা তিনি বুঝতে পারেননি, নিজের অজ্ঞাতেই প্রিন্স আন্দ্রুর কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে উঠল, যে এই প্রথম আমরা রাশিয়ার মাটিতে যুদ্ধ করছিলাম, সৈন্যদের মধ্যে সেদিন যে মনোবল গড়ে উঠেছিল তেমনটি আগে কখনো দেখিনি, দুদিন পর্যন্ত ফরাসিদের আমরা রুখে দিয়েছিলাম, আর সেই সাফল্যের ফলে আমাদের শক্তি দশগুণ বেড়ে গিয়েছিল। তিনি পশ্চাদপসরণের হুকুম দিলেন, আর আমাদের সব প্রচেষ্টা, সব ক্ষয়-ক্ষতি বিফলে গেল। আমাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা তিনি ভাবেননি, সাধ্যমতো ভালো করতেই চেষ্টা করেছেন, সবকিছু ভেবেচিন্তেই করেছেন, আর সেই কারণেই তিনি অনুপযুক্ত। এখনো তিনি অনুপযুক্ত, শুধু এই কারণে যে অন্য সব জার্মানের মতোই তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ও সঠিকভাবে পরিকল্পনা করেন। কেমন করে যে বোঝাই?…আচ্ছা, ধর তোমার বাবার একজন জার্মান খানসামা আছে, লোকটি খানসামা হিসেবে চমৎকার, তোমার বাবার সব প্রয়োজন তোমার চাইতেও ভালোভাবে মেটাতে পারে, কাজেই তাকে সে কাজ করতে দেওয়াই সমীচীন। কিন্তু তোমার বাবা যদি মারাত্মক অসুখে পড়েন, তখন খানসামাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে অনভ্যস্ত হাতে তুমিই তোমার বাবার সেবা করবে এবং একজন কুশলী অপরিচিত লোকের চাইতে তাকে বেশি শান্তি দিতে পারবে। বার্কলের ব্যাপারটাও সেইরকম। রাশিয়া যখন সুস্থ ছিল তখন একজন বিদেশী তার সেবা করতে পারে, একজন চমৎকার মন্ত্রীও হতে পারে, কিন্তু যেমুহূর্তে রাশিয়া বিপন্ন হয়ে পড়েছে তখন থেকেই তার প্রয়োজন নিজের লোককে। কিন্তু তোমাদের ক্লাবে তাকে বিশ্বাসঘাতক বানানো হচ্ছে। বিশ্বাসঘাতক বলে তাকে নিন্দা করছে, আর তার একমাত্র ফল হবে পরবর্তীকালে এই মিথ্যা অভিযোগের জন্য লজ্জিত হয়ে তারাই তাকে বানাবে নায়ক অথবা প্রতিভাধর, আর সেটাই হবে আরো বেশি অন্যায়। তিনি একজন সৎ ও অত্যন্ত নিষ্ঠাবান জার্মান।
সকলেই বলে যে তিনি একজন কুশলী সেনাপতি পিয়ের যোগ করল।
প্রিন্স আন্দ্রু বিদ্রুপের সুরে বলল, কুশলী সেনাপতি বলতে কি বোঝায় আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
পিয়ের উত্তরে বলল, কুশলী সেনাপতি কেন, যে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি আগে দেখতে পায়…এবং প্রতিপক্ষের অভিপ্রায়ও আগে থেকে ধরতে পারে।
যেন কথাটা নির্ধারিত সত্য এমনভাবে প্রিন্স আন্দ্রু বলে উঠল, কিন্তু সে তো অসম্ভব।
পিয়ের সবিস্ময়ে তার দিকে তাকাল।
মন্তব্য করল, অথচ তারাই বলে যে যুদ্ধ হচ্ছে দাবা খেলার মতো।
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, ঠিক কথা, কিন্তু একটু তফাৎ আছে। দাবা খেলায় একটা চাল নিয়ে তুমি যতক্ষণ খুশি ভাবতে পার, তোমার সময়ের অভাব থাকে।
না, তাছাড়া, মন্ত্রী সব সময়ই বড়ের চাইতে বেশি শক্তিশালী, আর দুটো বড়ে সব সময়ই একটা বড়ের চাইতে বেশি শক্তিশালী। কিন্তু যুদ্ধের বেলায় একটা ব্যাটেলিয়ন কখনো একটা ডিভিশনের চাইতে বেশি শক্তিশালী, আবার কখনো একটা কোম্পানির চাইতে দুর্বল হতে পারে। সেনাদলের আপেক্ষিক শক্তির কথা আগে থেকে কেউ জানতে পারে না।…বিশ্বাস কর, সবকিছু যদি কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করত, তাহলে আমি সেখানে থেকেই ব্যবস্থা করতাম, কিন্তু তার পরিবর্তে আমি রেজিমেন্টে চলে এসেছি এই ভদ্রলোকদের সঙ্গে কাজ করতে, আ আমি মনে করি যে কালকের যুদ্ধটা নির্ভর করবে আমাদের উপর, সেই সব লোকদের উপর নয়…সৈন্যসমাবেশ, সমরসজ্জা, এমন কি সৈন্য-সংখ্যার উপরেও সাফল্য নির্ভর করে না, ঘাঁটির উপর তো নয়ই।
