এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে জীবনটা সংকীর্ণ, বোঝাস্বরূপ ও প্রয়োজনহীন। সাত বছর আগে অস্তারলিজে যেমন মনে হয়েছিল আজও যুদ্ধের প্রাক্কালে তার তেমনই উত্তেজিত ও বিরক্ত বোধ হচ্ছে।
পরদিনের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ সে পেয়েছে এবং প্রচার করেছে, এখন আর নতুন করে কিছু করার নেই। কিন্তু নিজের চিন্তার হাত থেকে-সরলতম, স্পষ্টতম ও ভয়ংকরতম চিন্তার হাত থেকে তার নিস্তার নেই। সে জানে, এতদিন যত যুদ্ধে সে যোগ দিয়েছে তার মধ্যে কালকের যুদ্ধই হবে সবচাইতে ভয়ংকর, আর জীবনে এই প্রথম সে মৃত্যুর সম্ভাবনার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে–সে সম্ভাবনা যেমন স্পষ্ট ও ভয়ংকর, তেমনই নিশ্চিত। সহসা সারাটা জীবন ম্যাজিক-লণ্ঠনের ছবির মতো তার সামনে একে একে ভেসে উঠতে লাগল। বিশেষ করে জীবনের তিনটি মহৎ দুঃখ তার সামনে বড় হয়ে ফুটে উঠল : একটি নারীর প্রতি ভালোবাসা, বাবার মৃত্যু, আর অর্ধেক রাশিয়ার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ফরাসি আক্রমণ। ভালোবাসা!…ছোট্ট মেয়েটি কী রহস্যময় শক্তিতে একেবারে কানায় কানায় ভরে উঠেছিল! হ্যাঁ, আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম। তাকে নিয়ে ভালোবাসার ও সুখের কত পরিকল্পনাই করেছিলাম! আঃ, আমি কী ছেলেমানুষই ছিলাম! তিক্তকণ্ঠে সে বলে উঠল। হায়রে! এমন এক আদর্শ ভালোবাসার উপর আমি ভরসা করেছিলাম যা আমার একটি বছরের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে আমার প্রতি বিশ্বস্ত রাখবে। উপকথার ভীরু কপোতর মতো আমার বিরহে সে কাঁদবে…কিন্তু আসলে ব্যাপারটা কত সরল…কত সরল আর কত ভয়ংকর।
বাবা যখন বন্ড হিলস গড়ে তুলেছিল তখন সে ভেবেছিল জায়গাটা তার–তার জমি, তার বাতাস, তার চাষীর দল। কিন্তু নেপোলিয়ন এল, আর পথের খড়কুটোর মতো তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল, তার বন্ড হিলস, তার সারাটা জীবন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। প্রিন্সেস মারি বলে, এটা উপরওয়ালার পরীক্ষা। কিন্তু বাবাই যখন রইল না, আর কখনো ফিরে আসবে না, তখন কিসের জন্য এই পরীক্ষা? বাবা তো নেই! তাহলে কার জন্য এই পরীক্ষা? পিতৃভূমি ও মস্কোর ধ্বংস! আর কাল আমি নিহত হব, হয়তো কোনো ফরাসির হাতেও নয়, হয়তো আমাদেরই কোনো সৈনিক আমার কানের পাশ থেকে বন্দুক দাগবে, কাল তো সেই ঘটনাই একটা ঘটেছে, আর পাছে তাদের চোখের সামনে আমি মরে যাই সেই ভয়ে ফরাসিরা এসে হাত-পা ধরে আমাকে একটা গর্তের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। গড়ে উঠবে জীবনের নতুন পরিবেশ, অপরের কাছে সেটা খুবই সহজ ও সাধারণ বলে মনে হবে, অথচ সে সম্পর্কে আমি কিছুই জানব না। আমি তো থাকবই না।
সূর্যকিরণ ঝলসিত বার্চ গাছগুলোর দিকে সে তাকাল, তাদের নিথর সবুজ পাতা ও শাদা বাকল চোখে পড়ল। মরে যাব…কালই মরে যাব…আমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না…এ সবকিছুই থাকবে, থাকব না শুধু আমি…
আলো-ছায়ায় ঘেরা বার্চ গাছেরা, কুণ্ডলি পাকানো মেঘের দল, শিবির-আগুনের ধোঁয়া, চারদিকে যা কিছু আছে, সব যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল, ভয়াল, ভয়ংকর হয়ে দেখা দিল। একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। তাড়াতাড়ি উঠে চালাঘরের বাইরে গিয়ে সে ইতস্তত হাঁটতে লাগল।
আবার ভিতরে এসে শুনতে পেল বাইরে কারা যেন কথা বলছে। কে ওখানে? সে চেঁচিয়ে বলল।
লাল-নাক ক্যাপ্টেন তিমোখিন একজন অ্যাডজুটান্ট ও একজন তবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে সলজ্জভাবে ঘরে ঢুকল।
সব কাজের কথা শুনে প্রিন্স আন্দ্রু তাদের আরো কিছু নির্দেশ দিল, এমন সময় ঘরের পিছন থেকে একটা অস্পষ্ট গলা শোনা গেল।
কোনো কিছুতে ঠোক্কর খেয়ে কে যেন বলে উঠল, জাহান্নামে যাও!
ঘর থেকে বেরিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল একটা কাঠের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পিয়ের প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। পিয়েরকে দেখে প্রিন্স আন্দ্রুর মন অপ্রসন্ন হয়ে উঠল, শেষবারের মস্কো ভ্রমণের বেদনাময় স্মৃতি তার মনে পড়ে গেল।
তুমি? কী আশ্চর্য! তুমি এখানে কেন এসেছ? এ যে অপ্রত্যাশিত।
বলতে বলতে প্রিন্স আন্দ্রুর চোখে-মুখে যে ভাব দেখা দিল তা নিস্পৃহতারও বেশি–তাতে প্রকাশ পেল বিরূপ মনোভাব, আর সেটা পিয়েরের নজর এড়াল না।
আমি এসেছি…শুধু…কি জান…এসেছি…এসব দেখতে আমার ভালো লাগে…আমি যুদ্ধ দেখতে চাই, পিয়ের বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু ঠাট্টা করে বলল, আচ্ছা, তার যুদ্ধ সম্পর্কে তোমার সংঘভাইরা কি বলে? তারা কোন পথে এ যুদ্ধ থামাতে চায়?…যাকগে, মস্কোর খবর কি বল? আর আমার লোকজনরা? তারা কি মস্কো পৌঁছেছে?
হ্যাঁ, পৌঁছেছে। জুলি দ্রবেস্ক্রয়া আমাকে সেইরকমই বলেছে। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। দেখা হয়নি। তারা তোমাদের মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারিতে চলে গেছে।
.
অধ্যায়-২৫
অফিসারদের বিদায় নেবার সময় হল, কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রু বন্ধুকে নিয়ে একা থাকতে অনিচ্ছুক হওয়ায় তাদের আরো কিছুক্ষণ থেকে চা খেয়ে যেতে বলল। বসার আসন ও চা এল। অফিসাররা অবাক হয়ে পিয়েরের লম্বা চওড়া চেহারার দিকে তাকিয়ে তার মুখ থেকে মস্কোর কথা এবং সদ্য-দেখা আমাদের ঘাঁটির অবস্থার কথা শুনতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু চুপচাপ বসে থাকল, তার মুখের বিরূপ ভাব দেখে পিয়ের প্রধানত ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার ভালো মানুষ তিমোখিনকে উদ্দেশ করেই কথা বলতে লাগল।
