সেই কবিতা…মারিনের সেই কবিতা…আহা, কি যেন লাইনগুলো? জেরাকভ সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন : সৈনিকদের জন্য লিখিত ভাষণ…আবৃত্তি কর, সেগুলি আবৃত্তি কর! বলে সে যেন হাসবার জন্য তৈরি হল।
কেসারভ আবৃত্তি করতে লাগল।…কুতুজভ হেসে কবিতার তালে তালে মাথা নাড়তে লাগল।
পিয়ের কুতুজভের কাছ থেকে সরে গেলে দলখভ তার কাছে এসে হাতটা ধরল।
অপরিচিত লোকদের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করেই সে উঁচু গলায় বলল, এখানে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব খুশি হয়েছি কাউন্ট। আমাদের দুজনের মধ্যে কে যে বেঁচে থাকবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন, তাই আজকের দিনে তোমাকে বলছি যে আমাদের মধ্যে যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল সেজন্য আমি দুঃখিত, আর আমার ইচ্ছা যে তুমিও আমার প্রতি কোনোরকম বিরূপ মনোভাব পোষাণ করো না। আজ তোমাকে এই কথাটা বলার সুযোগ পেলাম বলেও আমি খুশি। আমার মিনতি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
কি বলবে বুঝতে না পেরে পিয়ের দলখভের দিকে তাকিয়ে হাসল। অশ্রুভেজা চোখে দলখভ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল।
বরিস তার সেনাপতিকে কি যেন বলল, কাউন্ট বেনিংসেন পিয়েরের দিকে ঘুরে তাকেও অশ্বারোহণে তাদের অনুগামী হতে বলল।
তোমার ভালো লাগবে, সে বলল।
হ্যাঁ, খুব ভালো লাগবে, পিয়ের বলল।
আধ ঘণ্টা পরে কুতুজভ তাতারিনভার উদ্দেশে যাত্রা করল, আর বেনিংসেন পিয়েরকে সঙ্গে নিয়ে সদলবলে রণক্ষেত্র বরাবর ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
.
অধ্যায়-২৩
গোর্কি থেকে বেনিংসেন সেতুর দিকে যাবার বড় রাস্তায় নামল। সেতু পেরিয়ে বরদিনো গ্রামে ঢুকে তার বা দিকে মোড় নিল, অসংখ্য সৈন্য ও কামান পার হয়ে সেই উঁচু গোল পাহাড়টায় পৌঁছল যেখানে অসামরিক লোকজনরা পরিখা খুঁড়ছে। সেটাও একটা দুর্গ, এখনো নামকরণ না হলেও পরবর্তীকালে সেটা রায়েভস্কি দুর্গ নামেই খ্যাত হয়েছিল। পিয়ের সেটার দিকে বিশেষ নজর দিল না। সে তো জানত না যে গোটা বরদিনো প্রান্তরের মধ্যে সে জায়গাটাই একদিন তার কাছে সবচাইতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
একটা খাঁড়ি পার হয়ে তারা সেমেভস্কের পৌঁছল। সেখানে সৈন্যরা কুঁড়েঘর ও গোলাবাড়ি থেকে শেষ কাঠের গুঁড়িগুলোও টেনে বের করছে। তারপর সৈন্যদের পায়ে-পায়ে দুমড়ানো যই-ক্ষেতের ভিতর দিয়ে অনেক চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে তারা যেখানে পৌঁছল সেখানে তখনো পরিখা খোঁড়ার কাজ চলছে।
বেনিংসেন পরিখার পাশে থামল, উল্টো দিকের শেভার্দিনো দুর্গের দিকে তাকাল, আগেরদিনও সেটা আমাদেরই ছিল, কয়েকজন অশ্বারোহী সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অফিসাররা বলল, নেপোলিয়ন বা মুরাৎ দুজনের যে কোনো একজন সেখানে আছে। সকলে সাগ্রহে সেদিকে তাকাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত অশ্বারোহীরা তূপ থেকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বেনিংসেন জনৈক সেনাপতিকে আমাদের সৈন্যদের অবস্থান ও গতিবিধি বুঝিয়ে বলতে লাগল। পিয়ের মনোযোগ দিয়ে সব শুনল, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। পিয়ের তার কথা শুনছে দেখে কথা থামিয়ে বেনিংসেন হঠাৎ তাকে বলল, এসব কথা তোমার ভালো লাগছে বলে মনে হয় না।
মনের কথা না বলে পিয়ের উত্তরে বলল, বরং আমার খুবই ভালো লাগছে।
খাঁড়ি থেকে আরো বাঁ দিকে এগিয়ে তারা যে পথটা ধরল সেটা ছোট ছোট বার্চ গাছের ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। মাইল দেড়েক চলার পরে তারা জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেল। সেখানে তুচখভের সেনাদলকে মোতায়েন করা হয়েছে বাম ব্যুহ রক্ষার জন্য।
ব্যূহের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বেনিংসেন খুব উত্তেজিতভাবে অনেক কথা বলে গেল। পিয়েরের মনে হল, সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশও দেওয়া হল। তুচখভের সৈন্যদের সামনে কিছুটা উঁচু জমি রয়েছে, সেখানে কোনো সৈন্য মোতায়েন করা হয়নি। এই ভুলের তীব্র সমালোচনা করে বেনিংসেন বলল, চারদিকে নজর রাখা যায় এরকম একটা উঁচু জায়গাকে অরক্ষিত রেখে তার নিচে সেনা সমাবেশ করা তো পাগলামি। কয়েকজন সেনাপতিও সেই অভিমত প্রকাশ করল। একজন তো সামরিক উত্তাপের সঙ্গে বলে উঠল যে তাদের ওখানে রাখা হয়েছে খুন হরার জন্যই। বেনিংসেন নিজের কর্তৃত্ববলেই হুকুম দিল, ঐ উঁচু। জায়গায় সেনাসমাবেশ করা হোক।
বাম ব্যূহের এইসব ব্যবস্থা দেখে সামরিক বিধি-ব্যবস্থা বুঝবার ব্যাপারে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে পিয়েরের সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। যে লোকটি সৈন্যদের পাহাড়ের নিচে মোতায়েন করেছিল সে যে এতবড় একটা সহজবোধ্য ভুল কেমন করে করেছিল তা সে কিছুতেই বুঝতে পারেনি।
পিয়ের মোটেই জানত না যে বেনিংসেনের অনুমানমতো ঐ সন্যদের ঘাঁটি রক্ষার জন্য সেখানে রাখা হয়নি, তাদের সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল অতর্কিত আক্রমণের জন্য, যাতে কোনো অগ্রসরমান শত্রুকে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রমণ করতে পারে। বেনিংসেন সেটা জানত না, এবং ব্যাপারটা প্রধান সেনাপতির গোচরে না এনেই নিজের ধারণামতো সৈন্যদের সামনের দিকে সরিয়ে দিল।
.
অধ্যায়-২৪
সেদিন ২৫ আগস্টের উজ্জ্বল সন্ধ্যায় প্রিন্স আন্দ্রু তার সেনা-শিবিরের একেবারে শেষ প্রান্তে কনিয়াকোভো গ্রামের একটা ভাঙা চালাঘরে কনুইতে ভর দিয়ে শুয়েছিল। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পেল, ত্রিশ বছরের পুরনো একসারি বার্চ গাছের নিচু ডালগুলি সব কেটে ফেলা হয়েছে, মাঠের বুকে যইয়ের স্তূপগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কতকগুলি ঝোঁপ-ঝাড়ের পাশ থেকে সৈনিকদের রান্নাঘরের ধোয়া উঠছে।
