কিন্তু আমি দেখতে চাই দক্ষিণ ব্যুহটা। সকলে বলছে সেটা খুব শক্ত-পোক্ত। আমার ইচ্ছা মস্ক নদী থেকে শুরু করে ঘোড়ায় চেপে চারদিকটা চক্কর দেই।
বেশ তো, সেটা পরেও করতে পারবে, কিন্তু আসল চিজ হচ্ছে বাম ব্যুহটা।
ঠিক, ঠিক। কিন্তু প্রিন্স বলকনস্কির রেজিমেন্টটা কোথায়? সেটা দেখাতে পার কি?
প্রিন্স আন্দ্রুর তো? আমরা সেখান দিয়েই যাব। তোমাকে তার কাছেও নিয়ে যাব।
বাম ব্যূহের কি হবে? পিয়ের শুধাল।
গোপন কথা বলার মতো গলা নামিয়ে বরিস বলল, তোমাকে সত্যি কথাটাই বলছি, বাম ব্যূহের অবস্থা যে কি তা শুধু ঈশ্বরই জানেন। কাউন্ট বেনিংসন যা চেয়েছিলেন তা মোটেই ঘটেনি। গোল পাহাড়টাকে তিনি অন্যভাবে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু… বরিস দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিল, কিন্তু প্রশান্ত মহামহিমের তা ইচ্ছা নয়, অথবা অন্য কেউ তাকে সেইরকমই বুঝিয়েছে। দেখ… বরিসের কথা শেষ হবার আগেই। কুতুজভের অ্যাডজুটান্ট কেসারভ পিয়েরের কাছে এসে হাজির হল। কোনোরকম বিচলিত না হয়ে বরিস তাকে বলল, আরে, কেসারভ! আমাদের অবস্থাটা কাউন্টকে বুঝিয়ে বলছিলাম। প্রশান্ত মহামহিম যে কেমন করে আগে থেকেই ফরাসিদের অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছিলেন সেটাই আশ্চর্য!
আপনি বাম ব্যূহের কথা বলছেন কি? কেসারভ শুধাল।
হ্যাঁ, ঠিক তাই, এখন তো বাম ব্যুহ খুবই শক্তিশালী।
কুতুজভ সব অপ্রয়োজনীয় কর্মচারীদের বরখাস্ত করলেও বরিস এখনো কায়দা করে প্রধান ঘাঁটিতেই টিকে আছে। কাউন্ট বেনিংসেনের কাছে সে তার আসন পাকা করে নিয়েছে, যখন যার অধীনে কাজ করেছে সেই তরুণ প্রিন্স বেস্কয়কে মহামূল্যবান বলে মনে করেছে।
উপর মহলে এখন দুটো পরিষ্কার আলাদা দল হয়েছে : কুতুজভের দল আর বেনিংসেনের দল। বরিস শেষোক্ত দলের লোক, কিন্তু কুতুজভের প্রতি দাসসুলভ ভক্তি দেখিয়েও সে এরকম একটা ধারণার সৃষ্টি করেছে যে বুড়োটা কোনো কর্মের নয়, বেনিংসেনই সবকিছু করেছে, সেটা সে ছাড়া আর কেউ পারত না। এখন তো যুদ্ধের চরম পর্যায় সমুপস্থিত, এবার কুতুজভের পতন হবে, আর সব ক্ষমতা যাবে বেনিংসেনের হাতে, এমন কি যুদ্ধে কুতুজভের জয় হলেও সকলে মনে করবে যে যা কিছু করার সব বেনিংসেনই করেছে। অবস্থা যাই হোক, কালকের যুদ্ধের জন্য অনেক বড় বড় পুরস্কার দিতে হবে, আর রণক্ষেত্রে আসবে অনেক নতুন মানুষ। কাজেই আজ সারাটাদিন বরিস খুবই খুশি-খুশি।
দূর থেকে পিয়েরকে দেখতে পেয়ে কুতুজভ বলল, ওকে আমার কাছে ডাক।
অ্যাডজুটান্টই প্রশান্ত মহামহিমের ইচ্ছাটা পিয়েরকে জানাল, সেও কুতুজভের বেঞ্চির দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু জনৈক অসামরিক লোক তার আগেই সেখানে পৌঁছে গেল। লোকটি দলখত।
ও লোকটা এখানে এল কেমন করে? পিয়ের শুধাল।
ও জীবটি সব জায়গাতেই নাক গলাকে পারে! জবাব এল। আপনি তো জানেন, ওর পদাবনতি ঘটেছিল। ও আবার ফুলে উঠতে চাইছে। এটা-ওটা নানারকম ফন্দি-ফিকিরের কথা বলছে, রাতের বেলা শত্রুর পিকেটলাইনেও হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকেছে…লোকটি সাহসী।
পিয়ের টুপি খুলে সশ্রদ্ধভাবে কুতুজভকে অভিবাদন জানাল।
তখনো দলখভ বলছে, আমি স্থির করলাম, প্রশান্ত মহামহিমের সঙ্গে দেখা করে সব কথা বললে আপনি আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে পারেন, অথবা এও বলতে পারেন যে আমি যা বলছি তা আপনি আগেই জানতেন, কিন্তু যাই হোক না কেন তাতে আমার তো কোনো ক্ষতি নেই…
ঠিক, ঠিক।
কিন্তু আমার কথা যদি ঠিক হয় তাহলে আমার পিতৃভূমির এমন একটা কাজ করা হবে যার জন্য মরতেও আমি প্রস্তুত।
ঠিক, ঠিক।
আর প্রশান্ত মহামহিমের যদি এমন একটি লোকের প্রয়োজন হয় যে তার জন্য নিজের চামড়া খুলে দিতেও দ্বিধা করবে না তাহলে দয়া করে আমার কথাটা মনে রাখবেন…হয়তো প্রশান্ত মহামহিমের কিছু দরকারে আমি লাগতে পারব।
ঠিক…ঠিক…কুতুজভ বার বার একই কথা বলল, পিয়েরের দিকে তাকিয়ে তার হাস্যময় চোখটা ক্রমেই ছোট হতে লাগল।
ঠিক তখনই পারিষদসুলভ দক্ষতার সঙ্গে বরিস কুতুজভের কাছেই পিয়েরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে গলা না চড়িয়ে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল যেন আগেকার কোনো আলোচনারই জের টানছে।
অসামরিক বাহিনী তো শাদা শার্ট পরে জান দিতেও প্রস্তুত। কী বীরত্ব, কাউন্ট।
প্রশান্ত মহামহিম যাতে শুনতে পায় তেমনভাবেই কথাগুলি বলা হল। সে জানতো এই কথাগুলি কুতুজভের মনোযোগ আকর্ষণ করবেই।
কুতুজভ বরিসকে শুধাল, অসামরিক বাহিনী সম্পর্কে বলছ হে?
প্রশান্ত মহামহিম, পরিষ্কার শাদা শার্ট পরে ওরা কালকের জন্য মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
ওঃ!…আশ্চর্য, অতুলনীয় মানুষ ওরা! বলে কুতুজভ চোখ বুজে মাথা দোলাতে লাগল। অতুলনীয় মানুষ! দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটা আবার বলল।
তারপর পিয়েরকে বলল, তাহলে তুমিও বারুদের গন্ধ শুঁকতে চাও? ভালো, খুব ভালো গন্ধ। তোমার স্ত্রীর প্রশংসাকারীদের মধ্যে আমিও আছি। সে ভালো আছে তো? আমার বাসস্থানের দরোজা তোমার জন্য খোলাই আছে।
বুড়ো মানুষদের বেলায় যেমন সচরাচর ঘটে থাকে, যা কিছু বলার বা করার ছিল সব ভুলে গিয়ে কুতুজভ অন্যমনস্কভাবে ইতস্তত তাকাতে লাগল।
তারপর হঠাৎ যেন কি মনে পড়ায় অ্যাডজুটান্টের ভাই আন্দ্রু কোরভকে ইশারায় কাছে ডাকল।
