বরদিনো থেকে গির্জার একটা শোভাযাত্রা পাহাড় বেয়ে উঠে আসছে। ধুলোভরা রাস্তায় প্রথমে এল পদাতিক দল। তাদের পিছন থেকে ভেসে এল গির্জার সঙ্গীত।
সৈনিক ও অসামরিক লোকজনরা পিয়েরকে পাশ কাটিয়ে খালি মাথায় শোভাযাত্রার দিকে ছুটে গেল।
ওরা তাঁকে নিয়ে আসছে, আমাদের রক্ষাকারিণীকে!…আইবেরীয় ঈশ্বর-জননী! কে একজন চেঁচিয়ে বলল।
আর একজন তাকে শুধরে দিয়ে বলল, স্মালেনস্ক ঈশ্বর-জননী।
বেসরকারি লোকজন যারা গ্রামে ছিল এবং যারা ঘাঁটিতে কাজ করছিল সকলেই কোদাল ফেলে গির্জার শোভাযাত্রা দেখতে ছুটে গেল। সৈনিকদের পিছন পিছন এল পরিচ্ছদধারী পুরোহিতরা–মাথায় পাগড়ি বাঁধা একটি ছোটখাট বুড়ো মানুষ এল অনুচর ও গায়কদের সঙ্গে নিয়ে। তাদের পিছনে সৈনিক ও অফিসাররা বয়ে নিয়ে এল খোদাই-করা ধাতুর ঢাকনা দেওয়া একটি মস্ত বড় কালো-মুখ দেবমূর্তি। এই দেবমূর্তিটিকেই নিয়ে আসা হয়েছে সমালেনস্ক থেকে এবং সেই থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গেই আছে। পিছনে, সামনে, দুই পাশে অসামরিক লোকগুলো খালি মাথায় হাঁটছে, আর মাটিতে মাথা ঠুকছে।
পাহাড়ের মাথায় উঠে দেবমূর্তিসমেত সকলেই থামল। সূর্যের আতপ্ত রশ্মি তির্যকভাবে মাটিতে এসে পড়ছে, একটা মৃদু বাতাস এসে খোলা মাথাগুলির চুল ও দেবমূর্তির সাজসজ্জার ফিতেগুলো নিয়ে খেলা করছে। গান সমানভাবেই চলেছে। অফিসার, সৈনিক ও অসামরিক লোকজনরা খালি মাথায় দেবমূর্তিকে ঘিরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। গায়করা ক্লান্তকণ্ঠে গেয়ে চলেছে : হে ঈশ্বর-জননী, তোমার সেবকদের এই বিপদ থকে রক্ষা কর, সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিত ও ডিয়েকন সুর ধরল : কারণ ঈশ্বরের পরে দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও আশ্রয়স্বরূপ তোমার কাছেই আমরা এসেছি। সকলের মুখেই আর একবার জ্বলে উঠল আসন্ন মুহূর্তের গাম্ভীর্য সম্পর্কে সেই সচেতন ভাব যা পিয়ের একটু আগেই দেখেছে মোঝয়ে পাহাড়ের নিচে অনেক লোকের মুখে এবং ক্ষণিকের জন্য হলেও আজ সকাল থেকে যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তাদের সকলেরই মুখে।
হঠাৎ দেবমূর্তির চারদিককার ভিড় সরে গিয়ে পিয়েরকে চেপে ধরল। যেরকম দ্রুততার সঙ্গে পথ করে দেওয়া হল তাতেই বোঝা গেল যে একজন খুবই বড় মাপের মানুষ দেবমূর্তির দিকে আসছে।
লোকটি কুতুজভ। ঘাঁটি পরিদর্শন করে তাতারিন ফিরবার পথে সে এখানে একবার থেমেছে। তাকে দেখেই পিয়ের চিনতে পারল, তার চেহারার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যই তাকে অন্যের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
তার বিরাট বৃষষ্কন্ধ দেহটা লম্বা ওভারকোটে ঢাকা, শাদা মাথাটা অনাবৃত, ফোলা মুখের নষ্ট হওয়া চোখের শাদা মণিটা দেখা যাচ্ছে। দুলতে দুলতে ভিড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে কুতুজভ পুরোহিতের পিছনে এসে থামল। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল, ঝুঁকে পড়ে মাটিতে হাত রাখল এবং শাদা মাথাটা নুইয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কুতুজভের পিছনে বেনিংসেন ও দলবল। প্রধান সেনাপতির উপস্থিতি ঊধ্বতন অফিসারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও অসামরিক লোকজন ও সৈনিকরা তার দিকে নজর না দিয়ে তাদের প্রার্থনাতেই মেতে রইল।
অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে কুতুজভ দেবমূর্তির কাছে এগিয়ে গেল, ভারি শরীর নিয়ে নতজানু হয়ে চেপে বসল, আভূমি নত হল, এবং পুনরায় উঠবার জন্য অনেকক্ষণ ধরে বৃথাই চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু দুর্বলতা ও দেহের বোঝার জন্য উঠতে পারল না। উঠবার চেষ্টায় শাদা মাথাটা কাঁপতে লাগল। শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়াল, শিশুর মতো ঠোঁট ফুলিয়ে দেবমূর্তিকে চুমো খেল এবং পুনরায় মাথা নুইয়ে হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করল। অন্য সেনাপতিরা তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল, তারপর অফিসাররা, এবং তারপরে সৈনিক ও অসামরিক লোজনরা উত্তেজিত মুখে ঠেলাঠেলি করতে করতে ভিড় করে এগিয়ে গেল।
.
অধ্যায়-২২
ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা খেতে খেতে পিয়ের চারদিকে তাকাতে লাগল।
কাউন্ট পিতর কিরিলেভিচ! তুমি এখানে কেমন করে এলে? একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
পিয়ের চারদিকে তাকাল। হাত দিয়ে হাঁটু ঝেড়ে (সম্ভবত দেবমূর্তির সামনে নতজানু হওয়ায় হাঁটুতে ধুলো লেগেছে) বরিস বেঙ্কয় হাসতে হাসতে এগিয়ে এল।বরিসের পরনে রুচিসম্মত পোশাক, তাতে অভিযানের উপযোগী একটা সামরিক কেতার ছোঁয়া লেগেছে। গায়ে একটা লং কোট, কুতুজভের মতোই একটা চাবুক কাঁধ থেকে ঝোলানো।
ইতিমধ্যে কুতুজভ গ্রামে পৌঁছে কাছাকাছি একটা বাড়ির ছায়াতে বসেছে। একজন কসাক দৌড়ে একটা বেঞ্চি এনে দিল, আর একজন তাড়াতাড়ি তার উপর একটা কম্বল বিছিয়ে দিল। চারদিকে থেকে দলবল তাকে ঘিরে ধরল।
ভিড়সহ দেবমূর্তিকে আরো দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বরিসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পিয়ের কুতুজভের কাছ থেকে প্রায় ত্রিশ পা দূরে থেমে পড়ল।–
যুদ্ধে উপস্থিত থেকে ঘাঁটি দেখবার বাসনা সে জানাল।
বরিস বলল, সেটাই তো তোমার করা উচিত। তোমার থাকার ব্যবস্থা আমিই করে দেব। কাউন্ট বেনিংসেন যেখানে থাকবেন সেখান থেকেই সবকিছু ভালোভাবে দেখতে পাবে। তুমি তো জান আমি তার দলেই আছি, তাকে তোমার কথা বলব। কিন্তু যদি ঘাঁটিটা ঘুরে দেখতে চাও তো আমাদের সঙ্গে চল। আমরা এখনই বাম ব্যূহে যাচ্ছি। ফিরে এসে রাতটা আমার সঙ্গেই কাটাবে, তাস খেলার ব্যবস্থাও করা যাবে। তুমি তো দিমিত্রি সেগিভিচকে চেন? ঐ তো তার বাসস্থান। আঙুল বাড়িয়ে গোর্কি গাঁয়ের তৃতীয় বাড়িটা দেখিয়ে দিল।
