বেলা প্রায় এগারোটা। সূর্য তার কিছুটা বাঁয়ে ও পিছনে পড়েছে, দূরপ্রসারিত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে।
সেই দৃশ্যপটকে দ্বিখণ্ডিত করে স্মোলেনস্ক বড় রাস্তাটা উপর থেকে বাঁদিকে এঁকেবেঁকে একটা গ্রামের ভিতর দিয়ে চলে গেছে, গোল পাহাড়ের নিচে শ পাঁচেক পা সামনে একটা শাদা গির্জা দেখা যাচ্ছে। এই গ্রামটাই বরদিনো। গ্রামের নিচে রাস্তাটাই একটা সেতুর উপর নিয়ে নদী পেরিয়ে অনেক চড়াই-উত্রাই কাটিয়ে উপরে উঠতে উঠতে প্রায় চার মাইল দূরবর্তী ভালুভো গ্রামের দিকে চলে গেছে। সেখানেই তখন নেপোলিয়নের ঘাঁটি। ভালুভো পেরিয়ে রাস্তাটা দিগন্তের কোলে একটা হলুদ বনের মধ্যে হারিয়ে গেছে। রাস্তার ডানদিকে অনেক দূরের বার্চ ও ফার গাছের জঙ্গলের মধ্যে কলোচা মঠের ক্রুশ ও ঘণ্টা-ঘরটা সূর্যের আলোয় চকচক করছে। জঙ্গল ও রাস্তার ডাইনে ও বায়ে গোটা নীল প্রান্তর জুড়ে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমাদের ও শত্রুপক্ষের ধূমায়মান শিবিরের আগুন আর অসংখ্য সৈন্য। কলোচা ও মস্কভা নদীর তীর বরাবর ডানদিকের মাঠ ভাঙা-ভাঙা ও পর্বতসংকুল। তার খড়ির ফাঁকে ফাঁকে অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে বেজুবভা ও জাখারিনো গ্রাম দুটি। বাঁদিকে মাঠ অনেক বেশি সমতল, সেখানে ফসলের ক্ষেত আছে, অগ্নিদগ্ধ ধূমায়মান সেমেনভঙ্ক গ্রামটাও দেখা যাচ্ছে।
বাঁদিকে অথবা ডানদিকে পিয়ের যা কিছু দেখতে পেল তাতে তার প্রত্যাশা পূর্ণ হল না। যে রণক্ষেত্র দেখার আশা সে করেছিল তা কোথাও দেখা গেল না, শুধুই মাঠ, প্রান্তর, সেনাদল, জঙ্গল, শিবির-আগুনের ধোয়া, গ্রাম, স্তূপ, আর নদী-নালা, অনেক চেষ্টা করেও সেখানে কোনো সামরিক ঘাঁটি তার চোখে পড়ল না, এমনি কি আমাদের ও শত্রুপক্ষের সৈন্যদেরও সে আলাদা করে চিনতে পারল না।
সবকিছু জানে এরকম কাউকে জিজ্ঞাসা করা যাক, এই কথা ভেবে পিয়ের একজন অফিসারের দিকে এগিয়ে গেল। অফিসারটি তার অসামরিক মূর্তির দিকে সকৌতূহলে তাকিয়ে ছিল।
সামনে ওটা কোন গ্রাম জানতে পারি কি?
একজন সঙ্গীর দিকে ফিরে অফিসারটি বলল, বুদিনোনা, তাই না?
বরদিনো, সঙ্গীটি কথাটা শুধরে দিল।
কথা বলার একটি লোক পেয়ে অফিসারটি খুশি মনে পিয়েরের কাছে এগিয়ে এল।
ওখানে ওরা কি আমাদের সৈন্য? পিয়ের শুধাল।
অফিসার বলল, হ্যাঁ, আর ঐ দূরে আছে ফরাসিরা। ঐ যে অনেক দূরে দেখতে পাচ্ছেন?
কোথায়? কোথায়? পিয়ের শুধাল।
খালি চোখেই তো দেখা যাচ্ছে…কেন ঐ তো!
বাঁদিকে নদীর ওপারে যে ধোয়া দেখা যাচ্ছে সেইদিকে হাত বাড়িয়ে অফিসারটি বলল।
বাঁদিকের গোল পাহাড়ে কিছু সৈন্য দেখতে পেয়ে পিয়ের বলল, আচ্ছা, তাহলে ওরাই ফরাসি! ঐ যে দূরে?
ওরা আমাদের সৈন্য!
ও আমাদের! আর ওই ওখানে?… দূরে আর একটা গোল পাহাড় দেখিয়ে পিয়ের বলল। পাহাড়টার উপরে একটা বড় গাছ, সেখানেও কিছু শিবির-আগুনের ধোঁয়া ও কালো কালো কি যেন দেখা যাচ্ছে।
অফিসার বলল, ওটা আবার তার হয়ে গেছে। (ওটাই শেভার্দিনো দুর্গ) কালও আমাদেরই ছিল, কিন্তু এখন তার।
তাহলে আমাদের ঘাঁটি কোথায়?
আমাদের ঘাঁটি? আত্মতুষ্টির হাসি হেসে অফিসারটি জবাব দিল। সব আপনাকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলছি, কারণ প্রায় সবগুলি পরিখাই আমি কাটিয়েছি। ওই যে, দেখতে পাচ্ছেন? ঠিক ওখানেই বরদিনোতে আমাদের কেন্দ্রীয় ঘাঁটি, সামনের শাদা গির্জাওয়ালা গ্রামটা দেখিয়ে সে বলল। ওখানেই কালোচা নদী পার হতে হয়। নিচে ওই যে একসারি ঘর পড়ে আছে ওখানেই রয়েছে সেতুটা। ওটাই আমাদের কেন্দ্র। আমাদের দক্ষিণ ব্যুহটা ওইদিকে-সে ডান দিকটা দেখাল। ওখানেই আছে মস্ক নদী, ওখানেই আমরা তিনটে দুর্গ গড়েছি–খুব শক্ত-পোক্ত করেই গড়া হয়েছে। আর বাম ব্যহটা… এইখানে অফিসারটি থামল। কি জানেন, এটা বোঝানো একটু শক্ত…গতকাল আমাদের বাম ব্যুহ ছিল ওইখানে শেভার্দিনোতে, ওই যে, যেখানে ওক গাছটা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু আজ আমাদের বাম ব্যুহটা সরিয়ে আনা হয়েছে-এখন সেটা আছে ওখানে, ওই যে একটা গ্রাম আর ধোয়া দেখতে পাচ্ছেন? ওটাই সোমেনভসক, হ্যাঁ, ওই যে, সে রায়েভস্কি পাহাড়টা দেখাল। কিন্তু যুদ্ধটা ওখানে হবে না, তারা সেনাদল সরিয়ে নেওয়ায় ওটা একটা ফন্দিমাত্র, সে হয়তো ঘুরে মস্কভা নদীর ডান দিকে চলে যাবে। কিন্তু যুদ্ধ যেখানেই হোক, কাল অনেক লোক হারিয়ে যাবে।
একজন বয়স্ক সার্জেন্ট এগিয়ে এসে তার কথাগুলি শুনছিল, এইখানে অফিসারের বক্তব্য মনোমত না হওয়ায় সে তাকে বাধা দিল।
কঠোরকণ্ঠে বলল, মাটির ঝুড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।
অফিসারটি অপ্রস্তুত বোধ করল, সে বুঝতে পারল, কাল কত সৈন্য হারিয়ে যাবে সেটা জানা থাকলেও বলা উচিত নয়।
তাড়াতাড়ি বলে উঠল, বেশ তো, তিন নম্বর কোম্পানিকে পাঠিয়ে দিন।
আর আপনি, আপনি কি একজন ডাক্তার?
না, আমি নিজের থেকেই এসেছি, বলে পিয়ের পাহাড় বেয়ে নেমে গেল।
যে লোকগুলি কাজ করছে তাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে নাক চেপে ধরে অফিসারটি অস্ফুটে বলে উঠল, আ, যত সব বাজে লোকের ভিড়!
ওরা আসছে…তাকে নিয়ে আসছে…ওই তো দেখা যাচ্ছে…এক মিনিটের মধ্যেই এখানে এসে পড়বে, হঠাৎ নানা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, অফিসার, সৈনিক ও অসামরিক লোকজনরা রাস্তায় ছুটে চলল।
