বুঝিবা সেই গানেরই প্রত্যুত্তরে মাথার উপরে ঘণ্টা বাজছে ধাতব শব্দ করে। সূর্যের আতপ্ত কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে উল্টো দিকের উত্রাইয়ের মাথায়।
গাল-ফোলা সৈনিকটি সক্রোধে অশ্বারোহী গায়কদের দিকে তাকাল। ঘৃণাভরে বিড়বিড় করে বলল, আঃ, ভাঁড়ের দল।
গাড়ির পিছনে দাঁড়ানো সৈনিকটি বিষণ্ণ হাসি হেসে পিয়েরকে উদ্দেশ্য করে বলল, শুধু সৈনিকরাই নয়, আজ আমি চাষীদেরও দেখেছি…চাষীরা-তাদেরও চলে যেতে হচ্ছে। আজকাল কোনো বাছ-বিচার নেই।…তারা চায় যে গোটা জাতি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড় ক, এককথায়, এই তো মঙ্কো! তারা এর অবসান ঘটাতে চায়।
সৈনিকটির কথার অস্পষ্টতা সত্ত্বেও সে যে কি বলতে চায় তা বুঝতে পেরে পিয়ের সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।
রাস্তাটা আবার পরিষ্কার হয়েছে। পাহাড়ের নিচে নেমে পিয়ের ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
পরিচিত মুখের সন্ধানে সে পথেরই দুই দিক দেখতে দেখতে চলল। কিন্তু সর্বত্রই নানা বিভাগের সামরিক কর্মীদের মুখই তার নজরে পড়ল। তারা সকলেই সবিস্ময়ে তার শাদা টুপি ও লেজওয়ালা সবুজ কোটের দিকে তাকিয়ে দেখছে।
প্রায় তিন মাইল চলবার পরে একজন পরিচিত লোককে দেখে সাগ্রহে তাকে ডাকল। সমর-বিভাগের একজন বড় ডাক্তার। সে যাচ্ছে। একটা ঢাকা গাড়িতে, তার পাশে বসে আছে একটি যুবক সার্জন, পিয়েরকে চিনতে পেরে সে চালকের আসনে উপবিষ্ট কাককে গাড়ি থামাতে বলল।
ডাক্তার বলল, কাউন্ট! ইয়োর এক্সেলেন্সি, আপনি এখানে এলেন কেমন করে?
আরে, কি জানেন, আমি দেখতে চাই…
হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখবার মতো কিছু অবশ্যই পাবেন…
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে পিয়ের কথাপ্রসঙ্গে ডাক্তারকে তার যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছার কথা জানাল।
ডাক্তার তাকে সরাসরি কুতুজভের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিল।
তরুণ সঙ্গীটির সঙ্গে দৃষ্টি-বিনিময় করে বলল, যুদ্ধের মধ্যে কেন যেখানে-সেখানে ছিটকে পড়বেন? আর যাই হোক, প্রশান্ত মহামহিম তো আপনাকে চেনেন, সাদরেই গ্রহণ করবেন। সেটাই আপনার করা উচিত।
ডাক্তারকে দেখে মনে হল সে ক্লান্ত, তাড়া আছে।
পিয়ের বলল, আপনি তাই মনে করেন?…আচ্ছা, আমি আরো জানতে চাই যে আমাদের ঘাঁটি এখন ঠিক কোথায়?
ডাক্তার বলল, ঘাঁটি? দেখুন, ওটা আমার এক্তিয়ার নয়। তাতারিনভা ছাড়িয়ে চলে যান, অনেক খোঁড়াখুঁড়ি দেখতে পাবেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলেই সব দেখতে পাবেন।
সেখান থেকে দেখা যাবে?…আপনি যদি…
কিন্তু তার কথায় বাধা দিয়ে ডাক্তার তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। নিজের গলা দেখিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে যেতাম, কিন্তু বিশ্বাস করুন, কাজের চাপ আমার গলা পর্যন্ত ঠাসা। একটা কোম্পানির কমান্ডারের কাছে চলেছি অবস্থা কীরকম? আপনি তো জানেন কাউন্ট, আগামীকাল একটা যুদ্ধ হবে। এক লক্ষ সৈন্যের অন্তত বিশ হাজার আহত হবে, অথচ আমাদের হাতে যা স্ট্রেচার, বাংক, ড্রেসার অথবা ডাক্তার আছে তা ছ হাজারের পক্ষেও যথেষ্ট নয়। দশ হাজার গাড়ি আমাদের আছে, কিন্তু অন্যসব জিনিসও তো চাই–যতদূর সম্ভব একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে!
হাজার হাজার যুবক ও বৃদ্ধ যারা অবাক বিস্ময়ে তার টুপিটার দিকে তাকিয়েছিল তাদের মধ্যে বিশ হাজারের অনিবার্য নিয়তি আঘাত ও মৃত্যু–এই চিন্তাই পিয়েরকে বিস্মিত করে তুলল।
তারা তো কালই মরতে পারে, তাহলে মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু তারা ভাবছে কেন? অশ্বারোহী সৈন্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে যুদ্ধে চলেছে, আহতদের দেখেও মুহূর্তের জন্য নিজেদের ভাগ্যের কথা ভাবছে না, আহতদের নিয়তি মৃত্যু, আর তারা কি না টুপি দেখে অবাক হচ্ছে। আশ্চর্য! ভাবতে ভাবতে পিয়ের তাতারিনভার দিকে এগিয়ে চলল।
রাস্তার বাঁদিকে একটি জমিদার বাড়ির সামনে অনেক গাড়ি, মালগাড়ি, আর্দালি ও সেপাই-শান্ত্রীর ভিড়। প্রধান সেনাপতি সেই বাড়িতেই বাসা নিয়েছে, কিন্তু পিয়ের যখন সেখানে পৌঁছল তখন সে ভিতরে ছিল না, পদস্থ কর্মচারীও কেউ নেই-সকলেই গির্জায় গেছে। পিয়ের গোর্কির দিকে গাড়ি চালাল।
পাহাড়ের মাথায় উঠে একটা গ্রাম্য রাস্তায় পড়ে সে এই প্রথম একদল অসামরিক চাষী সৈনিককে দেখতে পেল। শাদা শার্ট পরে টুপিতে ক্রুশ-চিহ্ন এঁটে তারা হেসে গল্প করতে করতে উত্তেজিত ও ঘর্মাক্ত দেহে ঘাসে ঢাকা একটা বড় গোল পাহাড়ের উপর কাজ করছে।
কেউ মাটি কাটছে, কেউ মাটি সরাচ্ছে, কেউ বা কিছুই করছে না।
গোল পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে অফিসার কাজের তদারক করছে। মনে হচ্ছে, সৈনিক জীবনের অভিনবত্বে চাষীরা খুবই মজা পেয়েছে। পিয়েরের মনে পড়ে গেল মোঝয়েন্ধের আহত সৈনিকদের কথা, একটি সৈনিক যে বলেছিল : ওরা চাইছে গোটা জাতিটাই ওদের পিছনে চলুক তার অর্থটা সে এবার বুঝতে পারল। যুদ্ধক্ষেত্রে কর্মরত এইসব দাড়িওয়ালা চাষীদের দেখে, তাদের বিশ্রী নোংরা বুট, ঘর্মাক্ত গলা, বুক খোলা শার্টের ফাঁকে বেরিয়ে পড়া রোদে পোড়া কণ্ঠাস্থি দেখে পিয়েরের মনে এই মুহূর্তটি যেরকম গাম্ভীর্য ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিল তেমনটি সে আগে কখনো দেখেওনি, শোনেওনি।
১০.৩ যুদ্ধক্ষেত্রটা দেখা
অধ্যায়-২১
পিয়ের গাড়ি থেকে নামল, অসামরিক সৈনিকদের পাশ কাটিয়ে গোল পাহাড়ের মাথায় উঠে গেল, ডাক্তার বলেছে, সেখান থেকেই যুদ্ধক্ষেত্রটা দেখা যাবে।
