নেপোলিয়ন যদি ২৪ তারিখ সন্ধ্যায় অশ্বারোহণে কলোচা নদীতীরে না পৌঁছত এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুর্গ আক্রমণের নির্দেশ না দিত, তাহলে হয়তো আমাদের পরিকল্পনা মতোই যুদ্ধটা হত। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে আমাদের পশ্চাদ্বর্তী বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পরে সেই সন্ধ্যায়ই আমাদের বাম ব্যূহের উপর আক্রমণ হওয়ায় এবং ২৪ তারিখ সন্ধ্যায়ই একটা যুদ্ধে লিপ্ত হবার মতো বাসনা বা সময় কোনোটাই রুশ সেনাপতিদের না থাকায় ২৪ তারিখেই বরদিনোর যুদ্ধের প্রথম ও প্রধান সংঘর্ষে আমাদের হার হল এবং স্বভাবতই ২৬ তারিখের যুদ্ধেরও সেই একই ফল হল।
শেভার্দিনো দুর্গ হাতছাড়া হবার পরে ২৫ তারিখ সকালে আমাদের বাম ব্যূহের কোনো ঘাঁটি না থাকায় সেটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে যে কোনো একটা স্থানে পরিখা কেটে তাড়াতাড়ি সেখানে ঘাঁটি বানানো হল।
২৬ তারিখে রুশ বাহিনী যে অসম্পূর্ণ ও দুর্বল একটা পরিখা দ্বারা রক্ষিত ছিল তাই শুধু নয়, আমাদের সৈন্যদের আরো অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল রুশ সেনাপতিদের অজ্ঞতার জন্য আমাদের বাম ব্যূহের ঘাঁটি যে হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং আসন্ন যুদ্ধের গোটা রণক্ষেত্রই যে ডান থেকে বাঁ দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে সেটা পুরোপুরি বুঝতে না পারায় তারা নোভু থেকে উতিৎসা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ঘাঁটিটাই রক্ষা করতে চেষ্টা করল এবং তার ফলে যুদ্ধ চলার সময়েই তাদের সৈন্যদের ডান থেকে বাঁ দিকে সরিয়ে নিতে হল। ফল এই দাঁড়াল যে যুদ্ধের সময়ে আগাগোড়াই রুশ বাহিনীকে গোটা ফরাসি বাহিনীর মোকাবিলা করতে হল মাত্র অর্ধেক সৈন্য নিয়ে। কাজেই বরদিনোর যুদ্ধের যে বিবরণ আমরা পাই আসলে যুদ্ধটা মোটেই সেভাবে হয়নি। কাজেই কোনো পূর্ব-নির্বাচিত পরিখা-বেষ্টিত রণক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের তুলনায় সামান্য দুর্বল সৈন্যশক্তি নিয়ে আমরা বরদিনোর যুদ্ধে লড়াই করিনি, শেভার্দিনো দুর্গ হারাবার ফলে রাশিয়াকে সে যুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে ফরাসি সৈন্যসংখ্যার অর্ধেক সৈন্য নিয়ে প্রায়-পরিখাবিহীন একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে, অর্থাৎ লড়াই হয়েছিল এমন পরিস্থিতিতে যাতে দশ ঘণ্টা লড়াই চালানো এবং ফলাফলকে অমীমাংসিত রাখাটা যে অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার তাই শুধু নয়, তিন ঘণ্টার জন্যও একটি সেনাদলকে সম্পূর্ণ বিপর্যয় ও পলায়নের হাত থেকে রক্ষা করাটাও অচিন্ত্যনীয়।
.
অধ্যায়-২০
২৫ সকালে পিয়ের মোঝায়েস্ক থেকে যাত্রা করল। খাড়া পাহাড়টার উত্রাইয়ের মুখে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তা যেখানে গির্জাটাকে ডাইনে রেখে শহর থেকে বাইরের দিকে চলে গেছে সেখানে তখন গির্জায় প্রার্থনা চলছে, ঘণ্টা বাজছে। গাড়ি থেকে নেমে পিয়ের পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল। তার পিছনে একটা অশ্বারোহী রেজিমেন্ট গায়কদের সামনে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। আগের দিনের যুদ্ধে আহত সৈনিকদের নিয়ে একসার গাড়ি তার দিকেই উঠে আসছে। চাষীরা হৈ-হৈ করতে করতে ঘোড়ার পিঠে চাবুক কসিয়ে রাস্তা পারাপার করছে। প্রতিটি গাড়িতে তিন বা চারজন আহত সৈনিক শুয়ে-বসে আছে। খাড়া উত্রাইয়ের উপর পাথর বিছিয়ে রাস্তার মতো যা তৈরি করা হয়েছে তাতে ঠোক্কর খেয়ে গাড়িগুলো টালমাটাল হয়ে চলেছে। ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়ে ব্যান্ডেজ বাধা আহত সৈনিকদের গালগুলি বিবর্ণ, ঠোঁটে ঠোঁট চাপা, কুঁচকানো ভুরু দুটো একসঙ্গে জুড়ে আছে। পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি বাঁচাতে তারা গাড়ির পাশগুলো চেপে ধরে আছে। প্রায় সকলেই শিশুসুলভ সরল কৌতূহলে পিয়েরের শাদা টুপি ও সবুজ চাতক-লেজ কোটের দিকে তাকিয়ে দেখছে।
পিয়েরের কোচয়ান রেগে চিৎকার করে আহত সৈনিকদের গাড়িগুলোকে একদিকে সরে যেতে বলল। গায়কবৃন্দসহ অশ্বারোহী রেজিমেন্টটি নেমে এসে পিয়েরের গাড়িটাকে ঘিরে ধরল, রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেল। পিয়ের থামল। আহত সৈনিকদের একটা গাড়ি পিয়েরের ঠিক পাশেই থেমে গেল। বাকলের জুতো পরা গাড়োয়ানটি তখনো হাঁপাচ্ছে, টায়ারবিহীন পিছনের চাকার নিচে একটা পাথর বসিয়ে সে ছোট ঘোড়াটার পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
একটি আহত বৃদ্ধ সৈনিক ব্যান্ডেজ-বাঁধা হাত নিয়ে গাড়ির পিছন পিছন হেঁটে আসছিল। ভালো হাতটা দিয়ে গাড়িটাকে ধরে সে পিয়েরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
বলুন তো দেশের মানুষ, এরা কি আমাদের এখানে ছেড়ে দেবে, নাকি মস্কো নিয়ে যাবে? লোকটি শুধাল।
পিয়ের তখন এত বেশি চিন্তামগ্ন যে প্রশ্নটা শুনতে পেল না। সে একবার অশ্বারোহী রেজিমেন্টের দিকে তাকাচ্ছে, আবার পাশের গাড়িটাকে দেখছে। গাড়িতে দুটি আহত লোক বসে আছে ও অপর একজন শুয়ে আছে। যে দুইজন বসে আছে তাদের একজনের গালে আঘাত লেগেছে। মাথাটা ন্যাকড়ায় জড়ানো, আর গালটা ফুলে একটি শিশুর মাথার মতো হয়েছে। তার নাক ও মুখ একপাশে বেঁকে গেছে। সে গির্জার দিকে তাকিয়ে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকছে। অপরটি বয়সে তরুণ, শীর্ণ মুখখানি এত শাদা যে মনে হয় তাতে রক্তের রেশমাত্র নেই। সে হেসে পিয়েরের দিকে তাকাল। যে শুয়ে আছে তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। অশ্বারোহী গায়করা পাশ দিয়ে চলে গেল, হায় হারিয়ে গেলাম। একেবারেই হারিয়ে গেলাম…
মাথায় তীব্র ব্যথা,
যেন বিদেশে বাস করছি…
তারা সৈনিকদের নাচের গান গাইছে।
