বরদিনোতে যুদ্ধের প্রস্তাব করা এবং সে প্রস্তাবকে গ্রহণ করা–উভয় ক্ষেত্রেই কুতুজভ কাজ করেছে সম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিরহিতভাবে, যুক্তিবিবর্জিতভাবে। কিন্তু পরবর্তীকালে ইতিহাসকাররা ঘটনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সুকৌশলে সেনাপতিদের দূরদৃষ্টি ও প্রতিভার স্বপক্ষে নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেছে, অথচ ইতিহাসের হাতে অন্যসব অন্ধ যন্ত্রের মতোই তারাও ছিল অতিমাত্রায় শৃঙ্খলিত ও ইচ্ছাশক্তিরহিত।
প্রাচীনকালের মানুষরা আমাদের জন্য এমন অনেক বীরত্বব্যঞ্জক আদর্শ কাব্য-কাহিনী রেখে গেছে যেখানে নায়করাই কাহিনীর মূল কেন্দ্র, আর আমরাও আজ পর্যন্ত এ সত্যকে মেনে নিতে পারিনি যে আমাদের যুগে সে ধরনের ইতিহাস সম্পূর্ণ অর্থহীন।
অন্যদিকে, বরদিনোর যুদ্ধ এবং তার পূর্ববর্তী শেভার্দিনোর যুদ্ধ কীভাবে হয়েছিল সে সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা আছে তা সুস্পষ্ট ও সুপরিচিত হলেও সম্পূর্ণ মিথ্যা। সব ইতিহাসকারই সে ঘটনার নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছে :
রুশ বাহিনী মোলেনস্ক থেকে পশ্চাদপসরণের পথে যুদ্ধের পক্ষে সবচাইতে উপযুক্ত একটা জায়গা খুঁজতে খুঁজতে সেটা পেয়ে গেল বরদিনোতে।
মস্কো থেকে স্মালেনস্ক যাবার বড় রাস্তার বাঁ দিকে এবং তার সঙ্গে সমকোণে অবস্থিত বরদিনো থেকে উতিৎসা যাবার পথের পাশে ঠিক সেই জায়গাটাকে আগে থেকেই সুরক্ষিত করে রাখল যেখানে পরে যুদ্ধটা হয়েছিল।
সেই ঘাঁটির ঠিক সামনে শত্রুপক্ষের উপর নজর রাখবার জন্য শেভার্দিনো স্তূপের উপর একটা সুরক্ষিত ফাঁড়ি গড়ে তোলা হল। ২৪ তারিখে নেপোলিয়ন সেই অগ্রবর্তী ঘাঁটিটাকে আক্রমণ করে দখল করে নিল এবং ২৬ তারিখে বরদিনো রণক্ষেত্রে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষারত গোটা রুশ বাহিনীকেই আক্রমণ করল।
ইতিহাস এই কথাই বলে, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল, আর প্রকৃত সত্য জানতে আগ্রহী যে কোনো লোক সহজেই সেটা বুঝতে পারে।
রুশরা কোনো ভালো ঘাঁটিরই খোঁজ করেনি, বরং পশ্চাদপসরণের পথে বরদিনোর চাইতে অনেক ভালো ভালো জায়গা পার হয়ে গিয়েছিল। তারা যে সেসব কোনো জায়গাতেই থামেনি তার অনেকগুলি কারণ : নিজের পছন্দ ছাড়া অন্য কোথাও ঘাঁটি তৈরির ইচ্ছা কুতুজভের ছিল না, জনসাধারণের যুদ্ধের দাবি তখনো যথেষ্ট জোরদার হয়ে প্রকাশ পায়নি, মিলোবাদভিচ তখনো অসামরিক বাহিনী নিয়ে এসে হাজির হয়নি, এরকম আরো অনেক কারণ ছিল। আসলে বরদিনোর ঘাঁটি (যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল) সুরক্ষিত তো ছিলই না, বরং তাকে একটা ঘাটিই বলা যায়নি, রুশ সাম্রাজ্যের মানচিত্রের বুকে বিনা ভাবনা-চিন্তায় যেখানে একটা পিন ফুটিয়ে দেওয়া যায় সেই স্থানটিকেই ঘাঁটি হিসেবে বারদিনোর চাইতে ভালো বলা যেতে পারে।
বরদিনোর রণক্ষেত্রে রুশরা যে কোনোরকম শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলেনি তাই শুধু নয়, ১৮১২-র ২৫ আগস্টের আগে তারা ভাবেইনি যে সেখানে একটা যুদ্ধ হতে পারে। নানা ঘটনা থেকেই এটা বোঝা যায়। প্রথমত, ২৫ তারিখের আগে সেখানে কোনো পরিখাই কাটা হয়নি, আর ২৫ তারিখে যেসব পরিখা কাটা শুরু করা হয়েছিল তাও শেষ করা হয়নি, দ্বিতীয়ত, শেভার্দিনো দুর্গের অবস্থান। যে স্থানটা যুদ্ধের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তার ঠিক সামনে ওরকম একটা দুর্গ গড়া একেবারেই অর্থহীন। অন্য সব ঘাঁটি থেকে সেটাকেই বা বেশি শক্তিশালী করা হয়েছিল কেন? ২৪ তারিখ গভীর রাত পর্যন্ত সেটাকে রক্ষা করতে গিয়ে কেন সব শক্তি নিঃশেষ করা হল? কেনই বা ছ হাজার সৈন্যকে বিসর্জন দেওয়া হল? শত্রুর উপর নজর রাখার জন্য একটা কক রক্ষীদলই তো যথেষ্ট ছিল। তৃতীয়ত, যুদ্ধটা কোথায় হবে সেটা যে আগে থেকে জানা ছিল না এবং শেভার্দিনো দুৰ্গটা যে অগ্রবর্তী ঘাঁটি ছিল না তার প্রমাণস্বরূপ আমরা জানি যে ২৫ তারিখ পর্যন্ত বার্কলে দ্য তলি এবং ব্যাগ্রেশনের ধারণা ছিল যে শেভার্দিনো দুর্গ ছিল সেই ঘাঁটির বাম ব্যুহ, আর যুদ্ধের পরে তাড়াতাড়িতে লিখিত প্রতিবেদনে কুতুজভ নিজেই বলেছে যে শেভার্দিনো দুর্গ ছিল ঘাঁটির বাম ব্যুহ। অনেককাল পরে যখন ধীরে সুস্থে অবসর সময়ে বরদিনো যুদ্ধের প্রতিবেদন লিখিত হল তখন (সম্ভবত অভ্রান্ত প্রধান সেনাপতির ভুল-ভ্রান্তিগুলিকে সমর্থন করার জন্যই) এই মর্মে অসত্য ও অসাধারণ বিবৃতিগুলি আবিষ্কার করা হল যে শেভার্দিনো দুর্গ ছিল একটা অগ্রবর্তী রণক্ষেত্রে, অথচ আসলে যুদ্ধটা হয়েছিল এমন একটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত জায়গায় যেখানে কোনোরকম পরিখাই ছিল না।
আসলে ব্যাপারটা ঘটেছিল এই রকম : কলোচা নদী সেখানে বড় রাস্তাটাকে কেটে বেরিয়েছে সমকোণে নয়, একটা সূক্ষ্ম কোণ সৃষ্টি করে–সেখানে কলোচা নদীর তীর বরাবর একটা জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছিল, ফলে ঘাঁটির বাম ব্যুহ ছিল শেভার্দিনোতে, দক্ষিণ ব্যুহ ছিল নভু নামক একটা গ্রামের কাছে, আর কেন্দ্র ছিল কলোচা ও ভয়না-নদীর সঙ্গমস্থলে বরদিনোতে।
২৪ তারিখে অশ্বারোহণে ভালুভো-র দিকে যেতে যেতে উতিসা থেকে বরদিনো পর্যন্ত কোথাও রুশদের কোনো ঘাঁটি নেপোলিয়নের চোখে পড়েনি (ইতিহাসের বইতে অবশ্য লেখা হয়েছে যে নেপোলিয়ন তা দেখেছিল), বা কোনো অগ্রবর্তী ঘাটিও সে দেখেনি (দেখা সম্ভব নয় কারণ তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না), কিন্তু পশ্চাত্বর্তী রুশ বাহিনীকে অনুসরণ করে নেপোলিয়ন শেভার্দিনো দুর্গে রুশ ঘাঁটির বাম ব্যূহের সামনে। এসে পড়ে এবং রুশদের পক্ষে একান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে কলোচা নদীর তীর বরাবর সৈন্যদের পরিচালিত করে। এদিকে একটা যুদ্ধ শুরু করবার মতো সময় হাতে না থাকায় রুশরা তাদের বাম ব্যুহটাকে সরিয়ে নিয়ে এমন একটা জায়গায় ঘাটি করল যেটা আগে ভাবাই হয়নি এবং ফলে যেখানে কোনোরকম রক্ষা-ব্যবস্থাই ছিল না। কলোচা নদী পার হয়ে বড় রাস্তার বাঁ দিকে পৌঁছে নেপোলিয়ন আসন্ন যুদ্ধটাকেই ডান দিক থেকে বাঁ দিকে (রুশদের দৃষ্টিকোণ থেকে) সরিয়ে উতিৎসা, সেমেনভঙ্ক ও বরদিনোর মধ্যবর্তী এমন একটা প্রান্তরে নিয়ে গেল-রণক্ষেত্র হিসেবে যেটা রাশিয়ার অন্য যে কোনো প্রান্তরের চাইতে সুবিধাজনক কিছু নয়-এবং সেখানেই ২৬ তারিখের পুরো যুদ্ধটা হল। যে যুদ্ধের কথা ভাবা হয়েছিল এবং বাস্তবক্ষেত্রে যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল তার একটা রেখা-চিত্র সংযোজিত হল।
