নিকলাস বসেছে জুলি কারাগিনের পাশে, সোনিয়ার কিছুটা দূরে। সোনিয়ার মুখে হাসি থাকলেও স্পষ্টই বোঝা যায় যে সে ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরছে; এই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, এই লাল হচ্ছে; নিকলাস ও জুলি কী কথা বলছে তা শোনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। গভর্নেস অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকাচ্ছে, যেন ছেলেমেয়েদের প্রতি কোনোরকম তাচ্ছিল্য দেখলেই প্রতিবাদ করবে। জার্মান গৃহশিক্ষকটি সবরকম খাবার ও মদের নাম মনে রাখতে চেষ্টা করছে যাতে জার্মানিতে তার লোকজনের কাছে এই নৈশভোজের একটা পূর্ণ বিবরণ পাঠাতে পারে। তাই খানসামা যখন একটা বোতলকে তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে তার পাশ দিয়ে চলে গেল তখন তার খুব রাগ হল। সে চোখ কুঁচকাল; যেন বোঝাতে চাইল যে, কোনো মদের প্রতিই তার লোভ নেই; কিন্তু তৃষ্ণা মেটাবার জন্য বা লোভের জন্য যে সে মদ চাইছে না, চাইছে শুধু জ্ঞানলাভের জন্য–এটা কেউ বুঝল না দেখে সে খুব মর্মাহত হল।
*
অধ্যায়-১৯
পুরুষদের টেবিলের আলোচনা ক্রমেই জোরদার হয়ে চলেছে। কর্নেল বলল, যুদ্ধের ঘোষণা ইতিমধ্যেই পিটার্সবুর্গে বেরিয়ে গেছে, তার একটা কপি সে নিজে দেখেছে, কারণ সেইদিনই সংবাদবাহক সেটা এনে প্রধান সেনাপতিকে দিয়েছে।
শিনশিন বলল, কিন্তু আমরা বোনাপার্তের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি কিসের জন্য? অস্ট্রিয়ার বকবকানি সে থামিয়েছে; আমার তো ভয় হয় এরপরই আমাদের পালা আসবে।
কর্নেল লোকটি শক্ত-সমর্থ, লম্বা রক্তবহুল জার্মান; চাকরির প্রতি অনুরক্ত, রুশ দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত। সে শিনশিনের মন্তব্যের প্রতিবাদ করল।
জার্মান উচ্চারণে সে বলে উঠল, দেখুন মশাই, তার কারণটা সম্রাট ভালোই জানেন। ইস্তাহারে তিনি পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন যে, রাশিয়ায় সামনে, সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও মর্যাদা এবং মিত্রশক্তির পবিত্রতার সামনে যে বিপদ আসন্ন হয়ে উঠেছে তাকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না।
তারপর যে অভ্রান্ত সরকারি স্মৃতিশক্তি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তার উপর নির্ভর করে সে ইস্তাহারের মুখবন্ধ হতে আবৃত্তি করতে শুরু করল :
…সুদৃঢ় ভিত্তির উপর ইওরোপের শান্তিকে প্রতিষ্ঠিত করবার যে বাসনা ম্রাটের একমাত্র নিঃশর্ত লক্ষ্য তারই নির্দেশে তিনি স্থির করেছেন যে সৈন্যবাহিনীর একটি অংশকে বিদেশে পাঠাবেন এবং সেই লক্ষ্য পূরণের অনুকূল একটি নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন।
মর্যাদাসহকারে এক পাত্র মদ খেয়ে কাউন্টের সমর্থনের আশায় তার দিকে তাকিয়ে সে তার বক্তব্য শেষ করল, জানেন মশাই, এই কারণেই….
শিনশিন ভুরু কুঁচকে হেসে বলল, জেরোম, জেরোম, বৃথাই ঘোরা, বাড়িতে বসে চরকা ঘোরা–এই প্রবাদটি জানেন কি? ঐ বাক্যটিই আমাদের পক্ষে মোক্ষম খাঁটি। সুভরভের কথাই ধরুন–তার কি কাজ সে তো ভালোই জানত, কিন্তু তারা তো তাকে মেরে একেবারে তক্তা বানিয়ে দিল। আমি শুধু সেই কথাটাই আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি। লোকটি অনবরত একবার ফরাসি ও একবার রুশ ভাষার খিচুড়ি বানিয়ে কথাগুলি বলল।
টেবিলের উপর একথা থাপ্পড় বসিয়ে কর্নেল বলল, আমাদের বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও আমরা যুদ্ধ করব; সম্রাটের জন্য আমরা জীবন দেব, তবেই মঙ্গল হবে; আর এ নিয়ে যথাসম্ভব কম আলোচনা করব। আমরা প্রবীণ হুজাররা এই দৃষ্টিতেই ব্যাপারটাকে দেখছি, আর এটাই শেষ কথা। তারপর নিকলাসের দিকে ফিরে সে বলল, আর তুমি তো একজন যুবক, একজন তরুণ হুজার, এ বিষয়ে তোমার কি মত?
নিকলাস জবাব দিল, আপনার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা রুশ দেশের মানুষরা হয় মরব, নয় জয় করব।
জুলি বলল, চমৎকার বলেছ তুমি!
নিকলাসের কথাগুলি শুনে সোনিয়ার সারা শরীর কাঁপতে লাগল; তার কান থেকে গলা ও কাঁধ পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল।
পিয়ের কর্নেলের কথাগুলি মন দিয়ে শুনল; সমর্থন-সূচক ঘাড় নেড়ে বলল, সুন্দর।
আর একবার টেবিলে থাপ্পর মেরে কর্নেল বণে উঠল, এই যুবক একজন সত্যিকারের হুজার!
হঠাৎ টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার গম্ভীর গলা শোনা গেল : ওদিকে আপনারা কি নিয়ে এত সোরগোল তুলেছেন? এমনভাবে টেবিল চাপড়াচ্ছে কেন? এতটা উত্তেজিতই বা হচ্ছেন কেন? আপনারা কি মনে করছেন যে ফরাসিরা এখানে পৌঁছে গেছে?
হুজার হেসে জবাব দিল, আমি সত্য কথাই বলছি।
কাউন্ট গলা চড়িয়ে বলল, যুদ্ধের কথা হচ্ছে। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা, আপনি কি জানেন যে আমার ছেলে যুদ্ধে যাচ্ছে? আমার ছেলে যাচ্ছে।
আমার চার ছেলে সেনাদলে আছে, কিন্তু আমি তো চেঁচাচ্ছি না। সবই ঈশ্বরের হাতে। আপনি বিছানায় শুয়েই মারা যেতে পারেন, আবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকেও ঈশ্বর আপনাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা গম্ভীর গলায় কথাগুলি বলল; টেবিলের সকলেই তার দিকে হেলে পড়ল।
ঠিক কথা!
আলোচনা আবার জমে উঠল; মহিলারা এক প্রান্তে, পুরুষরা অন্য প্রান্তে।
নাতাশার ছোট ভাইটি বলল, তুমি চেয়ো না; আমি জানি, তুমি চাইবে না!
আমি চাইব, নাতাশা জবাব দিল।
বিবেচনাহীন ও সানন্দ দৃঢ়তায় তার মুখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। অর্ধেক দাঁড়িয়ে চোখের ইশারায় পিয়েরকে তার কথা মন দিয়ে শুনবার নির্দেশ জানিয়ে সে মার দিকে ফিরে সরবে ডাকল : মামণি!
