বাড়ি পৌঁছেই পিয়ের বড় কোচয়ান এভস্তাফেকে হুকুম করল, সেই রাতেই সে মোঝায়েস্কে সেনাদলে যোগ দিতে যাত্রা করবে, কাজেই তার ঘোড়াগুলোকে যেন সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এভস্তাফে যখন জানাল যে একটা দিনের মধ্যে এতসব ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, তখন সে বাধ্য হয়ে পরের দিন পর্যন্ত যাত্রা স্থগিত রাখল।
একটানা বৃষ্টির পরে ২৪ তারিখে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। ডিনারের পরে পিয়ের মস্কো ত্যাগ করল। সেদিন রাতে পেশকভোতে ঘোড়া বদল করবার সময় সে জানতে পারল, সেদিন সন্ধ্যায়ই সেখানে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হয়ে গেছে। (এটাই শেভার্দিনোর যুদ্ধ।) তাকে বলা হল, গোলাবর্ষণের ফলে পেশকভোর মাটি কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু যুদ্ধে কে জিতেছে এ-প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারল না। পরদিন ভোরেই পিয়ের মোঝায়েস্কের কাছে পৌঁছে গেল।
মোকায়েস্কের প্রতিটা বাড়িতেই সৈন্যরা আস্তানা পেতেছে, যে হোস্টেলে তার সহিস ও কোচয়ানের সঙ্গে পিয়েরের দেখা হল সেখানে একটা ঘরও পাওয়া গেল না। সব ঘরই অফিসারে ভর্তি।
মোঝায়েঙ্কে এবং তাকে ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত সৈন্যরা হয় আস্তানা পেতেছে, নয়তো চলাচল করছে। সর্বত্র চোখে পড়ছে পদাতিক ও অশ্বারোহী কসাক, মালগাড়ি, বারুদের গাড়ি আর কামান। পিয়ের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগিয়ে চলল, মস্কো যত দূরে সরে যেতে লাগল ততই সে যেন ডুবে যেতে লাগল সেনা সমুদ্রে, আর ততই এমন একটা অশান্ত উত্তেজনা ও সানন্দ অনুভূতি তার মনে জাগতে লাগল যার অভিজ্ঞতা আগে কখনো তার হয়নি। সম্রাটের পরিদর্শনকালে বোদা প্রাসাদে যে অনুভূতি তার হয়েছিল এখনকার অনুভূতি ঠিক তারই অনুরূপ কোনো কিছু করার এবং কোনো কিছু ত্যাগ করার অনিবার্য প্রয়োজনের অনুভূতি। তার মনে এই সানন্দ চেতনা জাগল যে মানুষের সুখের যত কিছু উপকরণ-জীবনের আরাম, অর্থ, এমন কি জীবনটা পর্যন্ত–সবই তুচ্ছ, এমন কিছু আছে যার তুলনায় এসব কিছু ছুঁড়ে ফেলাও আনন্দের…কিন্তু সেটা কি? সেকথা পিয়ের বলতে পারল না, কার জন্য এবং কিসের জন্য সবকিছু ত্যাগ করাতে এই আনন্দ সেটা বুঝতেও সে চেষ্টা করল না। কিসের জন্য এই ত্যাগ স্বীকার সে প্রশ্ন তার মনেই এল না, ত্যাগটাই তাকে এনে দিল সম্পূর্ণ নতুন এক আনন্দময় অনুভূতি।
.
অধ্যায়–১৯
২৪ আগস্ট হল শেভার্দিনো দুর্গের যুদ্ধ, ২৫ তারিখে কোনো পক্ষ থেকেই একটিও গুলিবর্ষণ করা হল না, আর ২৬ তারিখে হল বরদিনোর যুদ্ধ।
শেভার্দিনো আর বরদিনোতে কেন যুদ্ধ করা হল, আর কেমন করেই বা সেটা ঘটল? বরদিনের যুদ্ধটাই বা হল কেন? ফরাসি বা রুশ কারো দিক থেকেই এ যুদ্ধের কোনো সঙ্গত কারণ ছিল না। রুশদের পক্ষে এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল হল–আর সেটাই হতে বাধ্য-মস্কো ধ্বংস হওয়ার আরো কাছাকাছি আমরা এসে পড়লাম, অথচ পৃথিবীতে সেটাকেই আমরা ভয় করেছি সবচাইতে বেশি, আবার ফরাসিদের পক্ষে এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল হল, তাদের গোটা বাহিনীর ধ্বংসের আরো কাছাকাছি তারা এসে পড়ল–অথচ পৃথিবীতে সেটাকেই তারাও ভয় করেছে সবচাইতে বেশি। ফল যে কি হবে তা জানাই ছিল, তবু নেপোলিয়ন সে যুদ্ধে এগিয়ে এল, আর কুতুজভ সে যুদ্ধের আহ্বানকে গ্রহণ করল।
দুই সেনাপতি যদি মুক্তির দ্বারা পরিচালিত হত তাহলে নেপোলিয়নের পরিষ্কার বোঝা উচিত ছিল যে তেরোশো মাইল ভিতরে ঢুকে মোট সৈন্যের এক-চতুর্থাংশকে হারাবার সম্ভাবনা নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে সে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকেই এগিয়ে চলেছে, আবার কুতুজভেরও সমান পরিষ্কারভাবে বোঝা উচিত ছিল যে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এক-চতুর্থাংশ সৈন্য হারাবার ঝুঁকি নিলে সেও নিশ্চিতভাবেই মঙ্কোকে হারাবে। কুতুজভের কাছে এটা তো গাণিতিক হিসেবের মতোই পরিষ্কার, যেমন ড্রাফটস খেলায় (একরকম দাবা খেলা) আমার যদি একটা খুঁটি কম থাকে এবং তারপরেও আমি যদি ক্রমাগত খুঁটি পাল্টা-পাল্টি করি তাহলে শেষ পর্যন্ত আমার হার হবেই, আর তাই পাল্টা-পাল্টি করা আমার পক্ষে উচিত নয়। যখন প্রতিপক্ষের আছে মোলোটি খুঁটি আর আমার আছে চৌদ্দটি, তখন তার তুলনায় আমার দুর্বলতা আট ভাগের এক ভাগ, কিন্তু আমি যদি আরো তেরোটি খুঁটি বদল করি, তাহলে সে হবে আমার চাইতে তিনগুণ বেশি শক্তিশালী।
বরদিনো যুদ্ধের আগে ফরাসিদের তুলনায় আমাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল মোটামুটি ছয়জনে পাঁচজন, কিন্তু ঐ যুদ্ধের পরে সেটা দাঁড়াল দুজনে একজন : অর্থাৎ যুদ্ধের আগে আমাদের সৈন্য ছিল একশ বিশ হাজারের বিরুদ্ধে একশো হাজার এবং যুদ্ধের পরে সেটা দাঁড়াল একশ হাজারের বিরুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার। তথাপি অভিজ্ঞ, ঝানু কুতুজভ সে যুদ্ধকে গ্রহণ করল, আর প্রতিভাদীপ্ত সেনাপতি বলে বর্ণিত নেপোলিয়ন সেই যুদ্ধ করে হারাল এক-চতুর্থাংশ সৈন্য এবং তার যোগাযোগ ব্যবস্থা হল আরো অনেক বেশি দীর্ঘ। বলা হয়ে থাকে, ভিয়েনা দখল করেই যেভাবে আগেকার অভিযানে ইতি টানা হয়েছিল, ঠিক সেইভাবে মস্কো দখল করেই এ অভিযানকে শেষ করার ইচ্ছাই নেপোলিয়নের ছিল। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ অন্য কথাই বলে। নেপোলিয়নের ইতিহাসকাররা নিজেরাই বলেছে, স্মোলেনস্ক পার হবার পর থেকেই নেপোলিয়ন থামতে চেয়েছে, যুদ্ধের পরিধি ব্যাপকতর করার বিপদ সম্পর্কে সে অবহিত ছিল, সে জানত যে মস্কো দখল করলেই অভিযান শেষ হবে না, কারণ স্মোলেনস্ক-এর বেলায়ই তো দেখেছে কীভাবে রুশ শহরগুলিকে তার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বারবার সন্ধির আলোচনার কথা ঘোষণা করা সত্ত্বেও রুশদের পক্ষ থেকে কোনোরকম সাড়া পাওয়া যায়নি।
