প্রিন্সেস বিদ্বেষভরা গলায় বলল, ওঃ, তোমাদের সেই কাউন্ট তো! সে তো একটা ভণ্ড, সেই তো লোকদের দিয়ে দাঙ্গা বাধিয়েছে। এইসব বাজে ইস্তাহারে সে কি একথা লেখেনি যে সে যেই হোক চুলের মুঠি ধরে তাকে হাজতে নিয়ে যেতে হবে? (কী বোকার মতো কথা!) আর তাকে যে গ্রেপ্তার করবে তাকে দেওয়া হবে সম্মান ও গৌরব। তার চাটুবাদই তো আমাদের এত নিচে টেনে নামিয়েছে। বারবারা আইভানভনা আমাকে বলেছে, সে ফরাসিতে কিছু বলেছিল বলে উখল জনতা তাকে প্রায় খুন করে ফেলেছিল।
ওঃ, কিন্তু অবস্থা তো…তুমি সবকিছুতেই এত ভেঙে পড়, এই কথা বলে পিয়ের পেশেন্স খেলায় মন দিল।
খেলাটা না মিললেও পিয়ের সেনাদলে যোগ দিতে গেল না, সেই একই উত্তেজিত, অস্থিরচিত্ত, শঙ্কিত মনেই জনবিরল পরিত্যক্ত মস্কোতে রয়ে গেল, একটা ভয়ংকর কিছুর সানন্দ প্রতীক্ষায় দিন কাটাতে লাগল।
পরদিন সন্ধ্যায় প্রিন্সেস রওনা হয়ে গেল। বড় নায়েব এসে খবর দিল, একটা জমিদারি না বেচলে তার রেজিমেন্টের সাজ-সরঞ্জাম কেনার পয়সা জুটবে না। সে পরিষ্কার করেই জানিয়ে দিল যে একটা রেজিমেন্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনাই তার সর্বনাশ ডেকে আনবে। পিয়ের কান পেতে শুনল, তবু ঠোঁটের হাসিটা চাপতে পারল না।
বলল, বেশ তো, বেচে দিন। কি আর করা যাবে? এখন তো আর কথা ফেরানো চলে না!
অবস্থা যত খারাপ হতে লাগল, বিশেষ করে তার নিজের অবস্থা, পিয়ের যেন ততই খুশি হয়ে উঠল : ততই সে যেন নিশ্চিত হল যে তার প্রত্যাশিত বিপদটি আসন্ন হয়ে উঠেছে। তার পরিচিত কেউই শহরে নেই। জুলি চলে গেছে, প্রিন্সেস মারিও। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে আছে শুধু রস্তভরা, কিন্তু সে তাদের সঙ্গে দেখা করতেও যায় না।
মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নেবার জন্য একদিন সে ভরশোভো গ্রামে গেল, শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য সেখানে লেপপিচ নামক যে বড় বেলুনটা তৈরি হচ্ছে সেটা দেখতে এবং পরদিন যে পরীক্ষামূলক ওড়ানো হবে সেটাও দেখতে। বেলুন তৈরি এখনো শেষ হয়নি, পিয়ের শুনল যে সম্রাটের ইচ্ছানুসারেই সেটা তৈরি হচ্ছে। সম্রাট কাউন্ট রস্তপচিনকে লিখেছে :
লেপপিচ প্রস্তুত হওয়া মাত্রই তার গাড়ির জন্য একদল নির্ভরযোগ্য বুদ্ধিমান লোক যোগাড় করবেন এবং জেনারেল কুতুজভকে খবরটা জানাতে একজন সংবাদবাহককে তার কাছে পাঠাবেন। আমি তাকে ব্যাপারটা জানিয়েছি।
লেপপিচ প্রথম কোথায় অবতরণ করবে সে বিষয়ে যেন সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়, সেটা যেন ভুল করে শত্রুর হাতে না পড়ে। প্রধান সেনাপতির গতিবিধির সঙ্গে তার গতিবিধির মিল থাকা একান্ত দরকার।
ভরন্তশোভো থেকে বাড়ি ফিরবার পথে বলোত্মপ্লেসের পাশ দিয়ে যাবার সময় পিয়ের দেখল লোবনু প্লেসে (মস্কোর মৃত্যুদণ্ড দেবার জায়গা, সেকালে জায়গাটি ছিল ক্রেমলিনের সম্মুখবর্তী রেড স্কোয়ারে। অনেক লোকের ভিড় জমেছে। সে গাড়ি থামিয়ে সেখানেই নেমে পড়ল। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একজন রাঁধুনিকে চাবুক মারা হচ্ছে। দণ্ডদান শেষ করে জল্লাদ সেই শক্ত-সমর্থ লোকটির বাঁধন খুলে দিচ্ছে। লোকটির মুখে লাল গোঁফ, পরনে নীল মোজা ও সবুজ কুর্তা। সে করুণ স্বরে আর্তনাদ করছে। শুকনো, বিবর্ণ অপর অপরাধী কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখেই বোঝা যায়, দুইজনই ফরাসি।
শুটকো ফরাসি লোকটির মুখের মতো ভয়ার্ত, যন্ত্রণাদীর্ণ ভাব ফুটে উঠল পিয়েরের মুখে। ভিড় ঠেলে অগ্রসর হতে হতে সে প্রশ্ন করতে লাগল : কি হয়েছে? লোকটি কে? কেন এই শাস্তি?
ভিড়ের মধ্যে সমবেত ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকল ধরনের মানুষই তখন লোবনু প্লেস-এর কার্যকলাপ দেখতে এতই ব্যস্ত যে কেউ তার প্রশ্নের জবাব দিল না। শক্ত-সমর্থ লোকটি উঠে দাঁড়াল, ভুরু কুঁচকাল, কোনোদিকে না তাকিয়ে গায়ের কুর্তাটা খুলতে লাগল, তার পরেই হঠাৎ তার ঠোঁট দুটি কাঁপতে লাগল, সে কাঁদতে শুরু করল। ভিড়ের মানুষরা এতক্ষণে গলা ছেড়ে কথা বলতে লাগল, পিয়েরের মনে হল, নিজেদের করুণার অনুভূতিকে চাপা দেবার জন্যই তারা এমন করছে।
লোকটা কোনো প্রিন্সের রাঁধুনি।
আর সিয়, রুশ সজি ফরাসিদের জিভে টকই লাগে।…একেবারে দাঁতে দাঁত লেগে গেছে! পিছন থেকে একজন করণিক বলে উঠল।
তার কথা শুনে কেউ কেউ হাসল, কেউবা জল্লাদের দিকেই তাকিয়ে থাকল।
পিয়েরের গলা বন্ধ হয়ে আসছে, মুখ কুঁচকে গেছে, তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে গাড়িতে চাপল। যেতে যেতেই তার শরীর শিউরে উঠতে লাগল, আপন মনেই বারকয়েক এত জোরে কথা বলল যে কোচয়ান জিজ্ঞাসা করল, কিছু বলছেন হুজুর?
কোচয়ানকে লুবিয়াংকা স্ট্রিট ধরে গাড়ি চালাতে দেখে পিয়ের চিৎকার করে বলল, কোথায় চলেছ?
আপনার হুকুম মতো শাসনকর্তার বাড়িতে, কোচয়ান বলল।
মূর্খ! নির্বোধ! পিয়ের চিৎকার করে কোচয়ানকে বকুনি দিল-একাজটা সে কদাচিৎ করে থাকে। তোমাকে তো বলেছি বাড়ি যেতে! আরো জোরে চালাও, মাথামোটা কোথাকার! নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, আজই আমি চলে যাব।
লোব প্লেসে নির্যাতিত ফরাসিটিকে ও ভিড়ের লোকগুলিকে দেখে পিয়ের এতই স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সে আর একদণ্ডও এখানে থাকবে না। সেইদিনই সেনাদলে যোগ দিতে যাত্রা করবে, যেন তার মনে হল হয় সে নিজেই কোচয়ানকে সেকথা বলেছে, অথবা নিজের থেকেই সেটা বুঝতে পারা কোচয়ানের উচিত ছিল।
