কোন ধরনের নাইট? আপনি কি বলতে চাইছেন? সলজ্জ ভঙ্গিতে পিয়ের শুধাল।
ঠিক আছে কাউন্ট, ঠিক আছে। আপনি তো সবই জানেন!
আমি কিছু জানি না, পিয়ের বলল।
আমি জানি নাতালির সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব ছিল, আর তাই…কিন্তু আমার বন্ধুত্ব ছিল ভেরার সঙ্গে-আদরের ভেরা।
অসন্তোষভরা গলায় পিয়ের বলতে লাগল, না মাদাম, নাতালি রস্তভার নাইটের ভূমিকা আমি কখনো গ্রহণ করিনি, আর প্রায় এক মাস তাদের বাড়িতেও যাইনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি না এই নিষ্ঠুরতা…
কৈফিয়ৎ দেওয়া মানেই দোষ স্বীকার করা। জুলি হাত নেড়ে হেসে বলল। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে শেষ কথাটি বলল, আর আজ কি শুনে এসেছি জানেন? বেচারি মারি বলকনস্কায়া গতকাল মস্কো এসেছেন। আপনি কি জানেন তিনি বাবাকে হারিয়েছেন?
সত্যি? তিনি কোথায় আছেন? তার সঙ্গে একবার অবশ্য দেখা করতে হবে, পিয়ের বলল।
গতকাল সন্ধ্যাবেলাটা তার সঙ্গেই কাটিয়েছি। আজ বা কাল সকালেই ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারিতে যাবেন।
আচ্ছা, তিনি কেমন আছেন? পিয়ের শুধাল।
ভালোই আছেন, তবে মন খারাপ। কিন্তু জানেন কি কে তাকে উদ্ধার করেছে। সে এক রোমান্টিক ব্যাপার। নিকলাস রস্তভ। সকলে তাকে ঘিরে ধরেছিল, খুনই করে ফেলত, তার কিছু লোক আহতও হয়েছে। নিকলাস রস্তভ ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেছে।…
বেসরকারি অফিসারটি বলল, আবার একটা রোমাঞ্চ। সত্যি, এই সঠিক পলায়নের সুযোগ সব বয়স্ক কুমারীদেরই বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। এদিকে কাতিচে, আর ওদিকে প্রিন্সেস বলকনস্কায়া।
আপনি কি জানেন, আমার কিন্তু বিশ্বাস তিনি এই যুবকের কিঞ্চিৎ প্রেমে পড়েছেন?
আবার ফরাসি ভাষা? জরিমানা দিন!
কিন্তু একথা কি রুশ ভাষায় বলা যায়?
.
অধ্যায়-১৮
পিয়ের বাড়ি ফিরলেই সেদিনের আনা রস্তপচিনের দুখানা ইস্তাহার তার হাতে দেওয়া হল।
প্রথম ইস্তাহারে বলা হয়েছে, কাউন্ট রস্তপচিন জনসাধারণকে মস্কো ত্যাগ করতে নিষেধ করেছে বলে যে খবর রটেছে সেটা মিথ্যা, বরং মহিলারা ও ব্যবসায়ীদের স্ত্রীরা শহর ছেড়ে চলে যাওয়ায় সে খুশিই হয়েছে। ইস্তাহারে বলা হয়েছে, এবার ত্রাস কমে যাবে, গুজবও কম ছড়াবে, কিন্তু আমার জীবনটাকে পণ রেখে বলছি, সেই শয়তান কোনোদিনই মস্কোতে প্রবেশ করতে পারবে না। এই কথাগুলি থেকেই পিয়ের সর্বপ্রথম পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারল যে ফরাসিরা মস্কোতে ঢুকবে। দ্বিতীয় ইস্তাহারে বলা হয়েছে, আমাদের প্রধান ঘাঁটি ভিয়াজমাতে সরিয়ে আনা হয়েছে, কাউন্ট উইগেনস্তিন ফরাসিদের হটিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মস্কোর অনেক বাসিন্দাই অসিজ্জত হতে ইচ্ছুক, তাই রাজকীয় অস্ত্রাগারে তাদের জন্য সবরকম অস্ত্র-শস্ত্র মজুত রাখা হয়েছে : তলোয়ার, পিস্তল, বন্দুক সবই কম দামে পাওয়া যাবে। পিয়ের দুটো ইস্তাহার নিয়েই কিছুক্ষণ ভাবল। যে ভয়ংকর ঝড়ো মেঘকে সে সর্বান্তঃকরণে কামনা করছিল সেটা আসন্ন হয়ে উঠেছে।
আমি কি সেনাদলে চাকরি নেব, না অপেক্ষা করব? শততম বারের জন্য সে নিজেকে প্রশ্নটা করল। টেবিলের উপর থেকে তাসের প্যাকেটটা নিয়ে পেশেন্স খেলার আয়োজন করল।
তাসগুলো বেটে হাতে নিয়ে মাথাটা তুলে ভাবল, পেশেন্স খেলাটা যদি মিলে যায় তাহলে বুঝব…কি বুঝব?
এ প্রশ্নের কোনো মীমাংসা করার আগেই বড় প্রিন্সেস দরোজায় দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, সে ঘরে ঢুকতে পারে কি না।
তাহলে বুঝব যে আমাকে সেনাদলে যেতেই হবে, নিজের মনে কথাটা বলে সে প্রিন্সেসের উদ্দেশ্যে বলল, এস, এস।
একমাত্র বড় প্রিন্সেসই এখনো পিয়েরের বাড়িতে বাস করছে। উত্তেজিত গলায় সে বলল, তোমার কাছে আসার জন্য আমাকে ক্ষমা কর। তুমি তো জান, একটা সিদ্ধান্তে আসতেই হবে। কি ঘটবে কে জানে? সকলেই মস্কো ছেড়ে চলে গেছে। লোকজনরা দাঙ্গা শুরু করেছে। অথচ আমরা এখনো এখানেই বসে আছি কেন?
ঈষৎ ঠাট্টার সুরে পিয়ের বলল, বরং সবকিছু তো ভালোই মনে হচ্ছে দিদি।
ভালোই বটে! খুব ভালো। আমাদের সৈন্যরা যা খেল দেখাচ্ছে সেকথা বারবারা আইভানভনা আজই আমাকে বলেছে। এসবই নিশ্চয় তাদের কৃতিত্বের পরিচায়ক। এদিকে লোকজনরা তো বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে-কেউ কথা শুনছে না, আমার দাসীটি পর্যন্ত রুক্ষ ব্যবহার শুরু করেছে। এরকম চলতে থাকলে অচিরেই তারা আমাদের মার লাগাতে শুরু করবে। রাস্তায় পর্যন্ত বের হওয়া যাচ্ছে না। সবচাইতে বড় কথা, ফরাসিরা যে কোনোদিন এখানে এসে হাজির হবে, তাহলে আমরা এখানে অপেক্ষা করে আছি কিসের জন্য? তোমার কাছে আমার একটিই অনুরোধ ভাই, আমার পিতার্সবুর্গ যাবার ব্যবস্থা করে দাও। আমি যেই হই না কেন, বোনাপার্তের শাসনাধীনে বাঁচতে চাই না।
আহা, আমার কথাটাই শোন দিদি। এসব খবর তুমি কোথায় পেলে? বরং…।
নেপোলিয়নের বশ্যতা আমি স্বীকার করব না! অন্যরা যা খুশি করুক…তুমি যদি ব্যবস্থা করে দিতে না চাও…
ব্যবস্থা অবশ্যই করব, এই মুহূর্তে হুকুম দিচ্ছি।
রাগ দেখাবার মতো কাউকে না পাওয়াই যেন প্রিন্সেসের রাগের কারণ। নিজের মনে বিড় বিড় করতে করতে সে একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
পিয়ের বলতে লাগল, কিন্তু তুমি ভুল খবর পেয়েছ। শহর এখন খুব শান্ত, তিলমাত্র বিপদ কোথাও নেই। শোন! এইমাত্র পড়ছিলাম… সে ইস্তাহারটা দেখাল। কাউন্ট রস্তপচিন লিখেছেন, শত্রু যাতে মস্কোতে ঢুকতে না পারে সেজন্য তার জীবনটাই তিনি পণ রাখছেন।
