আর একবার প্রিন্স আন্দ্রুকে আলিঙ্গন করে তাকে চুমো খেল, কিন্তু সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই কুতুজভ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অসমাপ্ত উপন্যাস মাদাম দ্য জেলিস-এর লে শেভালিয়ে দু সাই নে তে মনোনিবেশ করল।
এটা কেমন করে ঘটল বা কেন ঘটল তা বুঝিয়ে বলতে না পারলেও কুতুজভের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে প্রিন্স আন্দ্রু এই নিশ্চিত ধারণা নিয়ে রেজিমেন্টে ফিরে গেল-যে লোকটির উপর সব ভার পড়েছে সে যোগ্য লোক। সে ভাবল, তিনি নিজের কোনো পরিকল্পনা উপস্থিত করবেন না। কোনো উপায় উদ্ভাবন করবেন না অথবা সেইভাবে কাজও করবেন না। কিন্তু তিনি সব কথা শুনবেন, সব কথা মনে রাখবেন, সবকিছুকেই যথাযোগ্য স্থানে রাখবেন। কোনো দরকারি কাজে বাধা দেবেন না, আবার কোনো ক্ষতিও হতে দেবেন না। তিনি জানেন যে তার নিজের ইচ্ছার চাইতে শক্তিশালী ও গুরুতর কিছু আছে–ঘটনার অনিবার্য গতি, সে গতিকে তিনি বুঝতে পারেন, তার তাৎপর্যকে ধরতে পারেন, এবং ধরতে পারেন বলেই তাতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকেন।…সবচাইতে বড় কথা, জেঁলিসের উপন্যাস ও ফরাসি প্রবাদ সত্ত্বেও তিনি রুশ বলে লোকে তাকে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে তার আরো কারণ তিনি যখন বললেন : আমাদের ওরা কোথায় নিয়ে এসেছে! তখন তার গলা কাঁপছিল, আর যখন তিনি বললেন : তাদেরও ঘোড়ার মাংস খাইয়ে ছাড়ব! তখনো তাঁর গলা কান্নায় ভিজে উঠেছিল।
এই অনুভূতি কম-বেশি প্রায় সকলেরই, তাই দরবারি প্রভাব সত্ত্বেও সর্বসম্মত সাধারণ স্বীকৃতির সঙ্গেই প্রধান সেনাপতি পদে কুতুজভের নির্বাচনকে গ্রহণ করা হয়েছে।
.
অধ্যায়-১৭
সম্রাট মস্কো থেকে চলে যাবার পরে সেখানকার জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক খাতেই বইতে শুরু করেছে, আর সেটা এত বেশি স্বাভাবিক যে সম্প্রতি যে দেশপ্রেমের এতবড় একটা উম্মস ও উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল আজ সেটা মনে করাই শক্ত হয়ে উঠেছে, একথা বিশ্বাস করাও আজ শক্ত যে রাশিয়া আজ সত্য সত্যই বিপন্ন, আর ইংলিশ ক্লাবের সদস্যরা সকলেই দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত পিতৃভূমির সম্মানে। শুধু একটা ক্ষেত্রে দেশপ্রেমের উন্মাদনা সমান তালেই চলতে লাগল, সেটা হল, সৈন্য ও অর্থ সরবরাহের আহ্বান, যে মুহূর্তে সেইসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তখন থেকেই সেটা আইনগত সরকারি রূপ নিয়ে অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
শত্রু যতই মস্কোর দিকে এগিয়ে আসছে, আসন্ন বিপদ সম্পর্কে মস্কোপন্থীদের হেলাফেলার ভাবটা ততই যেন বেড়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের ইস্তাহার ছাপিয়ে ফরাসিদের সম্পর্কে হাল্কা রসিকতা করা হয়েছে, আর ক্লাবে রেস্তোরাঁতে তাই নিয়ে সরস আলোচনা চলছে। ইংলিশ ক্লাবের কোণের ঘরটাতে সদস্যরা তেমনি একটি ইস্তাহার পড়ে শোনাচ্ছে। রস্তপচিনের ইস্তাহারে জনৈক রুশ নাগরিক ফরাসিদের ঠাট্টা করে বলছে : রাশিয়ার বাঁধাকপি খেয়ে তাদের পেট মোটা হবে, তাদের যবের পরিজ খেয়ে পেট ফাটবে, আর বাঁধাকপির ঝোল খেয়ে দম বন্ধ হবে। তারা তো সব বেঁটে-বামন, একটা চাষী মেয়েই খড়ের কাঁটা দিয়ে তাদের তিনজনকে ঠেঙাবে। কেউ কেউ বা এ সুরটা পছন্দ করছে না, বলছে, এটা বড়ই বোকা-বোকা আর ইতর মনের পরিচায়ক।
জুলি পরদিনই মস্কো ছেড়ে যাবে, সেই উপলক্ষে একটা বিদায়-সভার আয়োজন করা হয়েছে। অন্য অনেক কথার সঙ্গে রস্তভদের প্রসঙ্গও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
জুলি বলল, শুনেছি তাদের অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছে। আর লোকটি এত অবিবেচক, মানে আমি সয়ং কাউন্টের কথা বলছি। রাজমভস্কিরা তার মস্কোর উপকণ্ঠস্থ বাড়ি ও জমিদারি কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু দরাদরির আর শেষ হচ্ছে না। তিনি বড় বেশি দর হেঁকেছেন।
একজন বলল, না না, আমার তো মনে হয় কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্রি পাকা হয়ে যাবে। যদিও এখন। মস্কোর কোনো কিছু কেনাই পাগলামি।
জুলি শুধাল, কেন? আপনি নিশ্চয়ই মনে করেন না যে মস্কো বিপন্ন?
তাহলে আপনি মস্কো ছেড়ে যাচ্ছেন কেন?
আমি? এটা কি প্রশ্ন হল? আমি যাচ্ছি কারণ…কারণ সকলেই যাচ্ছে, আর তাছাড়া আমি তো জোয়ান অব আর্ক বা আমাজন নই।
বুড়ো মানুষ ভালো, তবে কাজের লোক নয়। আর এত দীর্ঘকাল তারা মস্কোতেই বা আছেন কেন? অনেক আগেই তো তাদের দেশে ফিরে যাবার কথা। নাতালি তো এখন বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে, তাই না? সবজান্তা হাসি হেসে জুলি পিয়েরকে জিজ্ঞাসা করল।
পিয়ের জবাব দিল, তারা ছোট ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছে। ছেলেটি ওবোলেনস্কির কলাকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বেলায়া জেবকভ-এ চলে গেছে, সেখানে একটা রেজিমেন্ট গড়া হচ্ছে। এখন তারা চেষ্টাচরিত্র করে ছেলেটিকে আমার রেজিমেন্টে বদলি করিয়েছে, আশা করছে, যে কোনো সময় সে এসে পড়বে। কাউন্ট অনেক আগেই চলে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ছেলে না ফেরা পর্যন্ত কাউন্টেস কিছুতেই মস্কো ছেড়ে যাবেন না।
গত পরশু আরখারভদের বাড়িতে তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। নাতালি সুস্থ হয়ে উঠেছে, মুখও অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। একটা গানও গাইল। কত সহজেই মানুষ সবকিছু ভুলে যেতে পারে!
কি আবার ভুলে গেল? অসন্তুষ্ট চোখে পিয়ের শুধাল।
জুলি হাসল।
কি জানেন কাউন্ট, আপনার মতো নাইটদের শুধু মাদাম দ্য সুজার উপন্যাসেই পাওয়া যায়।
