.
অধ্যায়-১৬
শেষ দলিলটা সই করে কুতুজভ বলল, ব্যাস। সব শেষ! তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গলার ভাঁজগুলো সমান করে খুশি মনে দরোজার দিকে পা বাড়াল।
পুরোহিতের স্ত্রী লজ্জায় আরো লাল হয়ে নিচু হয়ে অভিবাদন করে থালাটা কুতুজভের দিকে এগিয়ে দিল।
কুতুজভ চোখ ঘুরিয়ে একটু হাসল, তার থুতনিটা তুলে ধরে বলল, আরঃ, কী সুন্দর! অনেক ধন্যবাদ মিষ্টি মেয়ে!
ট্রাউজারের পকেট থেকে কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে থালার উপরে রাখল। তারপর তার জন্য নির্দিষ্ট ঘরের দিকে চলতে চলতে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, সব খবর ভালো তো? পুরোহিতের স্ত্রী হাসল, তার গালে একটা টোল পড়ল, কুতুজভকে অনুসরণ করে সেও ঘরে ঢুকল। অ্যাডজুটান্ট বেরিয়ে এসে প্রিন্স আন্দ্রুকে তার সঙ্গে লাঞ্চ খেতে ডাকল। আধ ঘন্টা পরে আবার কুতুজভের ঘরে প্রিন্স আন্দ্রুর ডাক পড়ল। কুতুজভ একটা হাতল-চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, তখনো সেই বোতাম-খোলা ওভারকোটটাই গায়ে রয়েছে। হাতে একখানা ফরাসি বই। প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢুকতে বইটা বন্ধ করে একটা ছুরি দিয়ে জায়গাটা নির্দিষ্ট রাখল। প্রচ্ছদ দেখে প্রিন্স আন্দ্রু বুঝল বইটা মাদাম দ্য জেঁলিসর শেভালিয়ে দু সাই নে।
কুতুজভ বলল, বস হে, এখানে বস। কিছু কথা বলা যাক। দুঃখের, খুবই দুঃখের কথা। কিন্তু মনে রেখ বাবা আমিও তোমার বাবার মতো, দ্বিতীয় পিতা…
বাবার মৃত্যু সম্পর্কে যা জানত, বন্ড হিলস-এর ভিতর দিয়ে আসবার সময় যা কিছু দেখেছে প্রিন্স আন্দ্রু সেসব কথাই কুতুজভকে বলল।
কোথায়…আমাদের ওরা কোথায় নিয়ে এসেছে! কুতুজভ হঠাৎ উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে বলল, রাশিয়ার বর্তমান ছবিটা যেন স্পষ্ট হয়ে তার চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। কিন্তু আমাকে সময় দাও, সময় দাও! তারপরই এই উত্তেজিত আলোচনায় ইতি টেনে বলল, তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি আমার কাছে রাখব বলে।
অনেক ধন্যবাদ প্রশান্ত মহামহিম, কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে দপ্তরে কাজ করার মতো যোগ্যতা এখন আর আমার মধ্যে নেই, উত্তর দেবার সময় প্রিন্স আন্দ্রুর মুখের হাসিটুকু কুতুজভের দৃষ্টি এড়াল না।
সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, কিন্তু সবচাইতে বড় কথা, রেজিমেন্টে থাকাটা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে, সেখানকার অফিসারদের আমি ভালোবাসি, সৈনিকদেরও আপনজনের মতোই দেখি। রেজিমেন্ট ছেড়ে আসতে আমার কষ্ট হবে। আপনার সঙ্গে থাকতে পারার সম্মানকে যদি ফিরিয়ে দেই, তো বিশ্বাস করুন…
একটা কঠোর, সদয়, অথচ সূক্ষ্ম ব্যঙ্গাত্মক ভাব ফুটে উঠল কুতুজভের ফোলা-ফোলা মুখে। সে বলকনস্কিকে থামিয়ে দিল।
আমি দুঃখিত, কারণ তোমাকে আমার দরকার। কিন্তু তুমি ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ। এখানে মানুষের কোনো দরকার নেই। পরামর্শ দেবার লোক অনেক আছে, কিন্তু মানুষ নেই। ভাবী পরামর্শদাতারা যদি সেনাদলে কাজ করত তাহলে রেজিমেন্ট অন্যরকম হয়ে যেত। অস্তারলিজে তোমাকে আমার মনে আছে…মনে আছে, হ্যাঁ, পতাকা হাতে তোমার সেই মূর্তি আমার মনে আছে! কুতুজভের মুখে কথাগুলি শুনে প্রিন্স আন্দ্রুর মুখটা আনন্দে রক্তিম হয়ে উঠল।
তার হাত ধরে নিচে টেনে নামিয়ে কুতুজভ চুমো খাবার জন্য গালটা বাড়িয়ে দিল, আর একবার প্রিন্স আন্দ্রু দেখল বুড়ো মানুষটির চোখে জল এসেছে। যদিও প্রিন্স আন্দ্রু জানে কুতুজভের চোখে সহজেই জল আসে, তার সাম্প্রতিক ক্ষতির জন্য লোকটি তার প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল, তবু অস্তারলিজের কথা মনে করিয়ে দেওয়াটা তার কাছে যেমন আনন্দের, তেমনই গর্বের।
তুমি তোমার পথেই চলে যাও, ঈশ্বর তোমার সহায় হোন। আমি জানি, সম্মানের পথই তোমার পথ! একটু থেমে কুতুজভ আবার বলল, বুখারেস্টে তোমার অভাব আমি খুবই অনুভব করেছি, কিন্তু পাঠাবার মতো একজন লোকের যে আমার বড়ই দরকার হয়ে পড়েছিল। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য তুর্কি যুদ্ধ ও সন্ধির কথা বলতে শুরু করল। বলল, হ্যাঁ, যুদ্ধ ও সন্ধি দুইয়েরই জন্য আমাকে দোষী করা হয়েছে।…কিন্তু ঠিক সময়ে ঠিক কাজটিই করা হয়েছে। একটা দুর্গ দখল করা কিছু শক্ত কাজ নয়, শক্ত একটা অভিযান জয় করা। আর সেজন্য দরকার–দুর্গ দখল ও আক্রমণ নয়, দরকার ধৈর্য ও সময়। এই দুটোরই আশ্রয় আমি, নিয়েছিলাম, আর তাই কামেনস্কির চাইতে অনেক বেশি দুর্গ দখল করেছি, আর তুর্কিদের ঘোড়ার মাংস খেতে বাধ্য করেছি!…বিশ্বাস কর, ফরাসিদেরও সেই অবস্থা হবে, তাদেরও আমি ঘোড়ার মাংসই খাওয়াব! চোখের জলে আবার তার দৃষ্টি আবছা হয়ে উঠল।
কিন্তু যুদ্ধ তো আমাদের করতেই হবে, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
সকলে যদি চায় তো তাই হবে, কোনো উপায় নেই…কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস কর বাবা, ধৈর্য ও সময়ের চাইতে শক্তিশালী আর কিছু নেই, যা কিছু করার এরাই করে। এ অবস্থায় আমাদের কি করা উচিত? আমি বলছি কি করা দরকার। একটি ফরাসি প্রবাদ উদ্ধৃত করে বলল : সন্দেহ যখন দেখা দেয়, মন চের, তখন কিছুই কর না।
আচ্ছা, তাহলে বিদায়, মনে রেখ, সমস্ত অন্তর দিয়ে আমিও তোমার দুঃখের অংশীদার, আর তোমার কাছে আমি প্রশান্ত মহামহিম নই, প্রিন্স নই, প্রধান সেনাপতিও নই, আমি শুধু পিতা। কখনো কোনো দরকার হলে সোজা আমার কাছে চলে এস। বিদায় বাবা!
