প্রিন্সকে আলিঙ্গন করে তার স্কুল বুকের উপর তাকে জড়িয়ে ধরল, বেশ কিছুক্ষণ ছেড়ে দিল না। ছাড়া পেয়ে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল, তার মোটা ঠোঁট দুটি কাঁপছে, দুই চোখে টলমল করছে অশ্রুর বিন্দু। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াবার জন্য দুই হাতে বেঞ্চির উপর চাপ দিল।
এস, আমার সঙ্গে এস, কথা আছে, কুতুজভ বলল।
ঠিক সেইমুহূর্তে দেনিসভ বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল, অ্যাডজুটান্টদের ক্রুদ্ধ ফিসফিস কথায় বাধা মানল না।
আসনের উপর হাত রেখেই কুতুজভ চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। নিজের নাম ঘোষণা করে দেনিসভ জানাল যে দেশের কল্যাণের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় প্রশান্ত মহামহিমকে জানাতেই সে এসেছে। কুতুজভ ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিসূচক ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে পরে পেটের উপর ভাঁজ করে রেখে বলল, আমাদের দেশের কল্যাণের জন্য ব্যাপার কি? বল! মুখটা মেয়ের মতো লজ্জায় লাল হয়ে উঠলেও সে স্নোলেনস্ক ও ভিয়াজমার ভিতর দিয়ে শত্রুপক্ষের ব্যুহভেদ করার পরিকল্পনাটা সাহসের সঙ্গে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল। দেনিসভ এই অঞ্চলেরই মানুষ, কাজেই দেশটাকে সে ভালোই চেনে। তার পরিকল্পনাটা সত্যি ভালো, বিশেষত যেরকম দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে সেটাকে সে বুঝিয়ে বলল তাতে সেটাকে সত্যি ভালো মনে হল। কুতুজভ নিজের পায়ের দিকে তাকাল, মাঝে মাঝে পার্শ্ববর্তী ঘরটার দিকেও তাকাতে লাগল, যেন সেখান থেকে অপ্রীতিকর কিছু বেরিয়ে আসার আশংকা আছে তার মনে। দেনিসভের কথার মাঝখানেই সেই কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন জেনারেল, তার বগলে একটা পোর্টফোলিও।
কুতুজভ বলে উঠল, সে কি? তুমি এত শীঘ্র তৈরি হয়েছ?
সেনাপতি উত্তর দিল, আমি তৈরি প্রশান্ত মহামহিম।
কুতুজভ এমনভাবে মাথা নাড়ল যেন বলতে চাইল, একটা মানুষ এত সব সামাল দেবে কেমন করে? তারপর দেনিসভের কথায় মন দিল।
দেনিসভ বলতে লাগল, একজন রুশ অফিসার হিসেবে আমি কথা দিচ্ছি, নেপোলিয়নের যোগাযোগ সূত্রটা আমি ছিঁড়ে ফেলতে পারব।
তার কথায় বাধা দিয়ে কুতুজভ শুধাল, ইন্টেন্ড্যান্টজেনারেল কিরিল আদ্ৰীভিচ দেনিসভ তোমার কে হন?
তিনি আমার খুড়োমশাই প্রশান্ত মহামহিম।
আচ্ছা, আমরা দুইজন তো বন্ধু, কুতুজভ সানন্দে বলল। ঠিক আছে, ঠিক আছে বন্ধু, আজ এখানে থাক, কাল তোমার সঙ্গে কথা হবে।
দেনিসভের দিকে মাথাটা নেড়ে সে কাগজপত্রগুলির জন্য কনভনিৎসিনৈর দিকে হাত বাড়াল।
অসন্তুষ্ট গলায় কর্তব্যরত জেনারেল বলল, প্রশান্ত মহামহিম কি ভিতরে আসবেন? পরিকল্পনাগুলি পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কিছু কাগজপত্রে সই করতে হবে।
একজন অ্যাডজুটান্ট বেরিয়ে এসে জানাল, ভিতরে সবকিছু প্রস্তুত। কুতুজভ কিন্তু কাজ শেষ না করে ভিতরে যেতে চাইল না। মুখটা বিকৃত করল…
না হে বাপু, ওদের বল একটা ছোট টেবিল এখানেই নিয়ে আসুক। এখানে বসেই কাগজপত্রগুলো দেখব। প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তুমি যেয়ো না।
এইসব কথাবার্তা যখন চলছে তখন প্রিন্স আন্দ্রু দরোজার পিছনে নারীকন্ঠের ফিসফিসানি ও রেশমি পোশাকের খসখসানি শুনতে পেল। বারকয়েক সেদিকে তাকিয়ে সে দরোজার পিছনে একটি গোলগাল, গোলাপি সুদর্শনাকে দেখতে পেল, পরনে গোলাপি পোশাক, মাথায় লিলাক-রঙের রুমাল বাঁধা। একটা থালা হাতে নিয়ে প্রধান সেনাপতির জন্য অপেক্ষা করে আছে। কুতুজভের অ্যাডজুটান্ট প্রিন্স আন্দ্রুর কানে কানে বলল, এই মহিলা বাড়ির মালিক পুরোহিতের স্ত্রী, প্রশান্ত মহামহিমকে রুটি ও লবণ দিয়ে অভ্যর্থনা করবে। তার স্বামী প্রশান্ত মহামহিমকে গির্জায় স্বাগত জানিয়েছে ক্রুশ দিয়ে, আর স্ত্রী তাকে স্বাগত জানাবে বাড়িতে। মহিলাটি খুবই সুন্দরী। অ্যাডজুটান্ট ঈষৎ হেসে কথা শেষ করল। কথাগুলো কানে আসতেই কুতুজভ ঘুরে দাঁড়াল। প্রিন্স আন্দ্রু প্রধান সেনাপতির মুখের দিকে ভালোভাবে তাকাল, তার চোখে পড়ল শুধু বিরক্তি, মেয়েদের ফিসফিস কথাবার্তা সম্পর্কে কৌতূহল এবং ভদ্রতা রক্ষা করে চলার বাসনা। জেনারেলের প্রতিবেদনের পাণ্ডিত্য অথবা দেনিসভের পরিকল্পনার দেশাত্মবোধ-কোনোটার প্রতিই তার বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। প্রতিবেদনের যে জায়গায় রুশ সৈনিকদের লুটতরাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে একমাত্র সে সম্পর্কেই কুতুজভ নিজের থেকে একটা স্পষ্ট নির্দেশ দিল। প্রতিবেদনের শেষে কুতুজভের স্বাক্ষরের জন্য একটা কাগজ জেনারেল তার সামনে মেলে ধরল, সৈন্যরা যেসমস্ত তাজা যই ফসল ক্ষেত থেকে কেটে নিয়ে গেছে, জমির মালিকরা তার দরুন ক্ষতিপূরণ দাবি করে দরখাস্ত করায় সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা যেসব টাকা ব্যয় করেছে কাগজটাতে তারই উল্লেখ করা হয়েছে।
সব ব্যাপারটা শুনে কুতুজভ ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে মাথা নাড়তে লাগল।
মুখে বলল, উনুনে ফেলে দাও…আগুনে পুড়িয়ে দাও! শেষবারের মতো তোমাদের বলে দিচ্ছি, এ সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে দাও! তারা খুশি মতো ফসল কাটবে, কাঠ কেটে আগুন জ্বালাবে! সেরকম কোনো হুকুম আমি দিচ্ছি না, সেধরনের কাজ হোক তাও চাই না, কিন্তু ক্ষতিপূরণের দাবিও চলবে না। এ ছাড়া চলতে পারে না। কাঠ যখন কাটা হবে তখন টুকরো চাকলা তো উড়বেই। সে আবার কাগজটার দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলল, ওঃ, যত সব জার্মান কেতা।
