হুজার লেফটেন্যান্ট-কর্নেল আর্দালিটির গলার স্বরে গোঁফের নিচে একটুখানি হেসে ঘোড়া থেকে নামল, ঘোড়াটাকে সহিসের জিম্মায় দিয়ে মাথাটা ঈষৎ নুইয়ে বলকনক্কির দিকে এগিয়ে গেল। বলকনস্কি বেঞ্চিতে একটু জায়গা করে দিল, লোকটি তার পাশে বসে পড়ল।
লোকটি বলল, আপনিও প্রধান সেনাপতির জন্য অপেক্ষা করছেন? লোকে বলে তিনি সকলের সঙ্গেই দেখা করেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! ঐ মাংসখেকোদের নিয়েই যত বিপদ! এতদিনে রুশদের একটা হিল্লে হবে। এতদিন যে কি হচ্ছিল তা শুধু শয়তানই জানে। আমরা তো পিছিয়েই চলেছি। আপনি কি অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন?
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, শুধু যে পশ্চাদপসরণে অংশ নেবার সৌভাগ্য হয়েছে তাই নয়, সেই পশ্চাদপসরণের কালে আমার যা কিছু প্রিয় সব হারিয়েছি-শুধু জমিদারি ও জন্ম-ভিটের কথাই বলছি না-হারিয়েছি আমার বাবাকে, শোকের আঘাতেই তিনি মারা গেছেন। আমি মোলেন প্রদেশের লোক।
ওঃ! আপনি প্রিন্স বলকনস্কি? আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারি খুশি হলাম! আমি লেফটেন্যান্ট-কর্নেল দেনিসভ, ভাস্কো নামেই অধিক পরিচিত, প্রিন্স আন্দ্রুর হাতটা চেপে ধরে বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেনিসভ বলল। হ্যাঁ, আমি শুনেছি।…আর, এই সিদীয় যুদ্ধ। যুদ্ধ ভালো জিনিস–শুধু যাদের গলায় চেপে বসে তাদের পক্ষে তা নয়। তাহলে আপনিই প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কি? আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারি খুশি হলাম! বিষণ্ণ হাসির সঙ্গে সে আবার প্রিন্স আন্দ্রুর হাতটা চেপে ধরল।
প্রথম প্রণয়ী সম্পর্কে নাতাশা তাকে যা বলেছে দেনিসভ সম্পর্কে প্রিন্স ততটুকুই জানে। এই স্মৃতি তাকে হর্ষ ও বিষাদে ভরা সেই বেদনাময় দিনগুলিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল যার কথা সে ইদানীং আর ভাবে না, অথচ মন থেকেও মুছে যায়নি। সম্প্রতিকালে এত সব নতুন ও গুরুতর ঘটনা তার জীবনে ঘটেছে–যেমন মোলেনস্ক থেকে পশ্চাদপসরণ, বন্ড হিলস-এ প্রত্যাবর্তন ও বাবার মৃত্যু-সংবাদ এবং এত বিচিত্র অনুভূতির অভিজ্ঞতা তার হয়েছে যে দীর্ঘদিন সেই সব অতীত স্মৃতি তার মনেই পড়েনি। দেনিসভের দিক থেকেও বলকনস্কির নামের সঙ্গে জড়িত হয়ে যে অতীত স্মৃতি তা মনে জেগে উঠেছে তাও তো এক দূর অতীতের রোমান্টিক স্মৃতিমাত্রযখন নৈশভোজনান্তে নাতাশার গান শেষ হলে সে যে কি করছে তা না বুঝেই একটি পঞ্চদশী মেয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল। সেকথা মনে হতেই মৃদু হেসে দেনিসভ বর্তমান অভিযান প্রসঙ্গে তার একটা নতুন পরিকল্পনার কথা তুলল। সমস্ত ব্যাপারটা প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে বলল, সবগুলো সীমান্ত তারা রক্ষা করতে পারবে না। সেটা অসম্ভব। তাদের ব্যুহ আমি ভেদ করবই। আমাকে পাঁচশ সৈন্য দিন, আমি ব্যুহ ভেদ করে বেরিয়ে যাব। এটা একেবারে নিশ্চিত কথা! আমাদের সামনে। একটি মাত্র পথ আছে-গেরিলা যুদ্ধ!
দেনিসভ যখন বলকনস্কির কাছে নিজের পরিকল্পনা বোঝাতে গিয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে চলেছে, তখনই কানে এল সৈন্যদের হৈ-হল্লা আর গান-বাজনার শব্দ। চেঁচামেচি ও ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ ক্রমেই গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে।
ফটকে দাঁড়ানো একটি কসাক চেঁচিয়ে উঠল, তিনি আসছেন। তিনি আসছেন!
বলকনস্কি ও দেনিসভ ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। তারা দেখতে পেল, একটা ছোট ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে আসছে কুতুজভ। তার পিছনে আসছে অশ্বারোহী সেনাপতির একটা বড় দল। ঠিক পিছনেই আসছে বাকলে। একদল অফিসার ছুটতে ছুটতেই চিৎকার করছে হুররা!
চারদিকের হুররা! হুররা! ধ্বনির মধ্যে কুতুজভ প্রিন্স আন্দ্রু ও দেনিসভের পাশ কাটিয়ে উঠোনে ঢুকল।
প্রিন্স আন্দ্রু যখন তাকে শেষবারের মতো দেখেছিল কুতুজভ এখন তার চাইতেও বেশি মোটা হয়েছে, গায়ের চামড়া আরো ঝুলে পড়েছে। কিন্তু চোখের শাদা তারা, ক্ষতের দাগ ও ক্লান্তির ছাপ আগের মতোই আছে। মাথায় অশ্বরক্ষীর শাদা টুপি ও মিলিটারি ওভারকোট, কাঁধের উপর ঝুলছে সরু ফিতে দিয়ে বাঁধা একটা চাবুক। ছোট ঘোড়াটার পিঠে চেপে বসে দুলে দুলে চলছে।
উঠোনে ঢুকেই শিস দিল হু-হু-হু! মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির আভাস। রেকাব থেকে বাঁ পাটা তুলে গোটা শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে মুখটা বেঁকিয়ে অনেক কষ্টে জিনের উপর রেখে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে পিছলে নিচে নেমে গেল, আর অপেক্ষমাণ অ্যাডজুটান্ট ও কত্সকরা তাকে যেন কোলে করে নামিয়ে দিল।
শরীরটাকে সোজা করে চোখ কুঁচকে চারদিকে তাকাতে কুতুজভের নজর পড়ল প্রিন্স আন্দ্রুর উপর, কিন্তু তাকে চিনতে না পেরে দুলতে দুলতে সামনে এগিয়ে গেল। হু…হু…হু শিস দিতে দিতে আর একবার প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল। বুড়ো মানুষদের বেলায় যেমন হয়ে থাকে, তারও প্রিন্স আন্দ্রুকে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
আরে, কেমন আছ হে প্রিন্স? কেমন আছ বাবা? এস, এস… বলে কুতুজভ বারান্দায় উঠে গেল। তার দেহের ভারে বারান্দাটা ঝাঁকিয়ে উঠল।
কোর্টের বোতাম খুলে সে বারান্দার বেঞ্চিতে বসল।
তোমার বাবা কেমন আছেন?
প্রিন্স আন্দ্রু সরাসরি জবাব দিল, গতকালই বাবার মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছি।
বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে কুতুজভ তার দিকে তাকাল : তারপর টুপি খুলে ক্রুশচিহ্ন আঁকল।
তিনি স্বর্গরাজ্য লাভ করুন! আমাদের সকলের জন্যই ঈশ্বরের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক! কুতুজভ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, তার বুকটা ওঠা-নামা করতে লাগল, বেশ কিছুক্ষণ সে চুপ করে রইল। আমি তাকে ভালোবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম, সমস্ত অন্তর দিয়ে তোমাকে সহানুভূতি জানাচ্ছি।
