প্রিন্স আন্দ্রুর লাইব্রেরির কার্বার্ডটা এনে আর একটি চাষী বলল, আরে বই, বই! ধাক্কা দিও না। এটা খুব ভারী-বইয়ে একেবারে ঠাসা।
উপরের অভিধানগুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে অর্থপূর্ণভাবে চোখ টিপে গোল-মুখ ঢ্যাঙা চাষীটি বলল, হ্যাঁ, ওঁরা তো সারাদিন কাজ করেন, মোটেই খেলাধূলা করেন না!
প্রিন্সেসের সঙ্গে গায়ে পড়ে ভাব করার অনিচ্ছায় রস্তভ বলকনস্কি ভবনে ফিরে না গিয়ে গ্রামেই প্রিন্সেসের যাত্রার জন্য অপেক্ষা করে রইল। প্রিন্সেসের গাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে রস্তভও ঘোড়ায় চেপে বোগুচারভো থেকে আট মাইল পর্যন্ত তার সঙ্গে সঙ্গে গেল। সেখান থেকেই রাস্তাটা আমাদের সেনাদলের দখলে। ইয়ংকভো সরাইখানাতে সে সশ্রদ্ধভাবে প্রিন্সেসের কাছ থেকে বিদায় নিল এবং এই সর্বপ্রথম তার হাতে চুমো খেল।
তাকে উদ্ধার করার জন্য প্রিন্সেস মারির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উত্তরে রস্তভ রক্তিম মুখে বলল, একথা কেন বলছেন? যে কোনো পুলিশ অফিসারই তো একাজটা করত। আমাদের যদি অনবরত চাষীদের সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাহলে শত্রুপক্ষকে এতদূর আসতে দেওয়া উচিত হয়নি। আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়ে খুশি হয়েছি। বিদায় প্রিন্সেস! আপনার সুখ ও সান্ত্বনা কামনা করি, আশা করি মধুরতর পরিবেশে আবার আমাদের দেখা হবে। আমাকে যদি লজ্জা দিতে না চান তো দয়া করে ধন্যবাদ দেবেন না!
কথায় ধন্যবাদ না জানালেও প্রিন্সেস কিন্তু ধন্যবাদ জানাল কৃতজ্ঞতা ও মমতায় উজ্জ্বল মুখের ভাব দিয়ে। তাকে ধন্যবাদ জানাবার কিছু নেই একথা প্রিন্সেস বিশ্বাস করে না, বরং সে নিশ্চিত বোঝে যে রস্তভ না এলে সে বিদ্রোহী চাষী ও ফরাসিদের হাতে মারা পড়ত, তাকে বাঁচাতে এই মানুষটি ভয়ংকর বিপদের ঝুঁকি নিয়েছিল, উচ্চ আদর্শ ও মহৎ অন্তরের এই মানুষটি তার অবস্থা, তার দুঃখকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। নিজের ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে সে নিজে যখন কাঁদছিল, তখন এই মানুষটির সদয়, অশ্রুভরা চোখ দুটির স্মৃতি সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।
রস্তভের কাছে বিদায় নিয়ে সে যখন একলা দাঁড়িয়েছিল তখন হঠাৎ তার চোখ জলে ভরে এল, আর তখনই এই প্রথম একটা বিচিত্র প্রশ্ন তার মনে দেখা দিল : সে কি রস্তভকে ভালোবেসেছে?
মস্কোর পথে চলতে চলতে প্রিন্সেস মারি ভাবল : আচ্ছা ধরা যাক আমি তাকে ভালোবাসি, তাহলে?
যে মানুষ কোনোদিন তাকে ভালোবাসবে না সে যে তারই প্রেমে পড়েছে এ-কথা নিজের কাছে স্বীকার করাও যে লজ্জার, তবু এই কথা ভেবে সে সান্ত্বনা পেল যে একথা কেউ কোনোদিন জানবে না, এ-কথা কাউকে কোনো দিন না জানিয়েও জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো যাকে সে ভালোবেসেছে তাকে যদি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবেসে যায় তাহলে তো কেউ তাকে দোষ দিতে পারবে না।
মাঝে মাঝে যখনই রস্তভের চাউনি, তার সহানুভূতি, তার কথাগুলি মনে পড়ে, তখনই সুখের আস্বাদন তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হয় না।
সে ভাবতে লাগল, ঠিক সেইমুহূর্তে নিয়তিই কি তাকে বোগুচারভোতে এনে হাজির করেনি? নিয়তির বশেই কি তার বোন আমার দাদাকে প্রত্যাখ্যান করেনি? (নাতাশা যদি প্রিন্স আন্দ্রুকে বিয়ে করত তাহলে সেটা হত মারি ও নিকলাসের বিয়ের পথে বিঘ্নস্বরূপ।) সবকিছুর মধ্যেই প্রিন্সেস মারি বিধাতার নির্দেশ দেখতে পেল।
রশুভেরও প্রিন্সেসকে ভালো লেগেছে। তার কথা মনে হলেই সে আনন্দ পায়। তার বোণ্ডচারভো অভিযানের কাহিনী শুনে সহকর্মীরা যখন বলতে শুরু করল যে খড় খুঁজতে গিয়ে সে রাশিয়ার সবচাই তো ধনবতী উত্তরাধিকারিণীকে খুঁজে পেয়েছে, তখন তার রাগ হল। তার রাগের কারণ, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই প্রিন্সেস মারিকে বিয়ে করার কথা একাধিকবার তার মাথায় এসেছে। নিকলাস ব্যক্তিগতভাবে তার চাইতে ভালো স্ত্রী কামনা করে না : তাকে বিয়ে করলে তার মা কাউন্টেস সুখী হবে, তার বাবার সাংসারিক বিপদ কেটে যাবে, এমন কি প্রিন্সেস মারির সুখও নিশ্চিত হবে।
কিন্তু সোনিয়া? আর তার বাকদান? সহকর্মীদের কথায় এই জন্য রস্তভ রাগ করেছিল।
.
অধ্যায়-১৫
প্রধান সেনাপতির কার্যভার হাতে নিয়েই কুতুজভের মনে পড়ল প্রিন্স আন্দ্রুকে, তাকে খবর পাঠাল প্রধান ঘাঁটিতে এসে তার সঙ্গে দেখা করতে।
জারেভো-জ্যামেশিতে কুতুজভ যেদিন প্রথম সেনাদল পরিদর্শন করল ঠিক সেইদিনই প্রিন্স আন্দ্রু সেখানে এল। গ্রাম্য পুরোহিতের যে বাড়িটার সামনে প্রধান সেনাপতির গাড়ি দাঁড়িয়েছিল প্রিন্স আন্দ্রু সেই বাড়িতেই থামল, ফটকের বেঞ্চিটাতে বসে অপেক্ষা করতে লাগল প্রশান্ত মহামহিমের জন্য–সকলে এখন ঐ নামেই কুতুজভকে ডাকে। গ্রামের অদূরের মাঠ থেকে কখনো ভেসে আসছে সেনাদলের বাজনার শব্দ, কখনো বা নতুন প্রধান সেনাপতির প্রতি বহু কণ্ঠের হুররা! ধ্বনি। দুইজন আর্দালি, একজন সংবাদবাহক ও একজন প্রধান ভাণ্ডারী কাছেই প্রিন্স আন্দ্রুর দশ পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বেঁটে, মোটা হুজার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ঘোড়া ছুটিয়ে এল, মুখে ঘন গোঁফ ও গালপাট্টা, প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, প্রশান্ত মহামহিম সেখানেই থাকেন কিনা এবং শীঘ্রই ফিরবেন কি না।
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, সে প্রশান্ত মহামহিমের স্টাফের লোক নয়, এখানে নতুন এসেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল একজন আর্দালির দিকে এগিয়ে গেল। সে জবাব দিল, কে? প্রশান্ত মহামহিম? আশা করছি তিনি অচিরেই এসে পড়বেন। আপনার কি চাই?
