যুক্তিহীন জান্তব ক্রোধে রুদ্ধশ্বাস হয়ে রস্তভ বলে উঠল, সশস্ত্র বাহিনীই দেব ব্যাটাদেব…বাড়াবাড়িই করব!
কী করবে না ভেবেচিন্তেই সে দৃঢ় পদক্ষেপে দ্রুত এগিয়ে চলল ভিড়কে লক্ষ্য করে। যতই তাদের কাছে যাচ্ছে ততই আলপাতিচের মনে হচ্ছে যে এই যুক্তিহীন কাজের ফলটা ভালোই হবে। রস্তভের দৃঢ় পদক্ষেপ ও ভ্রুকুঞ্চিত মুখ দেখে ভিড়ের মধ্যে চাষীদের মন কিছুটা দমে গেল।
হুজাররা গ্রামে আসায় এবং রস্তভ প্রিন্সেসের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় চাষীদের মধ্যে কিছুটা গোলমাল ও মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কিছু চাষী বলল, নবাগতরা নিশ্চয়ই রুশ, আর কত্রীকে আটক করায় তারা রুষ্ট হতে পারে। দ্রোনেরও তাই মত, কিন্তু সেকথা বলামাত্রই কাপ ও অন্য কেউ-কেউ প্রাক্তনগ্রাম-প্রধানের উপর চটে উঠল।
কার্প চেঁচিয়ে বলল, কমনের পয়সায় কত বছর ধরে পেট মোটা করেছ? তোমার আর কি! মাটি খুঁড়ে টাকার ঘড়া তুলবে আর তাই নিয়ে পগার পার হবে।…আমাদের বাড়িঘর থাকল কি গেল তাতে তোমার কি যায়-আসে?
আমাদের হুকুম তামিল করতে বলা হয়েছে, কাউকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বা এক দানা শস্য নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না, ব্যাস, ফুরিয়ে গেল!
একটি ছোটখাট বুড়ো হঠাৎ দ্রোনকে আক্রমণ করে বলল, তোমার ছেলেকে সেনাদলে নেবার পালা ছিল, কিন্তু তোমার ভয় কি! তোমার হোল্কা ছেলেটা পার পেয়ে গেল, আর তারা আমার ভাংকাকে নিয়ে গেল মাথা মুড়িয়ে সৈন্য বানাতে! কিন্তু মরতে আমাদের সকলকেই হবে।
দ্রোন বলল, ঠিক বলেছ, আমাদের সকলকেই মরতে হবে। আমি তো কমুনের বিপক্ষে নই।
হয়েছে-বিপক্ষে নই! নিজের পেট মোটা করেছ…
ঢ্যাঙা চাষী দুটোরও কি যেন বলার ছিল। কিন্তু ইলিন, লাভ্রুশকা ও আলপাতিচকে সঙ্গে নিয়ে রস্তভ কাছে এসে পড়ায় কার্প কোমরবন্ধের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে ঈষৎ হেসে এগিয়ে গেল। দ্রোন সরে গেল পিছনের দিকে। আর জনতা আরো ঘন হয়ে এল।
দ্রুত পায়ে ভিড়ের কাছে এসে রস্তভ চিৎকার করে বলল, এখানে তোমাদের গ্রাম-প্রধান কে? অ্যাঁ?
গ্রাম-প্রধান? তাকে আপনার কি দরকার?…কার্প জানতে চাইল।
কিন্তু তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই তার মাথার টুপিটা উড়ে গেল, আর একটা প্রচণ্ড ঘুষি লেগে তার মাথাটা একদিকে বেঁকে গেল।
মাথার টুপি খুলে ফেল বিশ্বাসঘাতকের দল! ক্রুদ্ধ কণ্ঠে রস্তভ গর্জে উঠল। গ্রাম-প্রধান কোথায়?
গ্রাম-প্রধান…গ্রাম-প্রধানকে চাইছেন…দ্রোন জাখারিচ, তুমি! ভিড়ের ভিতর থেকে নানান ভীরু ও ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠ শোনা গেল, সকলেই টুপি খুলে ফেলল।
আমরা তো গোলযোগ করছি না, হুকুম তামিল করছি। কার্প কথাগুলি বলতেই আর কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠল, বৃদ্ধরা এই সিদ্ধান্তই নিয়েছে–হুঁকুম করার মালিক তো আপনারা অনেকেই।
কথার উপর কথা! বিদ্রোহ!…ডাকাতের দল! বিশ্বাসঘাতক! কার্পের কলার চেপে ধরে রস্তভ এমন অর্থহীনভাবে চিৎকার করে উঠল যেন সে কণ্ঠস্বর তার নিজের নয়। ওকে বেঁধে ফেল! বেঁধে ফেল! লাভ্রুশকা ও আলপাতিচ ছাড়া অন্য কেউ সেখানে নেই জেনেও সে কথাটা বলল।
যাই হোক, লাভ্রুশকা ছুটে গিয়ে পিছন থেকে কার্পের হাত চেপে ধরল।
বলল, পাহাড়ের ওপার থেকে সৈন্যদের ডেকে আনব কি?
চাষীদের দিকে ঘুরে আলপাতিচ হুকুম দিল, দুইজন এসে কাৰ্পকে বেঁধে ফেলুক। তারাও বিনীতভাবে ভিড়ের ভিতর থেকে এগিয়ে এসে নিজেদের কোমরবন্ধ খুলতে শুরু করল।
গ্রাম-প্রধান কোথায়? রশুভের চড়া গলা।
বিবর্ণ ভ্রূকুটির মুখে দ্রোন ভিড়ের ভিতর থেকে এগিয়ে এল।
তুমিই গ্রাম-প্রধান? লাভ্রুশকা, একেও বেঁধে ফেল! রস্তভ চিৎকার করে বলল, যেন এ হুকুমকে বাধা দেবারও কেউ নেই।
সত্যি সত্যি আরো দুটি চাষী দ্রোনকে বাধতে শুরু করল, যেন তাদের সাহায্য করতে দ্রোন নিজের কোমরবন্ধটাই খুলে দিল।
তখন রস্তভ চাষীদের বলল, তোমরা সকলেই শোন! এই মুহূর্তে যার যার বাড়ি চলে যাও, তোমাদের কারো গলা যেন আর না শুনি।
কেন? আমরা তো কোনো ক্ষতি করিনি। স্রেফ বোকার মতো কাজ করেছি। যতসব বাজে ঝামেলা…আমি তখনই বলেছিলাম কাজটা ঠিক হচ্ছে না, পরস্পরের প্রতি দোষারোপের ভাষা শোনা গেল।
এতক্ষণে আলপাতিচ আবার স্বমূর্তি ধারণ করল। বলল, হল তো? আমি কি বলেছিলাম? এটা অন্যায় বাপধনরা!
সবই আমাদের বোকামি আলপাতি, বলতে বলতে সকলে কেটে পড়ল।
যে দুটি লোককে বাঁধা হয়েছে তাদের মনিবের বাড়িতে নিয়ে চলল। মাতাল দুটিও তাদের পিছু নিল।
একজন কাৰ্পকে বলল, আহা, তোমাকে দেখে দুঃখ হচ্ছে!
অপরজন বলল, মনিবের সঙ্গে কখনো ওভাবে কথা বলতে আছে? তুমি কি ভেবেছিলে হে বোকারাম? খাঁটি বোকা!
দুইঘণ্টা পরে। বোগুচারভো ভবনের সামনে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। চাষীরা মালিকের মালপত্র বয়ে এনে গাড়িতে বোঝাই করছে। প্রিন্সেস মারির ইচ্ছানুসারে দ্রোনের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে সেও তদারক করছে।
দাসীর হাত থেকে একটা গহনার বাক্স নিয়ে একটি চাষী বলল, এটাকে এমন হেলাফেলা করে রেখ না। জান এর জন্য কত টাকা খরচ হয়েছে! ওভাবে দড়ির নিচে যে রাখছ, ওটার গায়ে ঘষা লাগবে না? এরকম কাজ আমি পছন্দ করি না। সব কাজ নিয়মমাফিক কর। এই দেখ, এটা বাকলের মাদুরের নিচে রেখে খড় দিয়ে ঢেকে দাও-এইভাবেই এসব জিনিস রাখতে হয়!
