মাতাল চাষীদের দিকে তাকিয়ে রস্তভ হাসল।
আলপাতিচ গম্ভীর মুখে বলল, আপনি হয়তো ওদের দেখে একটা মজা পাচ্ছেন ইয়োর অনার?
না, এখানে মজা পাবার মতো কিছু নেই। কিন্তু ব্যাপারটা কি?রস্তভ বলল।
যদি অভয় দেন তো বলি, এই দুষ্ট চাষীরা আমাদের কত্রীকে জমিদারি থেকে চলে যেতে দিচ্ছে না, গাড়ি থেকে ঘোড়া খুলে নেবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, তাই সকাল থেকে মালপত্র গাড়িতে বোঝাই করেও হার এক্সেলেন্সি বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না।
অসম্ভব! রস্তভ চেঁচিয়ে বলল।
আমি সত্যি কথাই বলছি, আলপাতিচ বলল।
রস্তভ ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়ার ভার আর্দালির হাতে দিয়ে আলপাতিচের পিছন পিছন বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সমস্ত ব্যাপারটা জেনে নিল। দ্রোন শেষ পর্যন্ত চাবির গোছা ফেরৎ দিয়ে চাষীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আলপাতিচ ডেকে পাঠানো সত্ত্বেও আসেনি, এবং সকালে প্রিন্সেস যাত্রার জন্য তৈরি হলে চাষীরা সদলবলে গোলাবাড়িতে এসে খবর পাঠিয়েছে যে প্রিন্সেসকে যেতে দেওয়া হবে না; গ্রাম ছেড়ে না যাবার হুকুম এসেছে, তাই তারা গাড়ি থেকে ঘোড়া খুলে নেবে। আলপাতিচ তাদের বকুনি দিতে বেরিয়ে এলে তাকেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে (ভিড়ের মধ্যে দ্রোনকে দেখা যায়নি, কথাবার্তা বলেছে মূলত কার্প) তারা প্রিন্সেসকে যেতে দিতে পারে না, হুকুম এসেছে গ্রামে থাকতে, তবে প্রিন্সেস যদি বাড়িতে থেকে যায় তাহলে তারা আগের মতোই তার কাজ করবে, সব ব্যাপারে তাকে মেনে চলবে।
রস্তভ ও ইলিনকে ঘোড়ার পিঠে আসতে দেখে তাদের ফরাসি সৈন্য মনে করে কোচয়ান গাড়ি ফেলে পালিয়ে গেল, আর বাড়ির মধ্যে মেয়েরা কান্নাকাটি শুরু করে দিল।
রস্তভ যখন বাইরের ঘর পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল তখন নানা কণ্ঠে ধ্বনি উঠ, বাবা! উদ্ধারকর্তা! ঈশ্বরই আপনাকে পাঠিয়েছেন!
কিংকর্তব্যবিমূঢ় অসহায় প্রিন্সেস মারি বড় বসবার ঘরটায় বসে ছিল। রস্তভকে সেখানেই নিয়ে আসা হল। লোকটি কে, কেনই বা এসেছে, তার নিজেরই বা কি হবে-সে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু তার রুশসুলভ মুখ, তার চলার ভঙ্গি এবং প্রথম কথাগুলি শুনেই বুঝতে পারল সে তারই সমশ্রেণীর মানুষ, গভীর উজ্জ্বল চোখে তার দিকে তাকাল, আবেগকম্পিত গলায় কথা বলতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে এই সাক্ষাৎট রভের কাছে একটি রোম্যান্টিক ঘটনা হয়ে দেখা দিল। প্রিন্সেসের দিকে তাকিয়ে তার ভীরু কাহিনী শুনতে শুনতে সে ভাবতে লাগল : শোকাভিভূত একটি অসহায় মেয়ে উচ্ছঃখল রূঢ় চাষীদের করুণার পাত্রী হয়ে পড়েছে। আর বিচিত্র নিয়তিই আমাকে এখানে এনে ফেলেছে! তার আকৃতি ও প্রকৃতিতে কী শান্ত সুষমা ও মহত্ত্ব!
এ সবকিছুই ঘটেছে বাবার শেষকৃত্যের ঠিক পরের দিন–এই কথাটা বলতে গিয়ে প্রিন্সেসের গলাটা কাঁপতে লাগল। সে চোখ তুলে দেখল রশুভের চোখেও জল। মারির চোখে ফুটে উঠল যে কৃতজ্ঞতার আভাস তাতে তার মুখের সাধারণ ভাবটা চাপা পড়ে গেল।
রস্তভ বলল, ঘটনাক্রমে ঠিক এই সময়ই আমি যে এখানে এসে পড়েছি এবং আপনার কাজে লাগতে পারছি সেজন্য আমি যে কত খুশি হয়েছি তা বোঝাতে পারব না। আপনি যেখানে খুশি চলে যান, আমি কথা দিচ্ছি কেউ আপনাকে বিরক্ত করতে সাহস করবে না, শুধু আমাকে আপনার সঙ্গে থাকবার অনুমতি দিন। যেন কোনো রাজ-পরিবারের মহিলাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে এমনিভাবে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে রভ দরোজার দিকে এগিয়ে গেল।
তার সশ্রদ্ধ কণ্ঠস্বরই বলে দিল, যদিও প্রিন্সেস মারির সঙ্গে পরিচিত হতে পারলে সে খুবই সুখী হবে, তবু তার দুর্ভাগ্যের সুযোগ নিয়ে সে কোনোরকম জোর খাটাবে না।
প্রিন্সেস মারিও সেটা বুঝতে পেরে খুশি হল।
ফরাসিতে বলল, আপনার কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ, কিন্তু আমি আশা করছি যে এ সবটাই ভুল বোঝাবুঝির ফল, এতে কারো কোনো দোষ নেই। হঠাৎ সে কেঁদে ফেলল।
আমাকে ক্ষমা করবেন! সে বলল।
ভুরু কুঁচকে আর একবার মাথাটা ঈষৎ নুইয়ে রম্ভভ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.
অধ্যায়-১৪
আচ্ছা, খুবই সুন্দরী কি? আরে বন্ধু-আমার গোলাপিটি তো উপাদেয় বস্তু, তার নাম দুনিয়াশা…
কিন্তু রস্তভের দিকে চোখ পড়তেই ইলিন থেমে গেল। বুঝতে পারল, তার নায়ক ও কমান্ডারের চিন্তার ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে বইছে।
সক্রোধ দৃষ্টিতে ইলিনের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে রস্তভ দ্রুত পা ফেলে গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল।
মনে মনে বলল, ওদের দেখিয়ে দেব, শিক্ষা দিয়ে দেব, ডাকাতের দল!
আলপাতিচ অনেক কষ্টে তার গতির সঙ্গে তাল রেখে পাশে পাশে চলল।
একসময় বলল, আপনি কি সিদ্ধান্ত করলেন?
রস্তভ থেমে গেল, হঠাৎ ঘুষি পাকিয়ে আলপাতিচের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
সিদ্ধান্ত? কি সিদ্ধান্ত? অকর্মা বুড়ো!… সে চেঁচিয়ে উঠল। তুমি কি করছিলে? অ্যাঁ? চাষীরা হাঙ্গামা করছে, আর তুমি তার কোনো ব্যবস্থা করতে পারছ না? তুমি নিজেও বিশ্বাসঘাতক! আমি তোমাকে চিনি। জ্যান্ত তোমার চামড়া তুলে নেব।…নিজেই অকারণে রাগ করছে বুঝতে পেরে সে আলপাতিচকে ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে চলল। আলপাতিচ মনের ক্ষোভ চেপে রেখে প্রায় দৌড়বার ভঙ্গিতে তার পাশে পাশে চলতে চলতে কৈফিয়ৎ দিতে লাগল। চাষীরা বড়ই একগুয়ে, আর বর্তমান পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া ওদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করাটাও যুক্তিযুক্ত নয়, কাজেই সর্বাগ্রে মিলিটারি ডাকাই ভালো নয় কি?
