সোফা থেকে পা তুলে বের্গের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে শিনশিন বলল, দেখ হে বাপু, পায়েই হাঁটো আর ঘোড়ায়ই চড়ো, তুমি যেখানে যাবে সেখানেই মাত করবে, এ আমি জোর গলায় বলে দিলাম।
বের্গ খুশিতে হাসতে লাগল। অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে কাউন্ট বসবার ঘরে গেল।
.
তখন বড় ভোজের আগেকার জাকুঙ্কার (ছোট হাজরি) সময়, সমবেত অতিথিরা এসময় কোনো বড় রকমের আলোচনায় জড়িয়ে না পড়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়ায় ও অল্পস্বল্প কথাবার্তা বলে, যেন দেখাতে চায় যে খাবার জন্য তারা মোটেই লালায়িত হয়ে ওঠেনি। গৃহকর্তা ও গৃহকত্রী তখন দরজার দিকে তাকায় আর মাঝে মাঝেই নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে, তা দেখেই অতিথিরা অনুমান করে নেয় তারা কার বা কিসের জন্য অপেক্ষা করছে-হয় কোনো বড় আত্মীয়ের জন্য, আর না হয়তো এমন কোনো খাদ্যসামগ্রীর জন্য যা এখনো বেঁধে নামানো হয়নি।
পিয়ের ঠিক খাবার সময়টাতেই এসেছে এবং বসার ঘরের মাঝখানে প্রথম যে চেয়ারটা পেয়েছে তাতেই এমন অদ্ভুতভাবে বসেছে যাতে অন্য সকলের পথ আটকে গেছে। কাউন্টেস তাকে কথা বলাতে চেষ্টা করল, কিন্তু যেন কারো খোঁজ করছে এমনবাবে সে চারদিকে তাকাতে লাগল এবং কাউন্টেসের সব প্রশ্নেরই এককথায় জবাব দিল। অতিথিরা অনেকেই ভালুকঘটিত ব্যাপারটা জানত বলে কৌতূহলের সঙ্গে তাকে দেখল আর ভাবল যে এরকম একটি বোকা বোকা বিনীত মানুষ পুলিশের সঙ্গে এমন খেলা খেলল কী করে।
কাউন্টেস জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি এইমাত্র এলে?
হুঁ মাদাম, চারদিক তাকিয়ে সে জবাব দিল ।
আমার স্বামীর সঙ্গে এখনো দেখা করনি?
না মাদাম। সে শুধু একটু হাসল।
শুনলাম তুমি সম্প্রতি প্যারিতে ছিলে? আমার তো মনে হয় জায়গাটা খুব মজার।
খুব মজার।
কাউন্টেস আন্না মিখায়লভনার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। প্রিন্সেস বুঝতে পারল, কাউন্টেস চাইছে যে সে যুবকটির আপ্যায়নের ভার নিক; তাই পিয়েরের পাশে গিয়ে বসে প্রিন্সেস তাকে তার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু কাউন্টেসের বেলায় যেমন এখনো তেমনি সে এককথায় জবাব সারল। অন্য অতিথিরা সকলেই নানা আলোচনায় ব্যস্ত।
রাজুমভক্তি-পরিবার…খুব মনোহারী …আপনার খুব দয়া… কাউন্টেস এপ্রক্সিনা…চারদিকে এইসব কথা শোনা যাচ্ছে। কাউন্টেস উঠে নাচঘরে গেল।
সেখান থেকেই ডাকল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা?
স্বয়ং কর্কশ গলায় জবাব এলো; ঘরে ঢুকল মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা।
অবিবাহিতরা সকলে, এমনকি খুব বৃদ্ধা ছাড়া বিবাহিতা মহিলারাও উঠে দাঁড়াল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা দরজায় এসে থেমে গেল। লম্বা, মজবুত গড়ন, কোঁকড়া পাকা চুলভরা মাথাটা পঞ্চাশ বছর বয়সেও বেশ খাড়া। অতিথিদের খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আস্তিনটাকে ঠিকভাবে গোটাতে লাগল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা সবসময় রুশ ভাষাতেই কথা বলে।
যার নামকরণ দিবস আজ আমরা পালন করছি তার ও তার ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্য ও সুখ কামনা করছি, তার গম্ভীর জোরালো গলার শব্দে অন্যসব শব্দ চাপা পড়ে গেল। কাউন্ট এসে তার হাতে চুমো খেলে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, এই যে পুরনো পাপী, মস্কোতে নিশ্চয় আপনার একঘেয়ে লাগছে; কী বলেন? কুকুর নিয়ে শিকারে যাবার জায়গাও নেই তো? তা আর কী করা যাবে বৃদ্ধ? দেখুন না, এইসব কাচ্চাবাচ্চারা কেমন বড় হয়ে উঠেছে, সে মেয়েদের দেখিয়ে বলল। এবার ওদের জন্য স্বামীর খোঁজ করতেই হবে, তা সে আপনার ভালো লাগুক আর নাই লাগুক।
তারপর বলল, আচ্ছা, আমার কসাক কেমন আছে? (মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা নাতাশাকে কসাক বলে ডাকে) নাতাশা নির্ভয়ে এসে তার হাতে চুমো খেলে তার বাহুতে চাপড় মারতে মারতে বলল, আমি জানি ও খুব দুষ্টু মেয়ে, কিন্তু আমি ওকে পছন্দ করি।
মস্ত বড় থলি তেকে ন্যাসপাতির মতো আকারের এক জোড়া চুনির ইয়ারিং বের করে গোলাপী নাতাশাকে দিল। সেও খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে পিয়েরকে ডাকল।
নরম উঁচু গলায় বলল, হেই, হেই বন্ধু! এখানে একটু এসো। এসো না বন্ধু… বলতে বলতে সে হাতের আস্তিন গুটিয়ে ফেলল। শিশুর মতো তার দিকে তাকিয়ে পিয়ের এগিয়ে গেল।
আরো কাছে এসো বন্ধু! তিনি যখন পক্ষে ছিলেন তখন একমাত্র আমিই তাকে সত্য কথাটা বলেছি, আর তোমার বেলায় এটা তো আমার অবশ্য কর্তব্য।
সে থামল। সকলে চুপচাপ; তারপর কী ঘটে তা দেখতে সকলেই উৎসুক, কারণ এটা তো সূচনামাত্র।
চমৎকার ছেলে! আমি বলছি! সুন্দর ছেলে! বাবা মৃত্যুশয্যায় আর উনি ভালুকের সঙ্গে পুলিশকে জুড়ে দিয়ে মজা করেন! কী লজ্জা, কী লজ্জা! এর চাইতে তোমার যুদ্ধে যাওয়া ভালো ছিল।
মুখ ঘুরিয়ে সে কাউন্টের হাত ধরল; কাউন্ট তখন হাসি চাপতে পারছে না।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, আমাদের খাবার টেবিলে যাবার সময় কি হয়নি?
প্রথম গেল কাউন্ট মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকে নিয়ে; তারপর গেল কাউন্টের জনৈক হুজার-কর্নেলের কাঁধে হাত রেখে; কর্নেলটির এখন গুরুত্ব অনেক, কারণ তার সঙ্গেই নিকলাস রেজিমেন্টে যাবে; তারপর গেল আন্না মিখায়লভনা শিনশিনের সঙ্গে। বের্গ ধরল ভেরার হাত। হাস্যময়ী জুলি কারাগিন গেল নিকলাসের সঙ্গে। তারপর জোড়ায় জোড়ায় অন্য সকলে এগিয়ে গেল; সারা খাবার ঘরটা ভরে গেল, সকলের শেষে একে একে গেল ছেলেমেয়েরা, গৃহশিক্ষকরা ও গভর্নের্সরা। পরিচারকরা ঘোরাঘুরি শুরু করল, চেয়ারের শব্দ উঠল, গ্যালারিতে ব্যান্ড বাজল, অতিথিরা যার যার আসনে বসল। তারপর কাউন্টের পারিবারিক ব্যান্ডের পরিবর্তে শুরু হল কাটা চামচের খুটখাট, অতিথিদের কলগুঞ্জন আর পরিচারকদের মৃদু পদশব্দ। টেবিলের একপ্রান্তে বসল কাউন্টেস, তার ডান দিকে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বয়ে আন্না মিখায়লভনা, তারপরে অন্য মহিলারা। অন্য প্রান্তে বসল কাউন্ট, বাঁদিকে হুজার-কর্নেল এবং ডানদিকে শিনশিন ও অন্য পুরুষ অতিতিরা। লম্বা টেবিলের মাঝামাঝি একদিকে বসল যুবক-যুবতীরা : বের্গের পাশে ভেরা, বরিসের পাশে পিয়ের; অন্যদিকে ছোটরা, শিক্ষকরা, গর্ভনেসরা; স্ফটিকের ডিকেন্টার ও ফলের পাত্রের আড়াল থেকে স্ত্রীর দিকে ও তার হাল্কা নীল রঙের ফিতেবাধা উঁচু টুপির দিকে চোখ রেখে কাউন্ট দ্রুতবেগে প্রতিবেশীদের গ্লাসগুলি ভরে দিতে লাগল; অবশ্য নিজের গ্লাসটিকেও উপেক্ষা করল না। ওদিকে কাউন্টেসও গৃহকত্রীর কর্তব্য পালনের ফাঁকে ফাঁকে আনারসের আড়াল থেকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছে; স্বামীর পাকা চুলের তুলনায় তার মুখ ও টাক মাথার রক্তিমাভা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। মহিলাদের দিকটাতে সারাক্ষণ কথার রক্তিমাভা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। মহিলাদের দিকটাতে সারাক্ষণ কথার খৈ ফুটছে, আর পুরুষদের গলা ক্রমেই উঁচুতে আরো উঁচুতে উঠছে–বিশেষ করে হুজার-কর্নেলের গলা; সে যত লাল হচ্ছে ততই বেশি খাচ্ছে আর বেশি টানছে; ফলে কাউন্ট তাকে অন্য সকলের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরছে। স্মিতহাস্যে বের্গ ভেরাকে বলছে, ভালোবাসা মর্তের নয়, স্বর্গের অনুভূতি। বরিস নতুন বন্ধু পিয়েরকে অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, আর মাঝে মাঝে উল্টো দিকে উপবিষ্ট নাতাশার সঙ্গে দৃষ্টি-বিনিময় করছে। পিয়ের কথা বলছে কম, নতুন মুখগুলিকে ভালো করে পরখ করছে, আর এন্তার খেয়ে চলেছে। দুরকম ঝোলের মধ্যে সুগন্ধি প্যাটিসসহ কাছিমের ঝোলটাই তার বেশি পছন্দ; অবশ্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বা কোনোরকম মদই সে বাদ দিল; সব চালিয়ে গেল। তেরো বছরের মেয়েরা ভালোবাসার মানুষকে, যাকে জীবনের প্রথম চুম্বনটি দিয়েছে, যে চোখে দেখে ঠিক সেই ভাবে নাতাশা বরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে সেই দৃষ্টি পিয়েরের উপরেও পড়ছে; ছটফটে ছোট মেয়েটির চাউনি দেখে তার হাসি পেল, কেন তা সে জানে না।
