সোনা আমার, কথাটা সে আর একবার বলল।
এই কথাটা বলবার সময় বাবা কি ভাবছিল? এখনই বা সে কি ভাবছে? প্রশ্নটা হঠাত্র তার মনে এল, আর ঠিক তার জবাবেই সে যেন চোখের সামনে বাবাকে দেখতে পেল-শাদা রুমাল দিয়ে থুতনি বাধা অবস্থায় শবাধারে শুয়ে তার মুখে যে ভাব ফুটে উঠেছিল ঠিক সেই ভাব নিয়ে। তখন যে ভয় তাকে পেয়ে বসেছিল এখনো সেই ভয় আবার তাকে চেপে ধরল। অন্য কিছু ভাববার ও প্রার্থনা করবার চেষ্টা সে করল, কিন্তু কোনোটাই করতে পারল না। দুই বিস্ফারিত চোখ মেলে চাঁদের আলো ও ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল, প্রতিটি মুহূর্তেই মনে আশা যে বাবার সেই মৃত মুখটা দেখতে পাবে। তার মনে হতে লাগল, যে নিস্তব্ধতা বাড়িটার বাইরে ও ভিতরে ছড়িয়ে আছে তা যেন তাকেও চেপে ধরেছে।
ফিসফিস করে ডাকল, দুনিয়াশা। আর্তনাদ করে বলল, দুনিয়াশা! তারপর সেই নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে ফেলে ছুটে গেল চাকরদের মহলে বুড়ি নার্স ও দাসীদের সঙ্গে দেখা করতে, তারাও ছুটে এল তার দিকে।
.
অধ্যায়–১৩
১৭ আগস্ট তারিখে বন্দিদশা থেকে সদ্য খালাস পাওয়া লাভ্রুশকা ও একটি হুজার আর্দালিকে সঙ্গে নিয়ে রস্তভ ও ইলিন বোগুচারভো থেকে দশ মাইল দূরবর্তী ইয়াংকভোর আস্তানা থেকে ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ল-ইলিন যে নতুন ঘোড়াটা কিনেছে সেটাতেও চড়া হবে, আবার গ্রামে কিছু খড় পাওয়া যায় কি না সে খোঁজও করা হবে।
গত তিন দিন যাবৎ দুটি বিরুদ্ধ সেনাদলের মাঝখানে পড়ে বোগুচারভোর দিন কাটছে, ফলে রুশ বাহিনীর পিছনের অংশ আর ফরাসি বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ দুইয়ের পক্ষেই সেখানে পৌঁছনো সমান সহজ, তাই একজন সতর্ক স্কোয়াড্রন-কমান্ডার হিসেবে রস্তভ ঠিক করেছে ফরাসিদের হাতে পড়বার আগেই সে বোগুচারভোর অবশিষ্ট রসদপত্র সংগ্রহ করে নেবে।
রস্তভ ও ইলিন বেশ খোশ মেজাজে আছে। লাভ্রুশকাকে নেপোলিয়ন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করে তার গাল গল্প শুনে হাসতে হাসতে তারা ইলিনের ঘোড়াটাকে পরীক্ষা করার জন্য দৌড়-প্রতিযোগিতা শুরু করে দিল।
রস্তভের কোনো ধারণাই নেই যে তার বোনের সঙ্গে যে বলকনস্কির বিয়ের কথা হয়েছে তাদের গ্রাম ও জমিদারিতেই তারা ঢুকতে যাচ্ছে।
ইলিনকে মেরে দিয়ে রস্তভের ঘোড়াই গ্রামের পথে প্রথম পা ফেলল।
তুমিই প্রথম, মুখ লাল করে ইলিন বলল।
হ্যাঁ, সবসময়ই প্রথম–কি তৃণভূমিতে, কি এখানে, দোনেতের উত্তপ্ত পিঠে চাপড় দিতে দিতে রস্তভ বলল।
নিজের লোমশ গাড়ি-টানা ঘোড়াটাকে দেখিয়ে লাভ্রুশকা পিছন থেকে বলল, আমার এই ফরাসিনীকে নিয়েই আমি জিততে পারতাম ইয়োর এক্সেলেন্সি, শুধু আপনি দুঃখ পাবেন বলেই তা করিনি।
পায়ে হাঁটা গতিতে তারা গোলাবাড়িতে পৌঁছল, সেখানে অনেক চাষী ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ কেউ মাথার টুপি খুলল, আবার অনেকে টুপি না খুলে নবাগতদের দেখতে লাগল। বলিরেখায় ভরা মুখ আর পাতলা দাড়িওয়ালা দুই ঢ্যাঙা বুড়ো সরাইখানা থেকে বেরিয়ে হাসতে হাসতে, টলতে টলতে অসংলগ্ন গান গাইতে গাইতে অফিসারদের দিকে এগিয়ে গেল।
রস্তভ হেসে বলল, খাসা লোক সব! এখানে কিছু খড় মিলবে কি?
দুটি যেন মানিক-জোড়, ইলিন বলল। খুশির হাসি হেসে একটি চাষী গেয়ে উঠল, বড় খু-শি-খুশি আ-জ…
ভিড়ের ভিতর থেকে একজন রশুভের দিকে এগিয়ে গেল।
বলল, আপনারা কোন পক্ষের?
ইলিন তামাশা করে বলল, ফরাসিদের, আর ইনি স্বয়ং নেপোলিয়ন–লাভ্রুশকাকে দেখিয়ে দিল।
তাহলে আপনারা রুশ? চাষীটি আবার শুধাল।
একটি বেঁটে লোক এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনাদের বেশ বড় একটা দল এখানে আছে তো?
খুব বড়, রস্তভ জবাব দিল। কিন্তু তোমরা এখানে জড় হয়েছ কেন? আজ কি ছুটির দিন?
চাষীটি যেতে যেতে বলল, বুড়োরা সব কমন নিয়ে কথা বলতে জড় হয়েছে।
ঠিক সেইসময় বড় বাড়িটার রাস্তা ধরে দুটি স্ত্রীলোক ও শাদা টুপিধারী একটি পুরুষকে আসতে দেখা গেল।
দুনিয়াশাকে তার দিকেই ছুটে আসতে দেখে ইলিন বলল, যার পরনে পাটল রঙের পোশাক সেটি আমার, অতএব দূর হটো!
আমাদের সকলের, লাভ্রুশকা চোখ টিপে বলল।
ইলিন হেসে বলল, তোমার কি চাই সুন্দরী?
প্রিন্সেস আপনাদের রেজিমেন্টের নাম ও আপনাদের নাম জানতে আমাকে পাঠিয়েছেন।
ইনি কাউন্ট রস্তভ, স্কোয়াড্রন-কমান্ডার, আর আমি তোমার বশংবদ ভৃত্য।
ইলিনের কথা শুনে স্বর্গীয় হাসি হেসে মাতাল চাষীটি জোর গলায় বলে উঠল, কোম্পানি! দুনিয়াশার পিছন থেকে আলপাতিচ এগিয়ে এসে কিছুটা দূর থেকেই টুপিটা খুলে ফেলল।
বুকের ভিতরে একটা হাত ঢুকিয়ে তরুণ অফিসারটির প্রতি শ্রদ্ধা অথচ ঈষৎ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, আপনাকে একটু বিরক্ত করছি ইয়োর অনার। এ মাসের ১৫ই তারিখে পরলোকগত জেনারেল-ইন-চিফ প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির কন্যা আমার বর্তমান মনিব এইসব লোকদের-চাষীদের দেখিয়ে-অদ্ৰতায় বিপন্ন বোধ করে আপনাদের তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।…আপনারা কি দয়া করে ঘোড়া নিয়ে আর একটু এগিয়ে…কারণ এইসব লোকদের সামনে… ঘোড়র গায়ে মাছির মতো যে দুটি চাষী তার গায়ের কাছে এসে হাজির হয়েছে তাদের দেখিয়ে বলল।
খুশি মনে তার দিকে তাকিয়ে চাষীরা বলে উঠল, আহা!…আলপাতিচ…আহা ইয়াকভ আলপাতিচ…চমৎকার…খৃস্টের দোহাই, আমাদের ক্ষমা কর। কি বল?
